রবিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩

আমদানিকৃত পণ্যের মাধ্যমে তেজস্ক্রিয়া প্রবেশের ঝুঁকিতে দেশ

সোনালীনিউজ রিপোর্ট | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৪:০১ পিএম

আমদানিকৃত পণ্যের মাধ্যমে তেজস্ক্রিয়া প্রবেশের ঝুঁকিতে দেশ

তীব্র হচ্ছে দেশে তেজস্ক্রিয়া প্রবেশের ঝুঁকি। আর তা হচ্ছে মূলত আমদানিকৃত পণ্যের মাধ্যমেই। কারণ জাপানসহ তেজস্ক্রিয়ায় আক্রান্ত দেশ থেকে আনা পণ্য যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই দেশে প্রবেশ করছে।

জাপান বা তেজস্ক্রিয়ায় আক্রান্ত দেশগুলো থেকে রফতানি করা পণ্যের সঠিক ও অধিকতর পরীক্ষা ছাড়া সমুদ্রবন্দরে প্রবেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিষিদ্ধ করলেও বাংলাদেশে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। ফলে পণ্যের মাধ্যমে তেজস্ক্রিয়া প্রবেশের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। নৌ পরিবহন এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে দেশের সব বন্দর দিয়ে আমদানিকৃত পণ্যের তেজস্ক্রিয়ার মাত্রা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে আইন করার সুপারিশ করা হয়।

সম্প্রতি নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক চিঠিতে বাণিজ্য সচিবকে এই সুপারিশ করা হয়। তাছাড়া ওই চিঠিতে মংলা বন্দরে দ্রুত তেজস্ক্রিয়া পরীক্ষণ যন্ত্র বসানো এবং পরমাণু শক্তি কমিশনের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে বন্দরের নির্দিষ্ট লোকবলকে তেজষ্ক্রিয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়ার সুপারিশও করা হয়েছে। বাংলাদেশের একটি জাহাজে তেজস্ক্রিয়াসম্পন্ন পণ্য পাওয়ার পরই নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় ওসব সুপারিশ করেছে।

সূত্র জানায়, গতবছরের ২৮ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দরে ১৯ টন স্টেইনলেস স্টিলের একটি কনটেইনারে উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয়া (১০০০ রেডিয়ান) পাওয়া যায়। কনটেইনারটি বাংলাদেশ থেকে শ্রীলংকার কলম্বো বন্দর হয়ে ভারতে পৌঁছানোর কথা থাকলেও শ্রীলংকা বন্দরে পৌঁছার পর তা বন্দর কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র না পাওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরে ফেরত আসে। 

তারপর বাংলাদেশ পরমাণুু শক্তি কমিশন ও আমেরিকার বিশেষজ্ঞরা ওই কনটেইনার পরীক্ষা করে উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয়ার প্রমাণ পান। ওই পণ্যের রফতানিকারককে জরিমানা করেছে পরমাণু শক্তি কমিশন ও বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে সে জরিমানা এখনো রফতানিকারক পরিশোধ করেনি। পরবর্তী সময়ে ওই ঘটনায় দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়।

২০১১ সালের ১১ মার্চ জাপানের ভূমিকম্পে দেশটির ৩টি নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে ৩০০ টন তেজস্ক্রিয়া পানি উত্তর প্রশান্ত (নর্থ প্যাসিফিক) সাগরে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী তেজস্ক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। তার ফলে জাপানের কাছাকাছি দেশগুলোর উপক‚ল (যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকো) ও নর্থ প্যাসিফিক সাগর মারাত্মকভাবে তেজস্ক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী এই উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয়া (৭০০ থেকে ৩০০০ রেডিয়ান পর্যন্ত) ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সূত্র আরো জানায়, গত ৩ ফেব্রুয়ারি জাপানের ওকলাহোমা থেকে আসা জাহাজ থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে যে পণ্য খালাস করা হয় তা যথাযথ পরীক্ষা করা হয়নি। তাছাড়া গত ২৯ জানুয়ারি দক্ষিণ কোরিয়া ও চীন থেকে তেজস্ক্রিয়া ঝুঁকিসম্পন্ন স্ক্র্যাপ বা জিআই মেটাল সহকারে এমভি সোয়ান নামক জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে এসেছে। বর্তমানে তার খালাসের প্রক্রিয়া চলমান।

বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে মাত্র ৫টি তেজস্ক্রিয়া নিরীক্ষণ যন্ত্র থাকলেও মংলা বন্দরে তেজস্ক্রিয়া নিরীক্ষণ যন্ত্র নেই। অথচ দেশে আমদানি করা গাড়ির বড় অংশই বর্তমানে মংলা বন্দর দিয়ে খালাস হচ্ছে। যেখানে জাপান ও প্রতিবেশী বিভিন্ন তেজস্ক্রিয়ায় আক্রান্ত দেশগুলো থেকে আনা গাড়ি ও অন্যান্য পণ্য রয়েছে।

তাছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর আমদানি নীতিমালা অনুযায়ী শুধু খাদ্যদ্রব্যের তেজস্ক্রিয়া পরীক্ষা করে থাকে। যথাযথ আইন ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় লৌহ বা লৌহজাত দ্রব্য, স্ক্র্যাপ বা অন্যান্য পণ্যের তেজস্ক্রিয়া পরীক্ষা করা হয় না। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে তেজস্ক্রিয় পণ্য দেশে প্রবেশের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। ইতিমধ্যে মংলা বন্দরে রেডিয়েশন টেস্টিং অ্যান্ড মনিটরিং ল্যাবরেটরি বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। আগামী বছর থেকে ওই ল্যাব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারবে বলে আশাবাদী পরমাণু শক্তি কমিশন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা।

এদিকে জাপানের সুনামির পর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সির অধীনে এশিয়ায় তার প্রভাব যাচাইয়ে একটি প্রকল্প নেয়া হয়। ওই প্রকল্পের মাধ্যমে নিয়মিত সমুদ্রের পানি ও মাটি পরীক্ষা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে তেজস্ক্রিয়ার বিশেষ কিছু পাওয়া যায়নি। 

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে যেসব ভোগ্যপণ্য বিশেষ করে গুঁড়াদুধ, চকোলেট, শিশুখাদ্য, তাজা ফলসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়। সেগুলোর তেজস্ক্রিয়া চট্টগ্রামে এবং বিমান পরিবহনে যেসব পণ্য ঢাকায় আসে সেগুলো পরমাণু শক্তি কমিশনের ঢাকা অফিসের স্বাস্থ্য পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষা করা হয়। তবে স্ক্র্যাপ বা অন্য আরো কিছু পণ্য পরীক্ষা করার বিষয়ে কিছু জটিলতা রয়েছে।

অন্যদিকে বিশষজ্ঞদের মতে, যে কোনো মাত্রার তেজস্ক্রিয়াই মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। সাধারণত ১০০ রেডিয়ান বা তার কম মাত্রার তেজস্ক্রিয়া মানবদেহের রক্ত সঞ্চালনে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। তেজস্ক্রিয়ার মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ থাইরয়েড ক্যান্সার, ব্ল্যাড ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। তাছাড়া অধিক তেজস্ক্রিয়ায় (১০০০ রেডিয়ান বা তার বেশি) আক্রান্ত ব্যক্তির অস্বাভাবিক মৃত্যু এবং তাদের ভবিষ্যৎ কয়েক প্রজন্ম বিকলাঙ্গ হিসেবে জন্মলাভ করতে পারে।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমদানি নীতিতে স্পষ্টভাবে বলা আছে তেজস্ক্রিয়া আছে এমন পণ্য আমদানি করা যাবে না। এ মর্মে রফতানিকারক দেশের সনদ নেয়ার নিয়ম রয়েছে। সনদ দেখে কাস্টমস পণ্য খালাস করার অনুমোদন দেবে। এর পাশাপাশি এদেশেও পরীক্ষা করা হয়। তারপরও কোনো ঝুঁকি সৃষ্টি হলে অবশ্যই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সোনালীনিউজ/ঢাকা/আমা

add-sm
Sonali Tissue
রবিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩