বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১৭, ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

ক্লাসে ব্ল্যাকবোর্ড চালু হলো যেভাবে

আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৩:৫৪ পিএম

ক্লাসে ব্ল্যাকবোর্ড চালু হলো যেভাবে

সোনালীনিউজ ডেস্ক

ক্লাসে শিক্ষকদের ব্যবহৃত ব্ল্যাকবোর্ড খুব বেশি প্রাচীণ আবিষ্কার নয়। মূল্যে সস্তা এবং কাপড় দিয়ে খড়িমাটি মুছে বারবার লিখতে পারার কারণে খুব অল্প সময়েরই মধ্যেই বিশ্বের প্রায় প্রতিটি শ্রেণীকক্ষে ব্ল্যাকবোর্ড প্রবেশ করেছে নিজস্ব অপরিহার্যতা নিয়ে। শিক্ষার্থীরা যাতে তাদের বাসায় এবং স্কুলে গণিত বা অন্যান্য বিষয়ে লিখতে পারে সেই উদ্দেশ্যে মাথায় রেখেই ব্ল্যাকবোর্ডের সূচনা। যদিও ১৮০০ সালের আগ পর্যন্ত কিন্তু ব্ল্যাকবোর্ডের প্রচলন ছিল না, বর্তমানে যা আমরা দেখছি। তবে পুরাকাল থেকেই ভারতবর্ষে টোল বা গুরুর কাছে শিক্ষার্থীরা পাঠ নেবার সময় পাথরের স্লেট ব্যবহার করতো। কিন্তু স্কটল্যান্ডের ওল্ড হাই স্কুল অব এডিনবার্গের প্রধনশিক্ষক জেমস পিল্লানসই সর্বপ্রথম প্রচলিত ব্ল্যাকবোর্ডের সূচনা করেন।

জেমস তার শিক্ষার্থীদের ভূগোল পড়াতে গিয়ে বড় মানচিত্র দেখাতে চান। আর সেটা করতে গিয়ে তিনি অনেকগুলো ছোটো ছোটে স্লেট জুরে দিয়ে একটা বড় স্লেট তৈরি করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ১৮০১ সালে জর্জ ব্যারন নামের পশ্চিমা প্রসিদ্ধ গণিতজ্ঞ নিজেও অনেকগুলো স্লেট সন্নিবেশ করে একটা পূর্ণাঙ্গ স্লেট তৈরি করেছিলেন গণিতের সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে। সেসময় তিনি দেখতে পান, বড় কোনো কিছুর উপর লিখে শিক্ষার্থীদের বোঝালে তাতে মনোনিবেশ করতে সুবিধা হয়।

যদিও ১৮১৫ সালের আগে ব্ল্যাকবোর্ড শব্দটির আবির্ভাব হয়নি। ১৮০৯ সাল নাগাদ ফিলাডেলফিয়ার প্রতিটি সরকারি স্কুলে ওই স্লেটের ব্যবহার শুরু হয়ে যায়। সেবারই প্রথম শিক্ষকরা এমন একটি উপকরণ পেলেন যেখানে একই সঙ্গে লেখাও যায় এবং ওটা দিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ানোও যায়। কারণ শিক্ষার্থীরা বেশিক্ষন শিক্ষকদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে পারতো না, যেহেতু তার সামনে পঠিত বিষয়ের কোনো দৃশ্যমান প্রেক্ষাপট নেই। কিন্তু স্কুলগুলোতে স্লেটের প্রচলন হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠে মনোযোগী হওয়ার প্রবনতাও বেড়ে যায়। স্থানীয় পর্যায়ে পাইন গাছের গুড়িতে কার্বণ এবং ডিম মিশিয়ে যে আস্তরণ তৈরি করা হতো, সেটাই পরবর্তীতে আরও উন্নত হয়ে ১৮৪০ সালে বাণিজ্যিকভবে ব্ল্যাকবোর্ড হিসেবে বাজারজাত হতে শুরু করে। সেসময় একটি কাঠের তক্তার উপর পাতলা করে কারো রং করে দেয়া হতো। আর বর্তমানে ব্ল্যাকবোর্ড ছাড়া কোনো স্কুলই কল্পনা করা যায় না।

মজার বিষয় হলো, ব্ল্যাকবোর্ড কিন্তু সবসময়ই কালো রংয়ের থাকলো না। ১৯৩০ সালের দিকে সবুজ রংয়ের বোর্ড চালু হয় এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে সবুজ রং ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করলে সবুজ রংয়ের ব্ল্যাকবোর্ড জনপ্রিয় হতে থাকে। যদিও সবুজ রং লাগানোর পর কিছু অঞ্চলে ব্ল্যাকবোর্ডের জায়গায় চকবোর্ড নামে ডাকা শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে আরও অনেক পরিবর্তন আসতে শুরু করে। সবুজ রংয়ের বোর্ড হওয়ার পর যে গ্রাফাইটের সাদা চক ব্যবহার করা হতো লেখার জন্য, সেই চকের রংয়েও পরিবর্তন আসে। বিভিন্ন রংয়ের চক উৎপাদন করতে শুরু করে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পাঠদানে আরও মনোযোগী করতে বিভিন্ন রংয়ের চকের ব্যবহার শুরু করে দেন।

তবে বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ব্ল্যাকবোর্ডের জায়গায় নতুন এক আবিষ্কার জায়গা করে নিতে চেয়েছিল। তৎকালীন সময়ে ওই বোর্ডকে বলা হতো ম্যাজেস্টিক বোর্ড। ওই বোর্ডের তলায় থাকতো পুরু কার্বণের আস্তরণ এবং তার উপর একটি পাতলা লিনেনের কাপড়। ওই কাপড়ের উপর ইচ্ছে করলেই লেখা যেতো এবং কোনো কাপড়ের সাহায্য ছাড়াই স্রেফ ওই কাপড়টি উঠিয়ে দিলেই পুরনো লেখাগুলো চলে যেতো। শুরুর দিকে ম্যাজেস্টিক বোর্ড জনপ্রিয় হলেও ধীরে ধীরে এর কার্যকারিতা হারাতে থাকে। কারণ ব্ল্যাকবোর্ডের মতো দীর্ঘসময় ব্যবহার করা যেতো না এই বোর্ড, কিছুদিন পর পর কার্বণের আস্তরন পাল্টাতে হতো।

ঠিক সেই সময়ই যুক্তরাজ্যের হাত ধরে বাজারে চলে আসে হোয়াইট মার্কার বোর্ড। এখন আর এই বোর্ডে লিখলে চকের গুড়োয় নোংরা হবে না শিক্ষকের জামা কিংবা শ্রেণীকক্ষ। পকেটে থাকা মার্কার কলম দিয়ে অনায়াসেই লেখা যায় এবং একটি কাপড় দিয়ে সহজেই মুছে ফেলা যায়। যেহেতু ক্লাস নোংরা হচ্ছে না এবং শিক্ষকদের জামা বারবার পাল্টাতে হচ্ছে না, তাই রাতারাতি এশিয়া থেকে আফ্রিকা সর্বত্র ছড়িয়ে যায় হোয়াইট মার্কার বোর্ড। কে জানে হয়তো একবিংশ শতাব্দীতে হোয়াইট বোর্ড মার্কারের জায়গায় নতুন কোনো উপাদান জায়গা করে নেবে পুরাতনকে সরিয়ে দিয়ে।

সোনালীনিউজ/ঢাকা/আকন