শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩

আনফিট সিলিন্ডারে আগুনের গোলা, বাড়ছে মৃত্যু

আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৩:৫৯ পিএম

আনফিট সিলিন্ডারে আগুনের গোলা, বাড়ছে মৃত্যু

সোনালীনিউজ রিপোর্ট

দেশে সম্প্রতি যানবাহনে বিস্ফোরণে মৃত্যুর ঘটনা বেড়েই চলেছে। এসব দুর্ঘটনার পেছনে মূলত গাড়ি ও সিলিন্ডার দুটিরই ফিটনেসহীনতা দায়ী। বছরের পর বছর লাখ লাখ ফিটনেসহীন গাড়ি পেটের মধ্যে আনফিট গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে কাঁপাচ্ছে সড়ক, মহাসড়ক। সিএনজিচালিত প্রতিটি গাড়ি যেন চলন্ত বোমা। মানুষ প্রতিদিন যাতায়াত করছে বোমার ওপর বসে। বাড়ছে মানুষের মৃত্যু, কিন্তু দায় দেয় না কেউ। সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

গত ২৫ মার্চ কুমিল্লার চান্দিনায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বালুবাহী ট্রাকে বিস্ফোরণের পর আগুনে পুড়ে ট্রাকের চালক ও হেলপারের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার পরপর প্রাথমিক তদন্তে বলা হয় ট্রাকের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পরে বিস্ফোরক পরিদপ্তর ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) তাদের তদন্তে দাবি করে, সিলিন্ডার বিস্ফোরণ নয়, ওই ট্রাকের ফিটনেস না থাকায় অভ্যন্তরীণ গোলযোগে বিস্ফোরণ ঘটে।

একই বক্তব্য আসে গত ২২ ফেব্র“য়ারি মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় যাত্রীবাহী বাসে বিস্ফোরণে ১৬ যাত্রী দগ্ধ হওয়ার ঘটনায়। প্রাথমিকভাবে তদন্তে বাসের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কথা বলা হলেও বিস্ফোরক পরিদপ্তর ও আরপিজিসিএলের তদন্তে বলা হয়, বাসটির ফিটনেস শেষ হয়েছে সাত বছর আগে। লক্কড়-ঝক্কড় বাসের অভ্যন্তরীণ সংযোগ বিছিন্ন হয়ে আগুনের সূত্রপাত হয়।

একই রকম ঘটনা ঘটে গত ৭ জানুয়ারি ময়মনসিংহের ভালুকায় একটি কাভার্ড ভ্যানে বিস্ফোরণে। ফিটনেসবিহীন কাভার্ড ভ্যানের সিলিন্ডারের মুখ ভালোভাবে আটকানো ছিল না। কাভার্ড ভ্যানের তারের ‘লুস’ কানেকশনের কারণে গ্যাস বের হয়ে আগুন ধরে যায়। মারা যান এক ব্যক্তি। এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। চলতি বছরে অন্তত ২৫ জন মানুষ মারা গেছে গাড়িতে হঠাৎ আগুন ধরে গেলে।

সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব দুর্ঘটনার পেছনে মূলত গাড়ি ও সিলিন্ডার দুটিরই ফিটনেসহীনতা দায়ী। বছরের পর বছর লাখ লাখ ফিটনেসবিহীন গাড়ি পেটের মধ্যে ফিটনেসবিহীন গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সড়ক-মহাসড়কে।
বিআরটিএর হিসাব মতে, সারা দেশে তিন লাখের মতো গাড়ির ফিটনেস নেই। আর আরপিজিসিএলের মতে, সিএনজিচালিত ৮০ শতাংশ গাড়ির সিলিন্ডার মেয়াদ-উত্তীর্ণ। নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ বছর পর সিলিন্ডার পরীক্ষার কথা থাকেলেও কেউ তা মানছে না।

গাড়ি ও সিলিন্ডারের ফিটনেস নিয়ে বিআরটিএ ও আরপিজিসিএল পরস্পরের ওপর দায় চাপিয়েই খালাস, যা সড়ক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা।
জানতে চাইলে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক শামছুল আলম দাবি করেন, ‘এ পর্যন্ত বাংলাদেশে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে কোনো দুর্ঘটনার প্রমাণ আমরা পাইনি। অনেক ঘটনাই ঘটেছে গাড়ির ফিটনেস না থাকার কারণে।’

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাড়ির ফিটনেসহীনতা দুর্ঘটনার একটি কারণ হলেও সিলিন্ডারের মান নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। পাঁচ বছর অন্তর সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষা (রিটেস্ট) করার নিয়ম থাকলেও তা পরিপালন করেন না বেশির ভাগ। সেটি কড়াকড়িভাবে পালনের ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
তাদের অভিমত, দেশে বিরাজমান আইনে পাঁচ বছর পর পর সিলিন্ডার রিটেস্ট করার বিধান রয়েছে। কিন্তু না করলে কোনো শাস্তির ব্যবস্থা নেই। বা এটা যে খুবই জরুরি বিষয় সেটি আইনে বলা নেই। তাই এ-সংক্রান্ত আইন সংশোধন করার দাবি তাদের।

জানতে চাইলে আরপিজিসিএলের একজন ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গাড়ির ফিটনেস দেয় বিআরটিএ। আমরা তাদের অনেকবার চিঠি দিয়ে বলেছি- সিলিন্ডার ও সিএনজি কনভার্সন-এর ফিট কাগজপত্র দেখে যেন চূড়ান্ত ফিটনেস সনদ দেয়া হয়। কিন্তু আমাদের এ সুপারিশ থোড়াই কেয়ার করা হয়।’ আরপিজিসিএলের ওই প্রকৌশলী কর্মকর্তা আরো জানান, অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা এড়াতে তারা বিআরটিএকে তিন দফা সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে-  ফিটনেস দেয়ার আগে বিআরটিএ যেন গাড়ির সিলিন্ডার ও সিএনজি কনভার্সনের সনদ দেখার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করে, বিআরটিএ আইনে সিলিন্ডার রিটেস্টের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা এবং কেউ এটি না মানলে শাস্তির ব্যবস্থা রাখা এবং পুলিশ রাস্তায় গাড়ির সিলিন্ডার রিটেস্টের সনদ, সিএনজি কনভার্সনের সনদ ও বিআরটিএর ফিটনেস সনদ দেখে রুট পারমিট দেবে।

কিন্তু আরপিজিসিএলের এই তিন সুপারিশের কোনোটিই মানা হয়নি বলে দাবি করেন ওই কর্মকর্তা। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির (আরপিজিসিএল) হিসাবে বলা হয়েছে, সারা দেশে চলাচল করছে প্রায় তিন লাখ সিএনজিচালিত যানবাহন। এই হিসাব শুধু জিপ, মাইক্রোবাস ও পাজেরোর।  এর মধ্যে পাঁচ বছরের বেশি ব্যবহৃত সিলিন্ডার নিয়ে চলছে আড়াই লাখের বেশি গাড়ি। সিএনজি নিরাপত্তার আন্তর্জাতিক মান নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি গ্যাসসিলিন্ডার পাঁচ বছর পর পর পুনঃপরীক্ষার (রিটেস্ট) বিধান রয়েছে। কিন্তু সিএনজিচালিত যানবাহনগুলোর ৮০ শতাংশ সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষা (রিটেস্ট) করানো হয়নি। ফলে ঝুঁকি নিয়ে চলছে এসব যানবাহন।

জিপ, মাইক্রোবাস ও পাজেরো ছাড়া সারা দেশে যেসব বাস ও ট্রাক সিএনজি কনভার্সন করা, সেগুলোর হিসাব আরপিজিসির কাছে নেই। সিএনজিচালিত বাস-ট্রাকের হিসাব এবং সেগুলোর সিলিন্ডারের রিটেস্টের বিষয়ে জানতে চেয়ে বিআরটিএকে চিঠি দেয়া হলেও তারা কোনো উত্তর দেয়নি বলে দাবি আরপিজিসির। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক শামছুল আলম এ প্রসঙ্গে  বলেন, ‘একজন চালক সে হয়তো ভাড়ায় গাড়ি চালায়। সে যখন বুঝবে তার জীবন ঝুঁকিতে আছে, তখন সে নিজেই সিলিন্ডারগুলো রিটেস্ট করাবে। কিন্তু তাদের মধ্যে সচেতনতা না থাকায় তারা উদাসীন। গণসচেতনতা বাড়ানোর জন্য আমরা ব্যাপক প্রচার চালিয়েছি।’

আরপিজিসিএল ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে দেশে আটটি সিলিন্ডার রি-টেস্ট সেন্টার রয়েছে। এগুলো থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৪০ হাজার সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষা করা হয়েছে। আরপিজিসিএলের ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী কর্মকর্তা বিশ্বাস বলেন, ‘বিআরটিএ-কে আমরা অনেকবার চিঠি দিয়েছি। প্রতিবছর যানবহনের ফিটনেস সনদ দেয়ার সময় সিলিন্ডারের বিষয়টি যেন আইনের আওতাভুক্ত করা হয়। কিন্তু সেটা এখনো পর্যন্ত করা হয়নি।’

আর বিআরটিএ বলছে, এ দায় তাদের নয়। বিআরটিএর পরিচালক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘গ্যাস সরবরাহ সিস্টেমের বিভিন্ন বিষয় দেখার দায়-দায়িত্ব আরপিজিসিএলের। এতে বিআরটিএর কোনো দায়-দায়িত্ব নেই। কারণ বিআরটিএকে গ্যাসের গাড়ির জন্য কোনো রেজিস্ট্রেশন দেয়া হয়নি। শুধু পেট্রলচালিত যানবহনের জন্য রেজিস্ট্রেশন দেয়া হয়েছে।’ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ‘সিএনজি সিলিন্ডারে প্রতি বর্গইঞ্চিতে ৩২০০ পাউন্ড চাপে যখন গ্যাস ভরা হয়, তখন রাস্তায় চলাচলকারী গাড়ির প্রতিটি সিলিন্ডার বোমার মতোই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। গ্যাস ভরার সময় সিলিন্ডার ও গ্যাস উত্তপ্ত অবস্থায় থাকে। সিলিন্ডার যথাযথ মানসম্পন্ন না হলে বড় রকমের অঘটন ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে।’

সিলিন্ডারের মান নিয়ন্ত্রণ, সিএনজি যন্ত্রপাতির ফিটনেস নিয়ে ভূমিকা রাখতে না পারার জন্য জনবল সংকটের কথা বলছে আরপিজিসিএল। বিআরটিএতে একটি সিএনজি সেল স্থাপনের মধ্য দিয়ে ফিটনেস ও নবায়নের সুযোগ সৃষ্টির প্রস্তাব ছিল তাদের। কিন্তু বিষয়টি এখনো সুরাহা হয়নি। দুই সংস্থার এই টানাপোড়েন সড়ক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা।

জানা গেছে, প্রতিটি সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষা করাতে তিন হাজার টাকার মতো খরচ হয়। যাত্রীবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে সিলিন্ডার রিটেস্টে গেলে যাত্রীসেবা বন্ধ থাকে। এটা অনেক গাড়িমালিক মানতে চান না। এ জন্য সিএনজি ওয়ার্ক স্টেশন বাড়ানোরও সুপারিশ করেছে আরপিজিসিএল।

উল্লেখ্য, বর্তমানে সারা দেশে রেজিস্ট্রি করা যানবাহন প্রায় ২১ লাখ। এর মধ্যে মোটরসাইকেল প্রায় ১১ লাখ এবং বাস, মিনিবাস, ট্রাকসহ অন্যান্য পরিবহন প্রায় ১০ লাখ। বিআরটিএ থেকে দেয়া ড্রাইভিং লাইসেন্সের সংখ্যা ১৪ লাখ ৩১ হাজার। বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা প্রায় তিন লাখ।


সোনালীনিউজ/এমটিআই

add-sm
Sonali Tissue
শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩