বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮, ২৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫

এবারের নির্বাচন আ.লীগের জন্য খুবই জটিল ও কঠিন 

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১০ আগস্ট ২০১৮, শুক্রবার ০৩:১৬ পিএম

এবারের নির্বাচন আ.লীগের জন্য খুবই জটিল ও কঠিন 

ঢাকা: প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দিন যতই ঘনিয়ে আসছে রাজনৈতিক উত্তাপও ততই বাড়ছে। চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। আগামী নির্বাচন খুবই জটিল, কঠিন ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগ ও সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। 

তাদের মতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করলেও এবারের নির্বাচনে বিএনপি জোট আসার সম্ভাবনাই বেশি। তাছাড়া বিএনপির মতো একটি বড় দল স্বেচ্ছায় ভোট বর্জন না করলে তাদের ভোট থেকে বিরত রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আর বিএনপি নির্বাচনে এলে হিসাব-নিকাশও পাল্টে যেতে পারে। 

সরকার মনে করছে, দীর্ঘ দুই মেয়াদে ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং জেল-জুলুম ও রোষানলের শিকার বিএনপির বিজয় কোনোভাবেই নিরাপদ হবে না। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলটি চাচ্ছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় মহাজোটের পরিসর আরো বাড়াতে। 

সূত্র জানায়, নির্বাচনের আগে ছোট ছোট দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত হচ্ছে নতুন জোট। ইতোমধ্যে বামপন্থী আটটি দলের সমন্বয়ে সিপিবির নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক জোট হয়েছে। আগামীতে ডান ও বামপন্থী ছোট ছোট দল নিয়ে একাধিক জোট গঠন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ওই জোটগুলো আগামী নির্বাচনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করবে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা। এসব জোট নিয়ে প্রকাশ্যে তেমন কিছু না বললেও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড অনেকটা চিন্তিত। 

সূত্র জানায়, গত ১৮ জুলাই বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এ দলগুলো মিলে নতুন একটি বাম রাজনৈতিক জোট গঠিত হয়েছে। নতুন জোট গঠনের ওই একই দিনে ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় মহাজোটের বাইরে থাকা গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স, সম্মিলিত ইসলামিক জোট, কৃষক শ্রমিক পার্টি, একামত আন্দোলন, জাগো দল, ইসলামিক ফ্রন্ট এবং গণতান্ত্রিক জোটসহ ৯টি দলের নেতাদের সাথে বৈঠক করেন আওয়ামী লীগ নেতারা। এরপরের দিন রাতে জরুরি বৈঠকে বসে বিকল্পধারা বাংলাদেশ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা পার্টি এবং নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে গত ডিসেম্বরে গঠিত যুক্তফ্রন্টের নেতারা। গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে তারা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে সমদূরত্ব রেখে জাতীয় ঐক্য গঠনের আগাম ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। অন্য দিকে বিএনপিও বর্তমান সরকারকে হটাতে বিরোধী দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় ঐক্য গঠনের কথা বলছে। 

এ নিয়ে এখন দরকষাকষি চললেও বিভিন্ন জোটের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে যে পদ্ধতিতেই জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠুক না কেন তা যে সরকারের পক্ষে না সেটা মোটামুটি স্পষ্ট। নতুন বামপন্থী জোটের বাইরে জাতীয় মুক্তি জোট নামে আরেকটি বামপন্থী জোট সক্রিয় রয়েছে। যাতে রয়েছেন বিশিষ্ট কলামিস্ট বদরুদ্দিন উমরের জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, গণফ্রন্টসহ বেশ কয়েকটি দল। এর বাইরেও যেসব বামপন্থিদল আছে তাদের অবস্থানও সরকারের পক্ষে নেই। বিভিন্ন সমাবেশের মাধ্যমে তারা নিজেদের অবস্থান ইতোমধ্যে পরিষ্কার করেছে। ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর এ জোট গঠন এবং নির্বাচন সামনে রেখে নতুন তৎপরতা ক্ষমতাসীনদের ভাবনায় ফেলে দিয়েছে। 

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই জোট গঠনের তোড়জোড় শুরু হয়। এতে কিছু নেতা আছেন, যারা জনগণের কাছে নিজেদের মূল্য যাচাই করে নেন। আবার অনেক রাজনীতিক আছেন, এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে নিজেরা আর্থিকভাবে লাভবান হন। অনেকেই অনেক এজেন্ডা নিয়েও নামেন। এবারো তেমন কিছু যে একেবারে নেই সেটা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। এ দিকে ছোট ছোট দলগুলো মিলে জোট গঠন করছে এবং একাধিক জোট গঠনের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে এবার যেসব দলগুলো মিলে জোট গঠিত হয়েছে তাদের অধিকাংশই সরকারের বিরুদ্ধে সুযোগ পেলেই বিষোদগার করছে। আগামীতে মধ্যম সারির দলগুলো নিয়ে যে জোট গঠনের কথা শোনা যাচ্ছে তারাও সরকারের সাথে থাকছে না এটাও মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। 

মহাজোটের অংশীদার হিসেবে আছে জাতীয় পার্টি। ওই জোটে যুক্ত হওয়ার তালিকায় রয়েছে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার ৯ দলীয় জোট বিএনএ। নাজমুল হুদা মহাজোটে যুক্ত হলে নৈতিকতার প্রশ্নে বামপন্থীরা আওয়ামী লীগের সাথে নাও আসতে পারে। তবে আওয়ামী লীগ চাইছে বামপন্থীরা তাদের জোটে না আসুক। কিন্তু বিএনপির জোটে যেন না যায়। যদি বিএনপির সাথে যুক্ত হয় সে ক্ষেত্রে রাজনীতির সমীকরণ আওয়ামী লীগের জন্য বেশি জটিল হয়ে যাবে। সেজন্য ছোট ছোট দলগুলোর সাথে যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে। আগেভাগেই ওই দলগুলোর বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে ঘটা করে গত ২৪ জুলাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সিপিবি সভাপতি মোজাহিদুল ইসলাম সেলিমের সাথে বৈঠকও করেন।

গত ২৬ জুলাই ওবায়দুল কাদেরের সাথে বৈঠক করেন কাদের সিদ্দিকী। এর কিছুক্ষণ পর নাজমুল হুদা পৃথক বৈঠক করেন। এ ছাড়াও ২০ দলীয় জোটের কিছু দুর্বল এবং অনিবন্ধিত প্রভাবশালী দলের সাথে ওবায়দুল কাদেরের বৈঠকের কথা রয়েছে। যাদের আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাথে না এলেও অন্তত বিএনপির পক্ষে যেন কথা না বলে সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য কিছু কাজ করা হচ্ছে বলে আভাস দিয়েছেন দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা। বিভিন্ন দলের সাথে আওয়ামী লীগের আলোচনার বিষয়ে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, এগুলো একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে। আপনাদের জোটে তাদের চান কি না- জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, আমরা চাইলে তো হবে না, তারাও তো চাইতে হবে। এই চাওয়াটা তো আমাদের ওপর নির্ভর করবে না।  

আওয়ামী লীগের অন্যতম মুখপাত্র ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ছোট ছোট দলগুলো তাদের গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য নির্বাচনের আগে জোট গঠন করে। আবার ভেঙে যেতেও দেখা গেছে। রাজনীতির ক্ষেত্রে এগুলো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বামপন্থী দলগুলোর সাথে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির একটি মিল রয়েছে। তাহলো মৌলবাদীরা যখন দেশে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তারাও তখন সোচ্চার হয়। 

আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন নতুন জোট গঠন প্রসঙ্গে বলেন, প্রথমত দেশী ও আন্তর্জাতিক ফর্মুলার অংশ হিসেবে এসব জোট গঠন হয়। তারা সেইভাবে কাজ করে। দ্বিতীয়ত : নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ছোট ছোট দলগুলো জোট গঠন করতে পারে। কারণ জনবল না থাকায় ছোট ছোট দলগুলো আস্তে আস্তে রাজনীতি থেকে বিলীন হয়ে যেতে পারে এ আশঙ্কা থেকে তারা জোট গঠন করতে পারে। তিনি বলেন, প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে তারা সব সময় আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ তো করেই না বরং ষড়যন্ত্র করে থাকে। তবে আগামী নির্বাচন সামনে রেখে তাদের ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করার মতো শক্তি আমাদের আছে। 

সোনালীনিউজ/জেএ