রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২০ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩

উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে শিশু ও নারী নির্যাতন

আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৩:৫৮ পিএম

উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে শিশু ও নারী নির্যাতন

সোনালীনিউজ রিপোর্ট

সারাদেশে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে শিশু ও নারী নির্যাতন। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, পারিবারিক মূল্যবোধ আর সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে দিন দিন বাড়ছে এ ধরণের অপরাধ। তবে আইন-শৃঙ্খলা বহিনী বলছে, উৎকন্ঠার কিছু নেই- অপরাধ স্বাভাবিক পর্যায়েই আছে।

পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সূত্র মতে, গত মাসের প্রথম দিনে কুষ্টিয়ার খোকসার হিলালপুর গ্রামে সামেলা খাতুন নামে এক গৃহবধু তাকে উত্যক্তের প্রতিবাদে থানায় অভিযোগ করলে পুলিশ দু’জনকে গ্রেফতার করে। রাতে আটকের পর সকালে সবাই ছাড়া পেয়ে অভিযোগ করার অপরাধে ওই গৃহবধূকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে মাথার চুল কেটে মুখে চুন-কালি মাখিয়ে নির্যাতন করে। এখানেই ক্ষান্ত হয়নি, গৃহবধূকে তারা রাস্তার পাশে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখে। পরে দুই শিশুপুত্র ও তাদের খেলার সাথী আহত মাকে উদ্ধার করে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।

গত মাসের শেষ সপ্তাহে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নে সালিস বৈঠকে এক গৃহবধূ ও এক যুবককে কক্ষে আটকে রেখে মারধর করে তাদের মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া হয়। একই সূত্র অনুযায়ী, এর আগে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে যৌতুকের দাবিতে ফাতেমা আক্তার সীমা নামের এক গৃহবধূকে স্বামী রোকন হোসেন পিটিয়ে হত্যা করে। একই মাসে চর গজারিয়ায় ধর্ষণের শিকার হয় তৃতীয় শ্রেণীর এক ছাত্রী।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে যৌতুকের দাবিতে এই জেলাতেই খুন হয়েছেন ৭ জন নারী, শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৬৪ জন। ধর্ষণ, যৌন হয়রানি ও অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ১৫৭ টি। কুমিল্লায় গত ৩ মাসে পারিবারিক কলহে খুন হয়েছে ৬ জন শিশু। এমন আশঙ্কাজনক হারে শিশু হত্যার ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, সামাজিক অবক্ষয়ের কারণেই বাড়ছে নারী ও শিশু হত্যা। তাদের মতে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় নারী এবং শিশু নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে।

প্রতিদিন সারাদেশে অহরহই ঘটছে নারী ও শিশু নির্যাতনের এমন ঘটনা। দেশের ৫৫টি জেলায় নিজস্ব কর্মীদের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের এক প্রতিবেদনের সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে ৭৪ শতাংশ। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নারীর প্রতি সহিংস ঘটনার ৬৮ শতাংশই নথিভুক্ত হয় না। নথিভুক্ত হলে সংখ্যাটি আরও বাড়ত।

অন্যদিকে, চলতি বছর বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নারী নির্যাতনের এই ধারা আশংকাজনকভাবে অব্যহত রয়েছে। এরই মধ্যে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যাকান্ড নিয়ে সারা দেশে বিক্ষোভ চলছে। এদিকে, বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের মোট মামলা ছিল ১৭ হাজার ৭৫২টি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ২২০টি। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওয়েবসাইটেও গুরুত্বপূর্ণ মামলার তালিকায় ‘নারী নিপীড়ন’ শিরোনামে মামলার তথ্য দেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে এ শিরোনামে ১০০ মামলার কথা উল্লেখ আছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নারী অধিকার কমিটির চেয়ারপারসন অধ্যাপক মাহফুজা খানমের মতে, আগের তুলনায় নারী নির্যাতনের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। দেশের নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়েছেন, তা যেমন সত্য; তেমনি নির্যাতন পিছু ছাড়ছে না- তাও সত্য। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, ডিজিটাল সংস্কৃতি, আইনের কঠোর প্রয়োগ না হওয়া, ধনতান্ত্রিক সমাজের অস্থিরতাসহ বিভিন্ন কারণে নির্যাতন বাড়ছে। পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধে ‘আমরাই পারি’ জোটের চেয়ারপারসন সুলতানা কামালও মনে করেন, নারী নির্যাতনের মূল কারণ সমাজ ও পরিবারে নারীর অধস্তন অবস্থা। অনেক মৌলিক মানবাধিকারের প্রশ্নেও নারীরা পুরুষতান্ত্রিকতার সঙ্গে আপস করছেন। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ) আইনসহ সরকার বিভিন্ন উদ্যোগও নিয়েছে। তবে আইন ও অন্যান্য উদ্যোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে যা যা করা দরকার, তা সেভাবে হচ্ছে না।

এ ব্যাপারে, জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেছেন, প্রচলিত আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে সচেষ্ট রয়েছে সরকার। গত সপ্তাহে সিলেট হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহ মসজিদে নামাজ আদায় শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ মন্তব্য করেন স্পিকার। স্পিকার আরো বলেন, বাংলাদেশে কোনো ধরনের নারী নির্যাতনকে প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই। যেকোনো ধরনের নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, এটাই সরকারের অবস্থান।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

add-sm
Sonali Tissue
রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২০ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩