শুক্রবার, ০৯ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩

আজান ঈমান জাগিয়ে দেয়

নূর মোহাম্মদ | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৪:০৫ পিএম

আজান ঈমান জাগিয়ে দেয়

আমার বয়স তখন ৮ কি ৯ বছর হবে। এমন একদিন কলকাতা থেকে আমাদের বাড়িতে একজন ধর্মগুরু এলেন। মা-বাবাসহ পাড়ার অনেক মুরব্বির গুরুদেব তিনি। গুরুদেবকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে মহোৎসব চলছে। একপর্যায়ে সবাই মিলে উলুধ্বনি দিয়ে গুরুদেবকে বাড়ির মধ্য উঠানে একটি চেয়ারে বসালেন এবং তার চরণ দু’টি একটি পাথরের খাদার (থালা) ওপর রাখলেন। আমাদের বাড়িতে আগত সব মহিলা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে একজনের পর একজন গুরুদেবের পায়ে কপাল ঠেকিয়ে প্রণাম করছেন এবং পানি মিশ্রিত গরুর দুধ দিয়ে পা দু’টি পরম ভক্তিভরে ধুইয়ে মাথার চুল দিয়ে মুছে দিচ্ছেন পার্থিক জীবনের সুখ-শান্তি ও মৃত্যুর পর স্বর্গ লাভের আশায়।
আমি একটু দূর থেকে কী যেন ভাবছি আর গুরুদেবকে নিয়ে কী হচ্ছে, তা দেখছি। ভোজনের জন্য গুরুদেব তার নির্দিষ্ট আসনে চলে গেলেন এবং গুরুদেবের রেখে যাওয়া পা ধোয়া পানি ও দুধের মিশ্রণে তৈরি হওয়া চরণামৃত সবাই একটু করে খাচ্ছে এবং নিজের কপাল ও মাথায় পরম শান্তির আশায় মাখছে। আমার মা আমার জন্য খুব যত্ন সহকারে ছোট্ট একটি বাটিতে করে নিয়ে এলো গুরুদেবের চরণামৃত। বলল, নে বাবা খা; গুরুদেবের আশীর্বাদ পেলে তুই অনেক বড় হতে পারবি। আমি মায়ের কথা শুনে উল্টো প্রশ্ন করে জানতে চাইলাম মা, একজন মানুষের পা ধোয়া পানি আরেকজন মানুষ কী করে খায়? তিনি তো দেবতা নন; আমার মতো একজন মানুষ। আমি তার পা ধোয়া পানি অমৃত মনে করে কিছুতেই খাবো না। মা আমাকে বললেন, এ জন্যই তোর কিছু হয় না। তারপর বকতে বকতে চলে গেলেন।

ওই দিন রাতেই আমি স্বপ্নে দেখি একটি ঘূর্ণিপাকের মতো আলোর ঝিলিকের ভেতর আমি মহাশূন্যে উড়ে যাচ্ছি। স্বপ্নে কী দেখলাম তা বাস্তবে ভেবে দেখার মতো বয়স তখন আমার ছিল না। তাই এ স্বপ্ন নিয়ে কিছু ভাবিনি। এর কিছু দিন পর থেকে ফজরের আজান শুরু হলেই আমি হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে বসতাম, আর ঘুমাতে পারতাম না। আজানের পরপর আরেকটি অন্ধকার ছায়া পড়ে পৃথিবীতে, তারপর আসে ভোরের আলো। ছোটবেলায় তা প্রত্যক্ষ করতাম, কিন্তু এখন শহরের আলোয় তা আর বোঝা যায় না। যা হোক, ফজরের আজান শুনতে শুনতে আমি আজান দেয়া শিখে ফেলি এবং একদিন সব ভয়-ডর ভুলে ফজরের সময় চলে যাই আমাদের বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ে। সেখানে গিয়ে ভালোভাবে হাত-পা ধুয়ে নিই। পুকুরপাড়েই বড় একটি আমগাছ। সেই আমগাছের নিচে পশ্চিমমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে সজোরে আজান দিলাম। সেদিন আমাদের বাড়ির ও আশপাশের কেউ টের পেয়েছিল কি না জানি না। কিন্তু পরদিন আবার যখন সেখানে দাঁড়িয়ে দুই কানের ভেতর আঙুল দিয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে আজান দিচ্ছিলাম, তখন আমার মনে হচ্ছিল কে যেন পেছন থেকে আমাকে টানছে। তবুও আমি আজান দিয়েই যাচ্ছি। আজান শেষে পেছনে চোখ ফেরাতেই আমার মাকে দেখি। মা তখন আমাকে জাপটে ধরে ঘরে নিয়ে এলো এবং সবার অগোচরে আমাকে বুঝিয়ে বলল বাবা, তুই যদি এমন করিস তাহলে মুসলমানেরা তোকে ধরে নিয়ে যাবে। মেরে ফেলবে। সাবধান, আর এমন করিস না বাবা। তারপর মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় এবং আমি মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ি। তারপর থেকে ফজরের আজানের ধ্বনি আর আমার কানে আসে না। ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলাম এবং আজানের কথাগুলো ভুলে গেলাম। শুরু হলো জীবনের অন্য অধ্যায়।

১২ বছর বয়স থেকে কবিতা লেখা শুরু করি। যদিও সেই কবিতাগুলো কোনো কবিতা ছিল না, কিন্তু আমার ভাবখানা এমন ছিল যে, আমিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবি। সেই সুবাদে স্কুলের পাঠ্যবই ঠিকমতো না পড়ে বড় বড় কবির কবিতা, উপন্যাস ও দার্শনিকদের আত্মজীবনীমূলক বই পড়া শুরু করি। মূলত হাতের কাছে যা পাই তাই পড়ি। ১৪ বছর বয়সে কমিউনিস্ট রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়ি এবং মানুষের জন্য, মানুষের মানবিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত হই। যখন বুঝতে পারি যারা মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিচ্ছে, সেই তারাই মানুষের অধিকার বিক্রি করে খাচ্ছে, তখন নিজেকে সামলে নিই।

নতুন করে ভেতরে একটা ভাব চলে আসে। রাত হলেই বিলের পাড় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি আর ভাবি এ বিশাল সৃষ্টি জগতের নিশ্চয়ই একজন মালিক আছেন এবং তিনি কে? আল্লাহ, ভগবান, ইশ্বর না কি অন্য কেউ? ভেবে কোনো সমাধান খুঁজে পাই না। তবে বিশ্বাস করি, নিশ্চয়ই একদিন আমি এ সত্যের সন্ধান খুঁজে পাবো। ঘুমালে সারা রাত স্বপ্ন দেখি, কিন্তু কী যে দেখি সকালে আর মনে পড়ে না। এর মধ্যে ধর্ম বই পড়া শুরু করি রামায়ণ, মহাভারত, গীতা, বাইবেল, ত্রিপিটক, ইঞ্জিল শরিফ, কিন্তু কিছুতেই আমার মন ভরে না। ইচ্ছা জাগে কুরআন শরিফ পড়ার। সামাজিক বাধ্যবাধকতায় মসজিদেও যেতে পারি না, কুরআন শরিফে কী আছে তাও জানতে পারি না। একদিন এক বন্ধুর বাসায় কয়েক পাতার ছোট একটি বই পেলাম, যার ভেতর লেখা হিন্দু ধর্মের মূল ধর্মগ্রন্থ বেদ-এর ১২৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে মহানবী হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা সা:-এর দুনিয়াতে আবির্ভাবের কথা। বইটি পড়ে আর দেরি না করে সোজা বাড়িতে চলে আসি এবং আমার বড় ভাইকে জিজ্ঞেস করি দাদা, বেদ-এর ভেতর এমন একটি বিষয় আছে; তা কি সত্য? দাদা অকপটে বলে ফেলল হ্যাঁ সত্য। আবার খানিকটা বিব্রতবোধ করে বলল তুই জানলি কিভাবে? আমি দাদার প্রশ্ন এড়িয়ে গেলাম, কিন্তু ভেতর থেকে বেদ-এর কথা কিছুতেই এড়াতে পারলাম না। নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করলাম ধর্মগ্রন্থ হচ্ছে একটি ধর্মের মূল জীবনীশক্তি বা সংবিধান। আর একটি সংবিধান যদি আর একটি সংবিধানের কাছে নিজের অস্তিত্ব সমর্পণ করে তাহলে এর সারমর্ম কী দাঁড়ায়?

কিছু দিন পর বাড়ি থেকে বেরিয়ে ভারতে চলে গেলাম বেদ খুঁজতে। কলকাতা, আসাম, গৌহাটি, নওগাঁ ঘুরে জলপাইগুড়ি জেলার বারবিসা এলাম, কিন্তু কোথাও বেদ-এর সন্ধান পেলাম না। তখন ১৯৯১ সাল। পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের কিছু এলাকা জুড়ে চলছে ‘মানব ধর্ম’ নামের নতুন একটি ধর্মের প্রচারকাজ। ওই ধর্মের ধর্মযাজকের নাম বালক ব্রহ্মচারী। দেখতে ঠিক নেতাজী সুভাষ বসুর মতো। কিন্তু তিনি উচ্চতায় সুবাস বসুর চেয়ে দেড় ইঞ্চি কম। জানতে পারি তার কাছে বেদ আছে। আমি ছুটে চলি তার পেছনে। সে তখন হাজার হাজার ভক্ত নিয়ে আসামের গোসাই গাঁ থেকে তুড়া পাহাড়ে যাচ্ছিলেন। আমি তার পেছনে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম তুড়া পাহাড়ে। চার দিন অক্লান্ত চেষ্টার পর বালক ব্রহ্মচারীর এক ঘনিষ্ঠ শিষ্যকে ম্যানেজ করে তাকে দিয়ে বেদ পড়িয়ে আমি যা জানতে এসেছি তার সত্যতা জেনে গেলাম এবং তখনই মহানবী মুহাম্মদ মোস্তফা সা:-কে আমার নবী হিসেবে অন্তরে গ্রহণ করলাম। তারপর তুড়া পাহাড়ের একটি গাছের নিচে কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে বসে থাকি। এর পর হঠাৎ আমার শরীর শিউরে ওঠে, শরীরের সব ক’টি লোম দাঁড়িয়ে যায়; কিছু একটা অনুভব করি কিন্তু কী অনুভূত হয় তা বুঝতে পারি না। সেদিন তুড়া পাহাড় থেকে বারবিসা চলে আসি এবং আমার বাবার মৃত্যুর সংবাদ পাই। ফিরে আসি দেশে।

বাবার মৃত্যুর পর মেজো ভাই মাকে চিটাগাং নিয়ে যায়। আমি ছন্নছাড়া হয়ে পড়ি। আমি অকর্মন্ন ছিলাম, একমাত্র মা-ই ছিল আমার অবলম্বন। বাড়ির কেউ আমাকে পছন্দ করত না। বিনা দোষে দোষী হতাম। অযথাই আমার ওপর মিথ্যা অপবাদ চাপিয়ে দিত। কেউ আমার কথা বিশ্বাস করত না। কিন্তু একমাত্র আমাদের বাড়ির মানুষ ছাড়া প্রতিবেশীসহ বন্ধুদের বাড়িতে আমার মর্যাদা ছিল এবং সবাই আমাকে আদর-আহ্লাল করত। বলা যায়, প্রতিবেশী ও বন্ধুদের নিয়েই চলত আমার জীবনপ্রবাহ।

১৯৯৪ সালের শেষের দিকে মেজো ভাই সপরিবারে আমেরিকা চলে যায়। মাকে নিয়ে আমি বোনের বাড়ি নকলা, শেরপুর চলে আসি। এতে মেজো ভাইয়ের সম্মতি ছিল বিধায় সে নিয়মিত টাকা পাঠাত। আমার বোনের বাড়ির পাশেই একটি মুসলিম পরিবার ছিল। তাদের সাথে আমার সখ্য গড়ে ওঠে। বিশেষ করে বাবুল ভাই আমাকে যথেষ্ট অনুপ্রেরণা দেন ইসলাম ধর্ম গ্রহণের জন্য। একদিন উপজেলা মসজিদে বসে তিনি আল্লাহর নামে শপথ করে বলেন তুমি যদি মুসলমান হও তাহলে তোমার জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন আমি তাই করব এবং তিনি তার কথা রেখেছিলেন। আমার মায়ের মৃত্যুর পর যখন আমি দিশেহারা তখন বাবুল ভাই নিজে বিদেশে না গিয়ে তার বাবার পেনশনের টাকায় এবং তাদের বাড়ির সবার সহযোগিতায় ইংরেজি ২০০০ সালে আমাকে দুবাই পাঠায়। দুবাই আসার পর পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালা আমাকে হেদায়েত দান করেন এবং আমি আরব আমিরাতের সারজা তাবলিগ মসজিদে পবিত্র জুম্মার রাতে গালিব ভাইয়ের মাধ্যমে পবিত্র কালেমা পড়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করি।
লেখক : নও-মুসলিম

সোনালীনিউজ/ঢাকা/আকন

শুক্রবার, ০৯ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩