বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৩ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩

খেলাপি বেড়েছে তিন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে

আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৩:৫৪ পিএম

খেলাপি বেড়েছে তিন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে

বিশেষ প্রতিনিধি

খেলাপি ঋণ আদায় করতে না পেরে ঋণ পুনর্গঠনের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে সরকারি মালিকানার সোনালী, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক, জনতা ব্যাংক ও বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল)। ঢালাওভাবে পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের কারণে খেলাপির ভয়াবহতা কম দেখালেও দীর্ঘমেয়াদি সংকট সৃষ্টি হচ্ছে এই ব্যাংকগুলোয়। এ অবস্থার মধ্যেও রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী, অগ্রণী ব্যাংক ও বিডিবিএলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায়, অবলোপন ও নবায়ন প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এ তথ্য পাওয়া গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রথাগতভাবে অক্টোবার-ডিসেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংকগুলো ঋণ আদায়ে তৎপর থাকে বেশি, কিন্তু সহস্রাধিক নাম সর্বস্ব কোম্পানিতে ঋণ দেয়ার কারণে এই ব্যাংকগুলো কাঙ্ক্ষিত খেলাপি ঋণ আদায় করতে পারছে না। এ কারণে ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ আদায়ের চেয়ে ঋণ অবলোপন ও পুনঃতফসিল বা নবায়নের দিকে নজর দিয়েছে বেশি।

২০১৫ সালে ৫ হাজার ২৬১ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। সোনালী ব্যাংক পুনর্গঠন করেছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এই ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণ আদায় কমেছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। ২০১৪ সালে সোনালী ব্যাংক ৪ হাজার ৫০৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আদায় করলেও ২০১৫ সালে আদায় করেছে ২ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ আদায় কমে যাওয়ার কারণে এই ব্যাংকে খেলাপির পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। কিন্তু ২০১৪ সালের তুলনায় এই ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে গেছে। বিশেষ বিবেচনায় বড় অঙ্কের ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিল করার কারণে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এই ব্যাংকে খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ১১৬ কোটি টাকা। ২০১৪ সাল শেষে সোনালী ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ছিল ৮ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে সোনালী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ও  ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ কুমার দত্ত সাংবাদিকদের বলেন, খেলাপি ঋণ আদায় বাড়ানো জন্য বিশেষভাবে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, পুনঃতফসিলের মাধ্যমেও কিছু ঋণ আদায় হয়েছে। এ কারণেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে জনতা ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ছিল ৩ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। এই ব্যাংকটিও বিশেষ বিবেচনায় কয়েকটি বড়-বড় শিল্পগ্রুপের ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিল করেছে। এর ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে এসেছে। বর্তমানে জনতা ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা।

রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন করেছে ২ হাজার কোটি টাকার ঋণ। রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকটির আরও বিপুল পরিমাণ ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য বিশেষ সুবিধা চাওয়া হয়েছে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকটি মাত্র আড়াই শতাংশ হারে ডাউনপেমেন্ট নিয়ে ব্যাংকটি বিশেষ বিবেচনায় দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আবেদন করে। এর বাইরে ২ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকার ঋণের হিসাব আর্থিক বিবরণীতে বাদ দিয়েছে ব্যাংকটি। সাধারণভাবে আর্থিক বিবরণী থেকে কোন টাকা বাদ দিতে হলে তার বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখার বিধান রয়েছে। তবে ব্যাংকটির সে সক্ষমতা না থাকায় প্রভিশন সংরক্ষণে ১০ বছর সময় দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই ব্যাংকটিতে ২০১৪ সাল শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৬ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা। ২০১৫ সাল শেষে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা।

২০১৪ সালে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৩ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা। ২০১৫ সাল শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। গত বছর রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকটি পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন করেছে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকার ঋণ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ব্যাংকটি ১ হাজার ১১৩ কোটি টাকা ঋণ পুনঃতফসিল করলেও ২০১৫ সালে ঋণ নিয়মিত করা হয় প্রায় দ্বিগুণ।

সূত্র মতে, ২০১৫ সালে বিশেষ সুবিধায় ২ হাজার ৬৭ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করে এই ব্যাংকটি। এছাড়া পুনর্গঠন করা হয় আরও ৭২৫ কোটি টাকার ঋণ। তার পরও খেলাপি ঋণ বেড়েছে ব্যাংকটির। ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২৫৯ কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত সাংবাদিকদের বলেন, বড় দুটি গ্রুপের ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ার কারণে ডিসেম্বর প্রান্তিকে খেলাপির পরিমাণ বেড়েছে। তবে এই এসব ঋণ আদায়ের চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।

তথ্যমতে, ২০১৪ সাল শেষে রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ১ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা। ২০১৫ সাল শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১৩ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে বিডিবিএলের খেলাপি ঋণ ছিল ৪৪৫ কোটি টাকা। ২০১৫ সাল শেষে বেড়ে হয়েছে ৬৪৯ কোটি টাকা। এক বছরে এই ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২০৪ কোটি টাকা।

এদিকে, বিশেষ বিবেচনায় পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন করা অধিকাংশ ঋণ খেলাপির ঝুঁকিতে পড়েছে।

এ প্রসঙ্গে একটি সরকারি ব্যাংকের শীর্ষ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাংবাদিকদের বলেন, পুনঃতফসিল করা ঋণের একটা বড় অংশই হয়ত ফেরত পাওয়া যাবে না। যদিও এই ধরনের ঋণ আগেই খেলাপি হয়ে পড়ত। পুনঃতফসিল করার কারণে কিছু ঋণ আদায় করা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি সুদ হারও কমানো সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, পুনঃতফসিল না করা হলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যেত। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ত সুদ হারের ওপর।

প্রসঙ্গত, ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বড় ঋণ পুনর্গঠনে ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে বিশেষ সুবিধা দিয়ে একটি নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই নীতিমালার আলোকে ১১টি প্রতিষ্ঠানের ১৫ হাজার ২১৮ কোটি টাকা পুনর্গঠন সুবিধা দেয় বিভিন্ন ব্যাংক। এর আগে রাজনৈতিক অস্থিরতার পরিপ্রেক্ষিতে দেয়া সুবিধার আলোকে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করে ব্যাংকগুলো।

সোনালীনিউজ/এমএইউ

add-sm
Sonali Tissue
বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৩ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩