রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২০ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩

ঈমানের আমলের দাওয়াতি ময়দান

আপডেট: ১৫ জুন ২০১৬, বুধবার ১২:০৯ পিএম

ঈমানের আমলের দাওয়াতি ময়দান

যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করে নিজে সৎকর্ম করে এবং বলে আমিওতো একজন মুসলমানমাত্র- তার কথা অপেক্ষা উত্তম কথা আর কার? (সূরা : হামীম সিজদা, আয়াত : ৩৩) অর্থাৎ মুমিন কেবল নিজের ইমান আমল নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে না, অপরকেও ঈমান-আমলের দাওয়াত দেয়। মানুষের সেই কথাই সর্বোত্তম যাতে অপরকে সত্যের আহ্বান করা হয়। এতে মুখে, কলমে এবং অন্য যে কোনোভাবে মানুষকে সত্যের পথে আহ্বান করাই বুঝানো হয়েছে। মুয়ায্যিন সাহেবরাও এর অন্তর্ভুক্ত। তারা মানুষকে নামাজের দিকে, আল্লাহর দিকে আহ্বান করেন। হজরত আয়শা (রা.) বলেন, আয়াতটি মুয়ায্যিন সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। (তাফসীরে ইবনে কাছীর) তুরাগ-তীরে, টঙ্গীর ময়দানে প্রতিবছর বিশ্ব ইজতেমার মাধ্যমে বিশ্ব মানবতাকে যে সত্যের পথে আহ্বান করা হয় তাও এ আয়াতের বক্তব্যের শামিল। বিশ্বের নানা প্রান্তের নানা ভাষা ও বর্ণের মানুষ এক হয়ে যেভাবে ঈমান-আমলের কথা বলছেন ও শুনছেন, স্বার্থহীনভাবে অন্যান্যের আল্লাহর পথে আহ্বান করছেন তা পবিত্র কোরআনের ভাষায় ‘আহসানু কাওলান’ উত্তম কথা হবে না কেন? বছরজুড়েই গোটা বিশ্বময় দাওয়াত ও তাবলিগের এ মেহনত চলতে থাকে। আর বছরে একবার তারা জড়ো হন তুরাগ তীরে বিশ্ব ইজতেমায়।
মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা প্রত্যেক মুমিনেরই কর্তব্য। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান কর হিকমত ও সদুপদেশ দিয়ে এবং তাদের সঙ্গে তর্ক করবে উত্তম পন্থায়।... (নাহল : ১২৫)
পবিত্র কোরআনের এ আয়াতের আলোকে বলা যায়, হিকমত ও সদুপদেশের মাধ্যমে সমকালীন সব ধরনের প্রচার মাধ্যমকে ব্যবহার করেই দাওয়াতের কাজ করতে হবে। সমকালীন মাধ্যমকে উপেক্ষা করে দাওয়াতের কাজকে পূর্ণতা ও কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। হজরত আদম (আ.) থেকে নিয়ে আখেরি নবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জমানা পর্যন্ত সব নবীর দাওয়াতী কর্মপদ্ধতি থেকে সেটা সহজেই অনুমেয়।
যে যুগে যে বিষয়ের অধিক চর্চা ছিল মহান আল্লাহতায়ালা সে যুগের নবীকে সে রকম মুজেজা-অলৌকিক বিষয় দিয়ে পাঠিয়েছেন। হজরত ঈসা (আ.) প্রেরিত হয়েছিলেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির যুগে, আল্লাহতায়ালা তাকে অলৌকিক চিকিৎসা ক্ষমতা দিয়েছিলেন। তিনি জন্মান্ধকে দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন করে তুলতে পারতেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, আমি জন্মান্ধ ও শ্বেত-কুষ্ঠ রোগীকে সুস্থ করে তুলি, আর আমি আল্লাহর হুকুমে মৃতকে জীবিত করে দেই। (আলে ইমরান : ৪৯) হজরত মুসা (আ.) যখন নবি হিসেবে প্রেরিত হন তখন জাদুবিদ্যা চর্চার যুগ ছিল। আল্লাহতায়ালা তাকেও সে রকম মুজেজা দিয়েছিলেন। তিনি তার লাঠি মাটিতে ফেললে তা বিরাট অজগরে পরিণত হতো। বগলের নিচ থেকে হাত বের করলে তা প্রদীপ্ত ও উজ্জ্বল হয়ে যেত। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, তিনি তার লাঠি ফেললেন, তৎক্ষণাৎ তা জ্বলজ্যান্ত এক অজগরে রূপান্তরিত হয়ে গেল। আর নিজের হাত বের করলেন, সঙ্গে সঙ্গে তা দর্শকদের চোখে ধবধবে উজ্জ্বল দেখাতে লাগল। (আরাক : ১০৮-৯) হজরত মুহাম্মদ (সা.) আরবে সাহিত্য চর্চার যুগে রাসূল হিসেবে আবির্ভূত হন। আল্লাহতায়ালা তাকে সর্বোৎকৃষ্ট মুজেজা হিসেবে দিয়েছিলেন পবিত্র কোরআন। পবিত্র কোরআন সর্বোচ্চমানের সাহিত্য সমৃদ্ধ। অলংকার শাস্ত্রের বিবেচনায় অত্যুঙ্গাশৃঙ্গের। মানুষের পক্ষে এমনটি রচনা করা অসম্ভব। পবিত্র কোরআনে চ্যালেঞ্জ করে বলা হয়েছে, তোমরা পারলে কোরআনের সবচেয়ে ছোট্ট সূরার মতো একটি সূরা রচনা কর। আরবের নামি-দামি সব কবি-সাহিত্যিক একত্র হয়ে সে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারেনি। কিয়ামত পর্যন্ত কেউ পারবেও না। সাহিত্য চর্চার সোনালী যুগে আবির্ভূত হয়ে হজরত মুহাম্মদ (সা.) দ্ব্যর্থহীন বলিষ্ঠ ঘোষণা দিলেন, আমি আরব জাতির মধ্যে সর্বাধিক বিশুদ্ধ ভাষী। তোমরা যে সাহিত্য প্রতিভা নিয়ে বড়াই কর আমি সে ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। এগিয়ে। মহান আল্লাহতায়ালার এই অমোঘ নীতি থেকে সহজেই প্রতীয়মান হয়, সমকালীন বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে অবজ্ঞা-অবহেলা নয়, সত্য-ন্যায়ের পথে তার যথোচিত সদ্ব্যবহারই মহান আল্লাহর নির্দেশনা। দাওয়াত ও তাবলিগের কাজে সমকালীন সব মিডিয়ার সঠিক যথাযথ ব্যবহারই কাম্য। ইসলাম কখনও বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে অবজ্ঞা-অবহেলা করেনি। বরং সেদিকে পথ প্রদর্শন করেছে। যুগের বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে শিখিয়েছে। হজরত মুহাম্মদ (সা.) এ ব্যাপারে একটি উদার অসংকোচ ঘোষণা দিয়েছেন, তোমাদের পার্থিব বিষয়ে তোমরাই ভালো জানো। সভ্য-শালীন জনকল্যাণকর যেকোনো আবিষ্কার এবং তার সঠিক ন্যায়ানুগ ব্যবহার অনুমোদন করা হয়েছে এই হাদিসে।
দাওয়াত ও তাবলিগের মহান কাজে ও বিজ্ঞান প্রযুক্তির নির্দোষ ব্যবহারে বাধা কোথায়?
সময়টা এখন প্রযুক্তির, কী ব্যক্তিগত জীবন কী জাতীয় জীবন প্রযুক্তি ছাড়া ভাবাই যায় না। ভাবছেও না কেউ। বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে কে কত বেশি আঁকড়ে ধরবে সে প্রতিযোগিতা আজ সর্বত্র। ইউরোপ আমেরিকা থেকে শুরু করে এশিয়ার জীর্ণ কুটিরে, শহরে, গ্রামে, অজপাড়াগাঁয়ে আজ প্রযুক্তির ছোঁয়া। নতুন এ মিলেনিয়ামে প্রযুক্তি যেন মানব জীবনের সবটুকু দায়িত্ব নিজ কাঁধে নিয়ে নিয়েছে। প্রযুক্তি অস্বীকার করলে প্রযুক্তি থেকে পিছিয়ে থাকলে ছিটকে পড়তে হবে সময় থেকে, জীবন থেকে। দীন ইসলামের দাওয়াত ও তাবলিগের কাজও প্রযুক্তিকে ব্যবহার না করলে পূর্ণতাই যেন আসবে না। কাক্সিক্ষত গন্তব্যেও যেন পৌঁছা সম্ভব হবে না। বিশ্ব ইজতেমার মাঠে, দাওয়াত ও তাবলিগের কাজে, বছরময় তাবলিগি কর্মকা-ে প্রযুক্তিকে যাঁরা এড়িয়ে চলছেন তারা কি নিজ প্রয়োজনে প্রযুক্তিকে উপেক্ষা করতে পারছেন?
ব্যক্তিগত বিষয়, চিকিৎসা, পড়ালেখা, অফিসিয়াল কার্যক্রম, ব্যবসা-বাণিজ্যে, যোগাযোগ, সংবাদ আদান-প্রদান, বিনোদন- সবই এখন প্রযুক্তি নির্ভর। প্রয়োজনের সব ক্ষেত্রে বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে ব্যবহার করা সত্ত্বেও দাওয়াত ও তাবলিগের কাজে প্রযুক্তির ব্যবহারে আপত্তি কেন?
মানুষের ব্যবহারের গুণে অথবা দোষে বিজ্ঞান আশীর্বাদ অথবা অভিশাপে পরিণত হয়। বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে মহৎ কাজে মানবতার কল্যাণে যেন ব্যবহার করা হয় সেদিকে সবাইকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক্স ও সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব এখন প্রতিটি মানুষের জীবনে সুস্পষ্ট। এমন পরিস্থিতিতে দাওয়াত ও তাবলিগের জগৎ বিস্তৃত কাজের কথা এসব মিডিয়া ছাড়া কীভাবে ভাবা যায়। তাই এসব মিডিয়াকে বাদ দিয়ে নয়, সঠিক ব্যবহার করে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজকে কীভাবে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া যায় তাই ভাবতে হবে জিম্মাদারদের।
ইহ ও পারলৌকিক মানব কল্যাণই দাওয়াত ও তাবলিগ এবং বিশ্ব ইজতেমার মূলমন্ত্র, মুসলিম উম্মাহার দায়িত্ব-কর্তব্যই জনকল্যাণ। মহান আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত। মানবজাতির কল্যাণে তোমাদের আবির্ভাব। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দাও, অসৎ কাজে বাধা দাও এবং আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন কর।... (আলে ইমরান : ১১০)।
মানব কল্যাণ, শাশ্বত কল্যাণের পথে আহ্বানই মুসলমানদের ব্রত। একটি জনগোষ্ঠীকে এই ব্রত নিয়ে মশগুল থাকতে হবে সদা সর্বদা। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে যেন এমন একটি দল থাকে যাঁরা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে। সৎকাজের নির্দেশ দিবে। অসৎ কাজে নিষেধ করবে। এরাই সফলকাম। (আলে ইমরান : ১০৪)
দাওয়াত ও তাবলিগও সেই দলেরই অন্তর্ভুক্ত বলে আশা করাই যায়। বাংলাদেশের মানুষের সৌভাগ্য প্রতিবছর এই দাওয়াত ও তাবলিগের বিশ্ব ইজতেমা তুরাগ তীরে অনুষ্ঠিত হয়। মানব কল্যাণে দাওয়াত ও তাবলিগের অগ্রযাত্রা অব্যাহত। বাংলাদেশের মানুষ সে অগ্রযাত্রার সহযাত্রী হোক- এই প্রত্যাশা।
লেখক : শায়খে সানী ও প্রধান মুফতি, চৌধুরীপাড়া মাদ্রাসা, খতিব, মুহাম্মদিয়া দারুল উলুম জামে মসজিদ, পশ্চিম রামপুরা, ঢাকা (সংকলিত)

রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২০ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩