রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২০ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩

ঈমান পোক্ত করে কোরআন চর্চা

আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৩:৫৮ পিএম

ঈমান পোক্ত করে কোরআন চর্চা

আবু সাঈদ খান, সোনালীনিউজ


ঢাকা : প্রতিদিন আমরা কোরআন নিয়ে বসব, সকাল-সন্ধ্যায় (বুকরতাও অআসিলা)। নিজে পড়ব, পরিবার-পরিজন, স্নেহের সন্তান, বাসার অন্য সব সদস্যের মুখেই তা একই সঙ্গে তুলে দেব। অল্প অল্প করে পড়ব (অরাত্তিলিল কোরআনা তারতিলা-৭৩.৪), তবে তার জন্য বেশি সময় দেব, যেন তার অন্তর্নিহিত তথ্য ও সত্য, শিক্ষা ও সৌন্দর্য, তার মর্ম ও গাম্ভীর্য, তার আবেদন আর নির্দেশনা আমাদের ভেতরে অনুপ্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও সুযোগ পায়।

মুদ্রিত কপির সঙ্গে ডেক্সটপ, ল্যাপটপ, আইপ্যাড, মোবাইল হ্যান্ডসেট প্রভৃতিতে সংরক্ষণ করেও আমরা সর্বাবস্থায় কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি চূড়ান্ত ও সর্বশেষ আসমানি কিতাব আল-কোরআন পৃথিবীতে আবির্ভূত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত মানবজাতি তার যথাযথ পরিচয় পেতে উদ্যোগী হয়নি। এ মহান গ্রন্থখানা পুরো মানবজাতির জন্য, কিন্তু যারা এটিকে তাদের ধর্মগ্রন্থ বলে মনে করে, সেই মুসলমান সম্প্রদায় একে পরিত্যক্ত (মাহজুরা) করে রেখেছে। সম্প্রদায়ের যে গোষ্ঠী এ গ্রন্থের ধারক-বাহকের দাবিদার তারা আহবার-রুহবানদের (৯.৩৪) মতোই একে দুনিয়া কামানোর হাতিয়ারে পরিণত করেছে। আমাদের দ্বারা সেই চর্চা হয়নি যা কোরআন দাবি করে (২.১২১, ৩৫.৩২, ৭৩.৪, ৭৩.২০, ৭৫.১৬); সেভাবে চিন্তা-ফিকির করিনি যেমন তাগিদ দেয়া হয়েছে (১৭.৪১, ২৩.৬৮, ৩৮.২৯, ৪৭.২৪)। বস্তুত আমাদের কর্তৃক এই মহামূল্যবান দলিলের হক আদায় হয়নি।

এই সর্বপ্লাবী নাই-এর মধ্যেও কোরআনের সমঝদার আল্লাহর কিছু দাস দেশে দেশে অবশ্যই আছেন যারা তা থেকে নূর লাভ করতে তাদের নৈমিত্তিক ক্ষুধা মেটাতে, আল্লাহ প্রদত্ত হেদায়েতের ওপর দৃঢ় থাকতে, মানুষকে দ্বীনের পথে আহ্বান করতে সতত কোরআনের কাছে ফিরে আসেন। যেহেতু তারা বারবার ফুরকানের শরণাপন্ন হন, তাই খুব সহজেই সত্য থেকে মিথ্যা বা বাতিলকে আলাদা করে চিহ্নিত করতে পারেন। তারা চিন্তা-চেতনায় অনেক অগ্রগামী। খন্ডিত ইসলামের যে বহুজাতিক পরিবেশে আমাদের জন্ম তার লেবাসধারী সদস্যদের অন্তঃসারশূন্যতা এদের চোখে সহজেই পরিদৃষ্ট হয়। তবে কখনোই তারা গর্বিত নয়। কোরআন তাদের ঈমানকে প্রতিনিয়ত বর্ধিতই করে, হেদায়েতকে বৃদ্ধি করতে থাকে (১৯.৭৬, ৪৭.১৭)।

‘অতঃপর আল্লাহ যাকে পথ-প্রদর্শন করতে চান, তার হৃদয়কে ইসলামের জন্য উম্মুক্ত করে দেন (৬.১২৫)-ফামাইয়্যুরিদিল্লাহু আইয়্যাহদিয়াহু ইয়াশরহ সদরহু লিল ইসলাম। ‘আল্লাহ ইসলামের জন্য যার হৃদয় উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, অতঃপর সে তার প্রতিপালকের আলোর ওপর রয়েছে (ফাহুয়া ‘আলা নূরিম্ মিররব্বিহি)’- ৩৯.২২। কোরআন হচ্ছে সেই নূর (৪.১৭৪)।

তাদের কোন সিল, প্যাড বা বাজারি নামের প্রয়োজন পড়ে না। তাদের ধর্ম একমাত্র ‘ইসলাম’ (৩.১৯) এবং আরশ থেকে তাদের নাম-চয়ন করা হয়েছে ‘মুসলমান’ (২২.৭৮) তাতেই তারা তৃপ্ত। রকমারি নাম বাণিজ্য আর নিবন্ধনের জন্য দৌড়ঝাঁপ করার দরকার তাদের পড়ে না। ‘মুসলমান’ নাম-পরিচয়ে ‘কোরআন‘কে সঙ্গে করে ‘ইসলামে’ই তারা প্রশান্তচিত্তে সমর্পিত। কোরআনই সুনির্দিষ্ট করে জানিয়ে দেয় তাদের কর্তব্যকর্ম। তাদের তাবলিগার সাজার দরকার পড়ে না, মুরিদান, আশেকান, জাকেরান, কর্মী-সমর্থক-লিডার হওয়ার দরকার হয় না। বেসাতি করার জন্য এগুলো বহুত জরুরি। ভূমি, তামাশা, ষড়যন্ত্র চালু রাখতে এগুলোর দরকার হয়।
প্রতিদিন আমরা কোরআন নিয়ে বসব, সকাল-সন্ধ্যায় (বুকরতাও অআসিলা)। নিজে পড়ব, পরিবার-পরিজন, স্নেহের সন্তান, বাসার অন্য সব সদস্যের মুখেই তা একই সঙ্গে তুলে দেব। অল্প অল্প করে পড়ব (অরাত্তিলিল কোরআনা তারতিলা-৭৩.৪), তবে তার জন্য বেশি সময় দেব, যেন তার অন্তর্নিহিত তথ্য ও সত্য, শিক্ষা ও সৌন্দর্য, তার মর্ম ও গাম্ভীর্য, তার আবেদন আর নির্দেশনা আমাদের ভেতরে অনুপ্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও সুযোগ পায়। মুদ্রিত কপির সঙ্গে ডেক্সটপ, ল্যাপটপ, আইপ্যাড, মোবাইল হ্যান্ডসেট প্রভৃতিতে সংরক্ষণ করেও আমরা সর্বাবস্থায় কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি। প্রতিদিন আমরা বাইরে অনেকটা সময় কাটাই সবসময়ই তা পরিকল্পনা মাফিক হয় না, অনেক সময় শ্রমের অপচয় হয়। ব্যাগে যদি কোরআনের কপি রাখতে পারি বা কাগজে একটা আয়াত তুলে নিতে পারি, হ্যান্ডসেটে বিভিন্ন সুরা সংরক্ষিত থাকে, তবে কোন দূর-যাত্রার মূল্যবান সময়কে ততধিক মূল্যবান কাজে লাগাতে পারি। যখন এ কাজটি করব, শুধু আমি একাই লাভবান হব না, পাশের যাত্রীসাধারণের কাছেও অজান্তেই খুব জরুরি ম্যাসেজ পৌঁছে দেব। আল্লাহ চাহেন তো, কোন বাক্য বিনিময় ব্যতীতই কেউ হয়তো এই দাওয়াতটি কবুল করবেন। অস্থির সমাজের নানা ব্যাধি নির্মূলে আমরা কত যুদ্ধ-জিহাদই না করছি, বছরের পর বছর মিলিয়ন-ডলার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। যদি কোরআনকে আমরা সেই মর্যাদায় ধারণ করতে পারতাম, ক্ষয়িষ্ণু মানুষগুলো জান্নাতি হয়ে যেত, আসমানি শান্তি ধরায় নেমে আসত। এটা কোরআনেরই দাবি, আমরা সবাই মিলে কোরআনকে দৃঢ়তার সঙ্গে ধারণ করি, সবাই। এটা সবচেয়ে সহজ, অনায়াসসাধ্য। নিঃশ্বাস নেয়ার মতোই অপরিহার্য, আবার সহজলভ্য।

ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার সঙ্গে দলীয়ভাবেও কোরআন পাঠ জরুরি। আর সেটা অংশগ্রহণমূলক বা পার্টিসিপেটরি হলেই ভালো হয়। অংশগ্রহণের পদ্ধতি কী হবে তা আলোচিত হতে পারে। প্রত্যেকে প্রত্যেকের সমঝ জানার সুযোগ পেয়ে উপকৃত হন। এক-পাক্ষিক হলে যারা শ্রোতা তারা অলস শ্রোতা হয়েই থাকেন, বিষয়ের গভীরে প্রবেশের দায় তৈরি হয় না। এ প্রক্রিয়ার আর একটি নেতিবাচক দিক হল এখানে যিনি বক্তা, অন্য কোরআন পাঠকদের উপলব্ধিগুলো জানার সুযোগ তার জন্য অবরুদ্ধ হয়ে যায়। আমরা কোরআন-চর্চার এই মহত্তম প্রক্রিয়াকে পার্থিব আর পাঁচটি বিষয়ের মতো কুক্ষিগত না করি। খোলামেলা হলে একটি স্বাস্থ্যকর অবস্থা তৈরি হবে। আসরে আগত আল্লাহর বান্দাদের কোন আয়াতের বিপরীতে অনেক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শোনানোর আগে বেশি জরুরি আল্লাহর সেই বাণীটিই তাদের মুখে তুলে দেয়া। কল্যাণ কাজে সবাই প্রতিযোগিতামূলকভাবে এগিয়ে যাব (ফাসতাবিকুল খইরতি- ২.১৪৮, ৫.৪৮)। প্রতিযোগিতার সেই ক্ষেত্রটিকে রুদ্ধ না করে আমরা যদি উন্মুক্ত করে দেই তবে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত লাভ অধিক হওয়ার সম্ভাবনা। আল্লাহর নৈকট্য লাভের অভিযাত্রায় যারা এগিয়ে তাদের অগ্রগামী (সাবিকুন) থাকতে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে (৫৬.১০-১১)।

যখন কোন কোরআন-চর্চার আসরে কথা বলার নিয়ম না থাকে, অথচ কারও তাগিদ তৈরি হয়, তখন তার প্রকাশ হয় অনিয়ন্ত্রিত, উপস্থাপনা হয় অগোছালো নেহায়েত যদি তা অনুপেক্ষণীয় হয়। আর যদি শ্রোতাবর্গ আকাক্সক্ষা আর তাগিদকে প্রতিনিয়তই দমন করে যেতে থাকেন তবে একসময় এ জাতীয় অনুষ্ঠানের ব্যাপারে তাদের আগ্রহের ঘাটতি হতেই পারে।

অন্যদিকে আসরের চরিত্রটি যদি হয় এমন, আগ্রহী সবাইকে তাদের বোধগম্যতা পেশ করতে হবে, সেক্ষেত্রে প্রত্যেকেই অধিকতর মনোযোগী হবেন নির্দিষ্ট পাঠটি সাধ্যমতো দেখে ও শিখে আসতে। আর নির্ধারিত সময়ে যখন তিনি উপস্থাপন করবেন, তখন তার মধ্যে দায়িত্বশীলতা আর পরিমিতিবোধ ফুটে উঠবে। তখন তারা শুধু দেহ নিয়েই হাজির হবেন না, একটি অধ্যবসায়ী মন আর সক্রিয় মস্তিষ্ক নিয়ে আসবেন। দু’চারজন ভালো বক্তার বিপরীতে আমাদের সবার স্বার্থেই কোরআনের অধিক সংখ্যক দায়িত্বশীল পাঠক বেশি প্রয়োজনীয়।

এক-পাক্ষিক বক্তব্য বিপজ্জনক, অন্তত যিনি বলেন তার জন্য। এটা ভেবে নেয়ার কারণ নেই যে, সবাই আলোচনা রাখার যোগ্যতা রাখে না। এ জাতীয় চিন্তা আঘাতী। আমরা সম্ভাব্য অধিক সংখ্যক কোরআন-চর্চাকারীর বয়ান শুনব।(সংকলিত)

সোনালীনিউজ/ঢাকা/আকন

রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২০ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩