শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩

কড়া রোদে সুস্থ থাকবেন যেভাবে

আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৩:৫৯ পিএম

কড়া রোদে সুস্থ থাকবেন যেভাবে

স্বাস্থ্য ডেস্ক

মানবদেহের পুষ্টি চাহিদা সম্পর্কে প্রতিটি মৌসুমে সজাগ দৃষ্টি রাখা একান্ত কর্তব্য। আর গ্রীষ্মের গরমে এ কর্তব্য আরো বেড়ে যায়। উচ্চ তাপমাত্রায় আমাদের খাবার গ্রহণের ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে হবে। আমাদের পরিষ্কার ধারণা নিতে হবে যে, কোন খাবার গরমে খাদ্য তালিকা থেকে কমিয়ে দিতে হবে অথবা কোন খাবার একেবারেই খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। আমাদের অসচেতনতা বহু রোগের কারণ। কিছু রোগ বা শারীরিক পরিস্থিতি জন্ম থেকে নিয়ে আসে না। শুধু অসচেতনতার কারণে শরীরে স্থান পায় ও শরীরে এদের আধিপত্য বিস্তার করে অর্থাৎ কোনো কোনো রোগী রোগগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। মানুষের অসচেতনতার দরুন খাদ্য সম্পর্কিত দীর্ঘমেয়াদি রোগগুলো হলোথ

১. শরীরের অতিরিক্ত ওজন ২. ডায়াবেটিস ৩. ইনসুলিন রেসিসাটেন্স ৪. উচ্চ রক্তচাপ ৫. হৃদরোগ।
কোনো ব্যক্তি যদি উপরোক্ত যে কোনো ১টি বা সব কটিতে ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয় তবে তার এ গরমে কিছুটা স্বস্তির জন্য অত্যন্ত সজাগ হতে হবে কেন না প্রচ- গরমে শরীরের মধ্যে বিভিন্ন পরিবর্তন দেখা যায়। যেমনথ ১. দেহে সোডিয়াম কমে যাওয়া ২. পটাশিয়াম কমে যাওয়া ৩. বমি হওয়া ৪. খাদ্য হজম না হওয়া ও পেট ফাঁপা ৫. ডায়রিয়া ৬. আমাশয় ৭. জ্বর।
গরমে এ শারীরিক পরিবর্তনগুলোকে প্রতিরোধ করতে খাবারের গুরুত্ব অপরিসীম। গরমে সঠিক পুষ্টির লক্ষ্যে সুস্বাস্থ্য রক্ষায় যে দিকগুলো খেয়াল রাখতে হবে তা হলোথ
১. প্রথম ও প্রধান সাবধানতা হলো বাইরের খোলা জায়গার পানি, শরবত, আখের রস, পরিহার করা। এগুলো গ্রহণের ফলে সৃষ্ট ডায়রিয়া, আমাশয় আপনার আর্থিক ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকিও বহন করে।
২. নিরাপদ বিশুদ্ধ পানি পান করা, ঘরের তৈরি শরবত, পানিজাতীয় শাক-সবজি ও ফল বেশি খাওয়া।
৩. উল্লেখ্য যে, গরমে ডাব, তরমুজ, বাঙ্গি, বেলের শরবত এগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে হাত ধুয়ে খাবারের উপযোগী করা।
৪. গরমে মাছ, মাংস, ভুনা, ভাজি, খিচুরি, পোলাও, ফাস্টফুড কমিয়ে পাতলা আম ডাল, পাতলা দুধ, টকদই, করলার বোল তরকারি, লেবু-চিনির শরবত, সালাদ, রসাল ফল খাওয়া যেতে পারে।
৫. গরমে সাদা ভাত পোলাও, বিরানি, খিচুরি পরোটা থেকে অনেক বেশি উপযোগী।
৬. যারা নিয়মিত হাঁটেন, তারা শুধু সময় পরিবর্তন করলেই চলবে। যেমন সকালে না হেঁটে বিকাল/সন্ধ্যার পর হাঁটা খুব বেশি আরামদায়ক।
৭. গরমে খুব বেশি হাঁটা, ব্যায়াম, অত্যধিক পরিশ্রম, অত্যধিক খাদ্য গ্রহণ পরিহার করুন।
৮. পোশাক পরুন আরামদায়ক। হালকা রং বেছে নিন পোশাকে।
৯. নিজস্ব পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন।
১০. মনে রাখবেন গরমে আপনার নিজস্ব পরিচর্যা ও যত্ন আপনাকে সুস্থ রাখতে সহায়ক হবে। গরমে থাকা যাবে স্বস্তিতে। প্রতিরোধ করা যাবে ডায়রিয়া, কলেরা ও আমাশয়ের মতো পানিবাহিত ও খাদ্যবাহিত বিভিন্ন রোগ এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও

গরমে পুষ্টি : গরমে কিছুটা স্বস্তির জন্য পুষ্টি সম্পর্কে আলোচনা করা হলোথ ১. যারা অতিরিক্ত ওজনে ভুগছেন তারা এ গরমে অন্তত সজাগ হোন পথ্য ও পুষ্টির ব্যাপারে। ওজন কমানোর জন্য গরমকাল সহায়ক। কেননা আপনি যদি উচ্চ ক্যালরি পরিহার করে নিম্ন ক্যালরির খাদ্য গ্রহণ করেন তবে ওজন কমবে। নিম্ন ক্যালরি খাবারের মধ্যে রয়েছে ফল (তরমুজ, বাঙ্গি, জাম, জামরুল, ডাব ইত্যাদি) ও সবজি (লাউ, পেঁপে, ঝিঙ্গা, কুমড়া ইত্যাদি)। ২. গরমে খাদ্যতালিকায় তেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্ক হোন। গরমে তেলের ব্যবহার একেবারেই কমিয়ে দিন। কেননা ১ গ্রাম তেল শরীরের ভেতর ৯ কিলো ক্যালরি তাপ উৎপন্ন করে। উচ্চ তাপমাত্রায় ও আর্দ্রতায় শরীরের তাপ বাইরে বেরোতে পারে না। ফলে শরীরের তাপমাত্রা বাড়ে। এই গরমে বয়স্ক ও অতিরিক্ত ওজন ব্যক্তিদের হিট স্ট্রোকের আশঙ্কা বাড়ে। তাই অন্তত এই গরমে তেলের ব্যবহার কমিয়ে দেখুন আপনার তিনটি উপকার নিশ্চিত হবেথ
ক. কম তেলে খাবার খেয়ে আপনি স্বস্তিবোধ করবেন, হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি কমবে
খ. আপনার অতিরিক্ত ওজন কমবে
গ. দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তাল মেলানো যাবে অর্থাৎ তেল কেনার খরচ কমবে।
ইদানীং 'কোলেস্টেরল ফ্রি' তেলের প্রচারণা বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে আপনার নিজস্ব বুদ্ধি যাচাই করুন। উদ্ভিদ উৎস হতে আসা তেলে প্রাকৃতিকগতভাবেই কোনো কোলেস্টেরল থাকে না। এটি তেলের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। বিশেষভাবে উদ্ভিজ্জ তেলকে কোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে কোলেস্টেরল ফ্রি করা হয়নি। কোলেস্টেরল ফ্রি তেলের প্রচারণায় সাধারণ মানুষ মনে করে তেল খেলে কোনো ক্ষতি নেই কিন্তু এ কথা পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবেথ ১ চা চামচ (৫ এমএল) তেল = ৪৫ ক্যালরি, ১ চা চামচ (৫ এমএল) ঘি = ৪৫ ক্যালরি, ১ চা চামচ (৫ এমএল) সরিষা তেল = ৪৫ ক্যালরি, ১ চা-চামচ (৫ এমএল) সয়াবিন তেল = ৪৫ ক্যালরি, কোলেস্টেরল ফ্রি হোক বা না হোক ৫ এমএল তেল বা ঘির ক্যালরিমূল্য কিন্তু একই। অতিরিক্ত গ্রহণের ফলে আপনার শরীরের ওজন বৃদ্ধি পাবে, যা আপনার হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াবে। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি তো রয়েছেই। তাই নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি কোনোভাবেই যে তেলই হোক না কেন তা গ্রহণ করা যাবে না। আমরা আসলে জানি কি প্রতিদিন প্রাপ্তবয়স্ক একজন মানুষের কতটুকু তেলের প্রয়োজন। প্রাপ্তবয়স্ক = ২০ গ্রাম ভিজিটেবল ফ্যাট, গর্ভবতী মা ৩০ গ্রাম ভিজিটেবল ফ্যাট, দুগ্ধদানকারী মা ৪৫ গ্রাম ভিজিটেবল ফ্যাট [উৎস : আইসিএমআর]।

এই গরমে এখনই নিয়ন্ত্রণ করুনথ
১. অতিরিক্ত তেল গ্রহণ
২. ডুবো তেলে ভাজা খাবার
৩. ঘি, মাখন, পনির, মেয়নেজ, ফাস্টফুড
৪. কোল্ডড্রিংক্স
৫. পোলাও, কাচ্চি, গরু ও খাসির মাংস
৬. ভুনা খাবার
৭. অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার
৮. অতিরিক্ত গরম ও ঠান্ডা খাবার

গ্রহণ করুনথ
১. অল্প তেলে রান্না খাবার। প্রতিদিন তিনটির বেশি তরকারি গ্রহণ করবেন না। কারণ খাদ্যতালিকায় রান্না করা খাবার যত বাড়াবেন তত বেশি তেল খাওয়া হবে তত বেশি পেট ভরে খাওয়া হবে, তাই সাদা ভাতের সঙ্গে করলা ভাজি, পাতলা আম ডাল ও মাছ/মুরগির ঝোল তরকারি যথেষ্ট। সঙ্গে সালাদ লেবু, রসাল ফল ও টকদই রাখতে পারেন। তাজা খাবার গ্রহণ করুন, বাসি খাবার পরিহার করুন। উদাহরণ : চার সদস্যবিশিষ্ট প্রতিটি পরিবার এই গরমে দিনে ৩-৪ টেবিল চামচ অর্থাৎ ৬০ এমএল তেল ব্যবহার করুন। খাবারের বৈচিত্র্য যাই হোক না কেন তেলের ব্যবহার ৬০ এমএল অতিক্রম করবেন না। কারণ শুধু তেল থেকে ক্যালরি পাচ্ছে ৬০৯ = ৫৪০, গরমে এটিই যথেষ্ট নয় কি? মাসে তেলের মোট ব্যবহার হওয়া উচিত ১৮০০ এমএল প্রায় ২ লিটার। পাশাপাশি তেল খরচও কমে গেল। অবশ্য শিশু ও গর্ভবতী মা, দুগ্ধদানকারী মায়েদের জন্য পরিমাণ কিছুটা বাড়াতে হবে। আমাদের দেশে অনেক পরিবার মাসে ১০ থেকে ১৫ লিটার পর্যন্ত তেল গ্রহণ করে। এতে আপনার পরিবারের সদস্যদের গরমে অস্বস্তির পাশাপাশি শরীরে ওজন বেড়ে যাওয়া, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ সবশেষে কিডনি পর্যন্ত অকেজো হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই গরম থেকেই কম তেলের ব্যবহার শুরু করলে আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হবে, লাভবান হবেন। গরমে স্বস্তি, রোগপ্রতিরোধ, চিকিৎসা ব্যয় কমবে।

২. কোমল পানীয়ের পরিবর্তে ডাবের পানি গ্রহণ করুন।
৩. ফ্রিজের ঠান্ডা তরল খাবেন না। এতে গরমে অস্বস্তি আরো বাড়বে।
৪. তরমুজের শরবত, বাঙ্গির শরবত, টকদইয়ের শরবত, বেলের শরবত পান করুন
৫. মনে রাখবেন শরীরে প্রোটিনের চাহিদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির প্রতি কেজি শরীরের ওজনের জন্য ১ গ্রাম প্রোটিন ধার্য করা হয়েছে অর্থাৎ ৬০ কেজি শরীরের ওজনের জন্য ৬০ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন। [কিডনি রোগ ছাড়া] গরমে মাংস (গরু, খাসি) পরিহার করে এর পরিবর্তে ছোট মাছ, পাতলা ডাল, টকদই, পাতলা দুধ খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে দৈনিক চাহিদা পূরণ করতে হবে।
৬. শর্করাজাতীয় খাবারের দিকে একটু লক্ষ্য করুন। আপনি জানেন কি আপনার শরীরে শর্করাজাতীয় খাবারের চাহিদা কতটুকু। এটি হচ্ছে মোট ক্যালরির ৬০% অর্থাৎ আপনার ওজন, উচ্চতা, বয়স, শারীরিক পরিশ্রম লিঙ্গভেদে শক্তি চাহিদা যদি হয় ২০০০ ক্যালরি তবে তার ৬০% নিতে হবে শর্করাজাতীয় খাবার থেকে। অর্থাৎ ১২০০ ক্যালরি। ১২০০ গুণ ৪ = ৩০০ গ্রাম শর্করা, এটি আপনি পাবেন ভাত, রুটি, চিঁড়া, মুড়ি, সুজি, সাগু, চিনি, আলু ও ফল থেকে। দুধ থেকেও আপনি শর্করা পাবেন। অনেকে ফল ও দুধ নিয়ে চিন্তিত হন, চিন্তামুক্ত হতে জেনে নিনথ ফলে গড়ে ১৫% শর্করা থাকে, দুধে ১২%। মনে রাখতে হবে, প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা আমে ৭৪ ক্যালরি পাওয়া যায়। আমে কোনো প্রোটিন বা ফ্যাট নেই। পুরোটাই শর্করা। হ্যাঁ, তবে ভিটামিন 'এ' পাবেন প্রচুর। প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা আমে ২৭৪৩ মাইক্রোগ্রাম ক্যারটিন পাওয়া যায়। গরমে শর্করার চাহিদা মেটাতে ভাত, রুটি, চিনির পরিমাণ কমিয়ে ফল, সবজি, দুধ, দই খাদ্যতালিকায় স্থান দিন।
৭. গরমে ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের চাহিদা মেটাতে টক ফল ও মিষ্টি ফল দুটোই খাদ্যতালিকায় রাখতে হবে। এ ছাড়া রঙিন শাক-সবজি তো রয়েছেই। সুষম খাদ্যতালিকা থেকে আপনার খাদ্যের ৬টি পুষ্টি উপাদানের চাহিদাই পূরণ হবে।
৮. বিশুদ্ধ পানি গ্রহণের কথা ভুলে গেলে চলবে না। প্রতিদিন ২.৫ লিটার পানি গ্রহণ যথেষ্ট। ৩ লিটার পর্যন্ত গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে কিডনি রোগী ও ফ্লুয়িড রিটেনশন সিনড্রমের রোগীরা পানি গ্রহণের ব্যাপারে সতর্ক হোন ও আপনার ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
৯. অত্যধিক পরিশ্রম নিয়ন্ত্রণ করুন। প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রাম করুন।
১০. নিজের প্রতি স্বাস্থ্যসচেতনতাই আপনাকে করবে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, সজীব ও কর্মক্ষম।

সোনালীনিউজ/ঢাকা/আকন

শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩