বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩

ক্রমাগত বাড়ানো হচ্ছে স্থানীয় সরকার বিভাগের থোক বরাদ্দ

সোনালীনিউজ রিপোর্ট | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৪:০১ পিএম

ক্রমাগত বাড়ানো হচ্ছে স্থানীয় সরকার বিভাগের থোক বরাদ্দ

স্থানীয় সরকার বিভাগ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আওতাভুক্ত এলাকা ও পল্লী জনপদের অবকাঠামোগত উন্নয়নে কেন্দ্রীয়ভাবে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করে থাকে। তার বাইরেও সরকারের ওই সংস্থাটি প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ অর্থ থোক বরাদ্দ নিচ্ছে। যার ব্যয় নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগ গৃহীত প্রকল্পের ভিত্তিতে বাস্তবায়ন হওয়া কাজের পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন হলেও থোকের অর্থ কীভাবে খরচ হচ্ছে সে বিষয়ে কোনো মূল্যায়ন হয় না। তা সত্ত্বেও স্থানীয় সরকার বিভাগের থোক বরাদ্দ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এমনকি আসন্ন ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও চলতি অর্থবছরের তিন গুণের বেশি থোক বরাদ্দ চেয়েছে সরকারি ওই বিভাগ। স্থানীয় সরকার বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) স্থানীয় সরকারের জন্য ১৬ হাজার ১৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। আর সংশোধিত এডিপিতে (আরএডিপি) যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। তার মধ্যে স্থানীয় সরকারের পাঁচ প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের জন্য থোক হিসেবে বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

আগামী ২০১৬-১৭ অর্থবছরের এডিপিতে ওই খাতে ৪ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। তাছাড়া নিজ নির্বাচনী এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে কাজ করার জন্য সংসদ সদস্যদের ২০ কোটি টাকা করে যে বরাদ্দ দেয়া রয়েছে তাও খরচ হবে স্থানীয় সরকারের অধীন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) মাধ্যমে। তারপরও থোক খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।

সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে আগামী অর্থবছর উপজেলা পরিষদগুলোর জন্য ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীসহ জনপ্রতিনিধিদেও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ওই অর্থের একটি বড় অংশ ব্যয় করা হবে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন প্রতিশ্রুত প্রকল্পগুলোকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়ার জন্য সরকারের নির্দিষ্ট কমিটি থাকায় সেজন্য বাড়তি কোনো বরাদ্দ প্রয়োজন নেই। আর ১ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৫০ শতাংশ অবকাঠামো উন্নয়নে এবং বাকি ৫০ শতাংশ অর্থকরী খাতে বিশেষ করে মৎস্য খাতে ব্যয় করা হবে জানিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।

কিন্তু মৎস্য উন্নয়নে যেখানে সারাদেশে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দেশব্যাপী ব্যাপক কর্মযজ্ঞ রয়েছে সেখানে তা নিয়ে স্থানীয় সরকারের কাজ করাটা কতটুকু যৌক্তিক তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রস্তাবনায় ৬৪টি জেলা পরিষদের বিপরীতে আগামী অর্থবছরের এডিপিতে থোক বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে ৫শ’ কোটি টাকা।

সেক্ষেত্রে যুক্তি দেখানো হয়েছে, জেলা পরিষদের আওতা অনেক বেড়েছে। কিন্তু নির্মাণসামগ্রীর বাজারদর বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে বরাদ্দকৃত অর্থে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। তাই জেলা পরিষদের অধীন বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোর কাজ অব্যাহত রাখতে আগামী অর্থবছর ৫শ’ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রয়োজন। তা নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। কারণ বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েে এবং নির্মাণসামগ্রীসহ অন্যান্য পণ্যের দাম স্থিতিশীল।

সূত্র আরো জানায়, চলতি অর্থবছর সিটি করপোরেশন খাতে থোক বরাদ্দ ২১০ কোটি টাকা থাকলেও আগামী অর্থবছর ওই বরাদ্দ ১ হাজার ৭শ’ কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তা করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। সেক্ষেত্রে বিদ্যমান ১১টি সিটি করপোরেশনের জন্য ১ হাজার ৫শ’ কোটি এবং নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা পেতে যাওয়া ফরিদপুর ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের জন্য ২শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সিটি করপোরেশনগুলোর উন্নয়নে বরাবরই আলাদা প্রকল্প নেয়া হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের রাস্তা, ড্রেন ও ফুটপাত উন্নয়নে ৮১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হয়। প্রত্যেক সিটি করপোরেশনের উন্নয়নেই এরকম আলাদা প্রকল্প নেয়া হয়। তারপরও ওই খাতে বর্তমান অর্থবছরের প্রায় আট গুণ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

তাছাড়া এখনো অনুমোদন না হওয়া সিটি করপোরেশনের জন্যও বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে দুটি সিটি করপোরেশন অনুমোদনের বিষয়ে সরকারের নীতিসিদ্ধান্ত রয়েছে। তার মধ্যে ময়মনসিংহের বিষয়ে গণশুনানিসহ অন্যান্য কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ফরিদপুরেও কাজ চলছে। শিগগিরই দুটি সিটি করপোরেশন অনুমোদন হয়ে যাবে। ফলে এ দুটির উন্নয়নের জন্য আগামী অর্থবছর অর্থের প্রয়োজন হবে।

সেজন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। আর বর্তমানে ৩২৫টি পৌরসভার বিপরীতে থোক বরাদ্দ রয়েছে ৩৭০ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছর তা ৮শ’ কোটিতে উন্নীত করার প্রস্তাব করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। সেক্ষেত্রেও দ্রব্যমূল্য বাড়ার অজুহাত দেখানো হয়েছে। আর ইউনিয়ন পরিষদে বরাদ্দ রয়েছে ১০ কোটি টাকা। তা এক লাফে ৫৫০ কোটিতে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এদিকে স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রকল্পভিত্তিক যেসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সেগুলোর মূল্যায়ন করে থাকে। ওসব প্রকল্প থেকে সংশ্লিষ্ট এলাকায় কী পরিমাণ উন্নয়ন হলো এবং সেগুলোর মাধ্যমে প্রকল্প এলাকার মানুষ কতোটা উপকৃত হলো তা মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু থোক বরাদ্দের অর্থে কী পরিমাণ উন্নয়ন হয়েছে তা মূল্যায়ন করা হয় না।

আবার প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অর্থ ব্যয়ে কিছুটা ধীরগতি লক্ষ করা গেলেও থোক বরাদ্দের অর্থ খরচে তেমনটি হয় না। চলতি অর্থবছরের ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার মধ্যে প্রথম ৯ মাসেই ব্যয় হয়েছে ৯৭০ কোটি টাকা। যা মোট বরাদ্দের ৭০ শতাংশ। অথচ সার্বিক এডিপি বাস্তবায়ন প্রথম ৯ মাসে হয়েছে মাত্র ৪১ শতাংশ। ফলে ওই অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, থোক বরাদ্দের কার্যক্রম কীভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে তার একটি মূল্যায়ন অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে হওয়া দরকার। আর যে দুটি সিটি করপোরেশন এখনো প্রতিষ্ঠা হয়নি সেগুলোর জন্য অর্থ বরাদ্দ চাওয়া অযৌক্তিক। পাশাপাশি মৎস্য উন্নয়নে আলাদা মন্ত্রণালয়ই রয়েছে। সুতরাং  সেই সংক্রান্ত কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেই বাস্তবায়ন হওয়া উচিত।

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব আবদুল মালেক বলেন, স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোয় সারাবছরই বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন চাহিদা থাকে। সেজন্য বেশকিছু অর্থ থোক হিসেবে রাখা হয়। কারণ কোনো কাজের জন্য অর্থ প্রয়োজন হলে অর্থবছরের মাঝখানে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায় না। সেজন্য এডিপিতে থোক হিসেবে একটি বরাদ্দ রাখা হয়।

সোনালীনিউজ/ঢাকা/আমা

add-sm
Sonali Tissue
বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩