রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩

জলাভূমির নগরী কলকাতা

আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৩:৫৬ পিএম

জলাভূমির নগরী কলকাতা

সোনালীনিউজ ডেস্ক

জানুয়ারি মাসে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার গাছের পাতাগুলোর চেহারা অনেকটা অবহেলিত টবের গাছের মতো দেখায়। অগুনতি যানবাহন, হকার, ধুলো আর মানুষের ভিড়ে গাছগুলো ঋতুর নীরব পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে থাকে। শহরে নতুন ফ্লাইওভারগুলোর সৌন্দর্য্য বর্ধণে লাগানো হয়েছে গুল্মজাতীয় অনেক গাছ। আর সেই গুল্মের চর্তুপাশে অনায়াসেই কিছু সাইনবোর্ড দেখা যায় যেখানে লেখা আছে ‘ক্লিন অ্যান্ড গ্রিন’। কিন্তু এই সাইনবোর্ডগুলোকে একহাত নিতেই যেন অপর একধরনের সাইনবোর্ড দেখা যায়, যেখানে লেখা আছে ‘বাংলায় এসো এবং উন্নয়নের রাস্তায় চড়ো’। প্রায় পনেরো মিলিয়ন মানুষের কলকাতা ব্রিটিশ আমলে লন্ডন শহরের পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ছিল। যদিও সেই কলকাতাই এখন দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই এবং ব্যাঙ্গালুরু হবার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

শহর হিসেবে কলকাতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র পাঁচ মিটার উচুতে অবস্থান করছে। পুরো শহরটিই মূলত বৃহত দুটি জলাভূমি দ্বারা বেষ্টিত। শহরের পূর্বাঞ্চলে ক্রমশ উন্নয়নের চাপে বড় সব দালান উঠছে। সরকারি উন্নয়নের আওতায় শহরের এদিকটায় শতাধিক বড় দালান, কলেজ এবং সুরম্য বাড়ি তৈরি করা হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় কলকাতা এখন পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে থাকলেও, উন্নয়ন প্রশ্নে কিন্তু থেমে নেই নতুন নতুন দালান বানানো। বিশ্বব্যাংকের এক জরিপ অনুযায়ী দেখা যায়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে গুয়ানঝৌ, মিয়ামি, নিউইয়র্ক, নিউ অরলিন্স এবং মুম্বাই বেশ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে এই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রনে প্রাকৃতিক এবং মনুষ্যসৃষ্ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা ভাবা হচ্ছে। ওই একই জরিপে দেখা যায়, ২০৫০ সালের মধ্য যদি সাগরের পানির উচ্চতা মাত্র বিশ সেন্টমিটারও বাড়ে তবে কলকাতাও বণ্যা ঝুঁকিতে পরবে।

অনেকেই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওযার বিষয়টিকে আগামীর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে এড়িয়ে যেতে চান। কিন্তু গত বছরের নভেম্বর মাসে চেন্নাইয়ের বণ্যা পরিস্থিতির কারণে শহরটি থেকে প্রায় পৌনে দুই মিলিয়ন মানুষ স্থানচ্যুত হয়েছে। বিশ বছর আগে চেন্নাই শহর জুরে ৬৫০টি জলাভূমি ছিল, অথচ আজ সেখানে আছে মাত্র ২৭টি। নগর উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় নগর কর্তৃপক্ষ উঁচু সব দালান নির্মান করলেও বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হলে তা কিভাবে মোকাবেলা করা যাবে সেবিষয়ে কোনো পরিকল্পনাই নেয়া হয়নি। উল্টো যে জলাধারগুলো পানি অসারণের ব্যবহৃত হতো সেগুলোও বন্ধ করে ধেয়া হয়েছে।

ভারতীয় পরিবেশবিদ ধ্রুবজ্যোতি ঘোষের মতে, কলকাতায় যে দুটি জলাভূমি রয়েছে তার একটি প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এবং অন্যটি মনুষ্যনির্মিত। ১৯৮১ সাল থেকে বর্তমান কলকাতার বাস্তবতা নিয়ে কথা হয় এই পরিবেশবিদের সঙ্গে। তার কাছ থেকেই জানা যায়, কলকাতা শহরে প্রতিদিন প্রচুর পরিমানে পানি ব্যবহৃত হলেও শহরে নেই কোনো পানি শোধনাগার। তাই বলে পরিবেশ দূষণ সমস্যাটিও এখনো দৃশ্যমান নয়। ব্যবহৃত পানিগুলো স্রেফ অদৃশ্য হয়ে যায়। ৬৯ বছর বয়সী ধ্রুবজ্যোতিই কলকাতার এক তরুণের কথা বললেন যিনি নিয়মিত একটি স্থানের পানি পরীক্ষা করার জন্য পরীক্ষাগারে পাঠিয়ে থাকেন। কারণ বিজ্ঞানীদের মতে, ব্যবহৃত পানির মধ্যে থাকে ৯৫ভাগ পানি এবং ৫ ভাগ ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়া সম্বলিত পানিগুলো খাল হয়ে সূর্যের রৌদ্রের তাপের তলায় বয়ে যায় অনেকটা পথ। একথা উল্লেখ্য যে, কলকাতার অধিকাংশ জনগণ এখনও সূর্যের আলোয় দ্বারা পানি বিশুদ্ধিকরণ করে থাকেন।

এই ব্যাকটেরিয়ার মিশ্রিত ব্যবহৃত পানিগুলোতে কলকাতার কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে মাছের চাষ করা হয়। শহরবাসীর কাছে এই মাছগুলো কোনো খাদ্যের মধ্যে না পরলেও ঘোষ এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীদের মতে, এই মাছে কোনো সমস্যা নেই। কারণ কলকাতার ব্যবহৃত পানিতে নেই উচ্চমাত্রার সীসা। ব্রিটিশ আমলে কলকাতায় একটি পানি শোধনাগার তৈরি করা হলেও সেটা বর্তমানে কোনো কাজই করছে না। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে এই ব্যয়বহুল পানি শোধনাগারগুলো ব্যাকটেরিয়া পরিস্কার করতেই হিমশিম খেয়ে যায়। কিন্তু কলকাতার ব্যবহৃত ময়লা পানি শোধন হয় মাত্র বিশ দিনে। আর এই বিশাল কাজটি করা হয় কলকাতার সেই জলাভূমিগুলোকে কাজে লাগিয়ে।

ব্যবহৃত নোংরা পানিকে মাছ চাষের জন্য ব্যবহার না করে ধানখেতে এবং সবজি উৎপাদনে কাজে লাগানো হয়। বিশেষ করে নদীর ধারগুলোতে এই চাষাবাদ করা হয়। প্ল্যান্টের মাধ্যমে পানি শোধন না করে পরিবেশগত উপায়ে শোধণের ফলে অনেক সবজিও উৎপাদিত হচ্ছে আবার সেই ৯৫ ভাগ পানি শুদ্ধ হয়ে আবার প্রকৃতিতেই ফিরে যাচ্ছে। আর এই পুর্ণব্যবহার প্রক্রিয়ার কারণে কলকাতা আজ বিশ্বের কমব্যয়বহুল শহরগুলোর মধ্যে একটি। এই শহরে এখনও সকালের নাস্তা ত্রিশ পয়সায় পাওয়া যায়। জলাভূমিগুলো থেকে প্রতিবছর দশ হাজার টন মাছ উৎপাদন করা হয় এবং ওই পানি ব্যবহার করে যে সবজি উৎপাদিত হয় তার কলকাতার মোট সবজি চাহিদায় ৪০-৫০ শতাংশ মেটাতে সক্ষম। সবজি উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহণে তেমন কোনো ব্যয় না থাকায় সবজিও দামও হয় তুলনামূলক কম। তাইতো ধ্রুবজ্যোতিদের মতে, কলকাতার এই দুটি জলাভূমি যদি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে কলকাতাও নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

সোনালীনিউজ/ঢাকা/আকন

add-sm
Sonali Tissue
রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩