মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২২ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩

আল্লাহর পথে আহ্বান

আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৩:৫৯ পিএম

আল্লাহর পথে আহ্বান

সদরুল আমীন রাশেদ, সোনালীনিউজ


ঢাকা: মানুষের জীবনে ও আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহর নির্দেশে নবী-রাসূলদের মাধ্যমেই দাওয়াত পরিচালিত হয়েছে। আমাদের নবী সা: পর্যন্ত সব নবীর কাজের সূচনা হয়েছে দাওয়াতের মাধ্যমে।

মহানবী সা:-এর দাওয়াত : পবিত্র কুরআনে বিভিন্ন নবীর দাওয়াত সম্পর্কে বলা হয়েছে : ‘হে নবী, আমি তোমাকে সাক্ষী করে পাঠিয়েছি, তোমাকে বাণীয়েছি জান্নাতের সুসংবাদদাতা ও জাহান্নামের সতর্ককারী। আল্লাহর অনুমতিক্রমে তুমি হচ্ছো আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী ও সুস্পষ্ট প্রদীপ।’ (সূরা আল আহজাব : ৪৫-৪৬)। ‘হে বস্ত্র আচ্ছাদনকারী, ওঠো আর সতর্ক করো এবং তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দাও।’ (সূরা আল মুদ্দাসির : ১-৩)।

আমাদের নবী সা: ও তাঁর জীবনের প্রথম গণভাষণে বলেন : ‘হে মানব জাতি, তোমরা ঘোষণা করো আল্লাহ ছাড়া সার্বভৌম মতার অধিকারী কেউ নেই। তাহলে তোমরা সফল হবে।’ (আল হাদিস)।

অন্য নবীদের দাওয়াত : ‘আমি নুহ আ:কে তার কাওমের কাছে পাঠিয়েছিলাম। তিনি কাওমকে ডাক দিয়ে বললেন, হে আমার কাওম; তোমরা আল্লাহর দাসত্ব করো। আল্লাহ ছাড়া তোমাদের আর কোনো ইলাহ নেই।’ (সূরা আল আরাফ : ৫৯)। ‘এবং আদ জাতির প্রতি আমি তাদের ভাই হুদ আ:কে পাঠিয়েছিলাম। তিনি বললেন, হে আমার দেশবাসী, তোমরা আল্লাহর দাসত্ব করো। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো ইলাহ নেই।’ (সূরা আল আরাফ : ৬৫)। ‘আমি অবশ্যই প্রত্যেক জাতির কাছে রাসূল পাঠিয়েছি, যাতে করে তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত করো এবং নাফরমান শক্তিকে বর্জন করো।’ (সূরা আন নাহল : ৩৬)। অনুরূপভাবে ছামুদ জাতির প্রতি তাদের ভাই ছালেহ আ: এবং মাদইয়ানবাসীদের প্রতি তাদের ভাই শোয়ায়েব আ: একইরূপ আহ্বান জানিয়েছেন।

দাওয়াতি কাজের গুরুত্ব : ‘হে রাসূল, যা কিছু তোমার ওপর নাজিল করা হয়েছে তোমার রবের প থেকে তা তুমি পৌঁছে দাও, যদি তুমি তা না করো তাহলে তো রেসালাতের হক আদায় হবে না। আল্লাহ তোমাকে মানুষের অনিষ্ট থেকে বাঁচিয়ে রাখবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ কখনো কোনো অবাঁধ্য জাতিকে পথ প্রদর্শন করেন না।’ (সূরা আল মাযড়দা : ৬৭)। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা: থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন একটি বাক্য হলেও আমার প থেকে মানুষের কাছে পৌঁছে দাও। আর বনি ইসরাইলদের থেকে আলোচনা করো তাতে কোনো দোষ নেই। তবে যে ব্যক্তি আমার ওপর ইচ্ছা করে মিথ্যা আরোপ করে (অর্থাৎ নিজের মনগড়া কথা হাদিস বলে চালিয়ে দেয়) তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। (বুখারি)।

দাওয়াতি কাজ ব্যক্তির কাজ : ‘তার কথার চাইতে আর কার কথা উত্তম হতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকে, সৎ কাজ করে এবং বলে আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সূরা হা মিম আস সিজদা : ৩৩)।

দাওয়াতি কাজ দলের কাজ : ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল অবশ্যই থাকতে হবে, যারা ন্যায়ের আদেশ দেবে এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখবে। আর সত্যিকার অর্থে তারাই সফলকাম হবে।’ (সূরা আল ইমরান : ১১০)।

দাওয়াতি কাজ জাতির কাজ : ‘তোমরাই সর্বোত্তম জাতি, সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের পাঠানো হয়েছে। তোমরা দুনিয়ার মানুষদের সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে এবং আল্লাহর ওপর ঈমান আনবে।’ (সূরা আল ইমরান : ১১০)।

দাওয়াতি কাজ রাষ্ট্রের কাজ : ‘আমি যদি এদের জমিনে মতা দান করি, তাহলে এরা নামাজ প্রতিষ্ঠা করবে, জাকাত আদায় করবে, সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে; তবে সব কাজের চূড়ান্ত পরিণতি একান্তভাবে আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত।’ (সূরা হজ : ৪১)।

দাওয়াতি কাজের কৌশল : আল্লাহর দাসত্ব কবুল এবং গায়রুল্লাহর দাসত্ব বর্জনের আহ্বান জানানোর এ কাজটা আল কুরআনে বিভিন্নভাবে ব্যক্ত করা হয়। কোথাও সরাসরি নির্দেশ আকারে এসেছে, যেমন সূরা নহলের শেষ দু’টি আয়াতে দাওয়াতের পদ্ধতি শেখাতে গিয়ে বলা হয়েছে : ‘বলে দিন হে মুহাম্মদ সা: এটাই আমার একমাত্র পথ, যে পথে আমি আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাই।’ (সূরা ইউসুফ : ১০৮)। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আপন পালনকর্তার পথের প্রতি আহ্বান করুন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও উপদেশ শুনিয়ে উত্তমরূপে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন পছন্দযুক্ত পন্থায়, তোমার মালিক ভালো করেই জানেন যে, কে তার পথ থেকে বিপথগামী হয়ে গেছে আবার যে ব্যক্তি হেদায়াতের পথে রয়েছে তিনি তার সম্পর্কেও সবিশেষ অবহিত আছেন।’ (সূরা আন নাহল : ১২৫)। হজরত আনাস রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘দাওয়াতি কাজ সহজ করো, কঠিন করো না। সুসংবাদ দাও, বীতশ্রদ্ধ করে তুলো না।’ (বুখারি ও মুসলিম)।

দাওয়াতি কাজের ফজিলত : এ কাজের ফজিলত সম্পর্কে রাসূল সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি হেদায়াতের আহ্বান জানাবে, সেও পাবে হেদায়াত অনুসরণকারীর সমান সাওয়াব। এ দু’জনের কারো সাওয়াবেও কমতি হবে না।’ (মুসলিম)। এ সম্পর্কে আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি কাউকে কোনো ভালো কথা বলে দেয়, তদনুযায়ী যে কাজ হবে, তার সাওয়াব সেও পাবে।’ (মুসলিম ও আবু দাউদ)।

দাওয়াতি কাজ না করার পরিণাম : হজরত আনাস রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, মেরাজের রাতে আমি দেখতে পেলাম কতগুলো লোকের দু’টি ঠোঁট আগুনের কাঁচি দিয়ে কাটা হচ্ছে। আমি জিব্রাইল আ:কে জিজ্ঞেস করলাম, ওরা কারা? তিনি বললেন, এরা হলো আপনার উম্মতের মোবাল্লিগ বা প্রচারক। যারা অন্যান্যেরকে নেক কাজ করার নসিহত করত, কিন্তু নিজেরা তা আমল করত না।’ (মিশকাত)।

সহজ ও সুস্পষ্ট ভাষায় পেশ : ইসলামের দাওয়াতকে সহজ ও সুস্পষ্ট ভাষায় পেশ করতে হলে একে তিনটি দফায় পেশ করা যায় :
সাধারণত সব মানুষকে এবং বিশেষভাবে মুসলমানদেরকে আল্লাহর দাসত্ব গ্রহণ করার আহ্বান জানাতে হবে।

ইসলাম গ্রহণ করার কিংবা তা মেনে নেয়ার কথা যারাই দাবি অথবা প্রকাশ করেন, তাদের সবার প্রতি আমাদের আহ্বান এই যে, আপনারা আপনাদের বাস্তব জীবন থেকে মুনাফেকি ও কর্মবৈষম্য দূর করুন এবং মুসলমান হওয়ার দাবি করলে খাঁটি মুসলমান হতে ও ইসলামের পূর্ণ আদর্শে আদর্শবান হতে প্রস্তুত হোন।

মানবজীবনের যে ব্যবস্থা আজ বাতিলপন্থী ও ফাসেক কাফেরদের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বে চলছে আর খোদাদ্রোহীদের হাতে বর্তমান পৃথিবীর যে নেতৃত্ব সন্নিহিত রয়েছে, আমাদের দাওয়াত এই যে, এই নেতৃত্বের আমূল পরিবর্তন করতে হবে এবং নেতৃত্ব কর্তৃত্ব আদর্শ ও বাস্তব উভয়েে ত্রই আল্লাহর নেক বান্দাদের হাতে সোপর্দ করতে হবে।
উল্লিখিত তিনটি বিষয় যদিও সুস্পষ্ট, তবুও দীর্ঘকাল পর্যন্ত এর ওপর ক্রমাগত ভুল ধারণা ও অবসাদ উপোর আবর্জনা পুঞ্জীভূত হয়েছে বলে আজ কেবল অমুসলিমই নয়, মুসলমানদের কাছেও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

‘পূর্ণরূপে ইসলামের মধ্যে দাখিল হও’ বলে আল্লাহর রাহে দাওয়াতের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ নিজেদের জীবনের কোনো একটি দিক বা বিভাগকেই আল্লাহর বন্দেগির বাইরে রাখতে পারবে না। পরিপূর্ণ সত্তা নিয়ে আল্লাহর গোলামি ও দাসত্ব করো, জীবনের কোনো একটি দিক বা কাজকেও আল্লাহর বন্দেগি থেকে মুক্ত রাখা চলবে না।

আল্লাহর নির্দেশ ও বিধানকে পরিত্যাগ করে, স্বাধীন ও স্বেচ্ছাচারী হয়ে অথবা কোনো স্বাধীন স্বেচ্ছাচারী মানুষের অনুসারী ও অনুগামী হয়ে চলা যাবে না। বস্তুত আল্লাহর রাহে দাওয়াতের এ অর্থই প্রচার করতে হবে, এরূপ দাওয়াত কবুল করার জন্যই আমাদেরকে মুসলিম-অমুসলিম সব মানুষকেই আহ্বান জানাতে হবে। (সংকলিত)

সোনালীনিউজ/ঢাকা/আকন

মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২২ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩