শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩

জামাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেছেন তারেক রহমান

আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৩:৫৪ পিএম

জামাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেছেন তারেক রহমান

বিশেষ প্রতিনিধি

কিছুদিন আগেও শোনা যাচ্ছিল জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে বিএনপি’র। উভয় দলের মধ্যে টানাপোড়েনের প্রকাশ্য রূপও দেখা যায় রাজনৈতিক ময়দানে। এ নিয়ে বিএনপি প্রকাশ্যে যা কিছুই প্রমাণ করার চেষ্টা করুক কেন লন্ডনে দলের নির্বাসিত নেতা তারেক রহমান কিন্তু জামাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেই চলছেন।

বিশ্বস্ত সূত্রের খবর, পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ডের বার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি ও জামাতের নেতারা আগামী সপ্তাহে লন্ডনে যৌথভাবে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করছেন। আর এই অনুষ্ঠানটি হচ্ছে তারেক রহমানেরই পরামর্শে।

তবে রাজনৈতিক অস্বস্তি এড়াতেই আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় এই আলোচনাসভার উদ্যোক্তা হিসেবে বিএনপি’র যুক্তরাজ্য শাখার নাম করা হচ্ছে না। বরং কাগজে-কলমে এই আলোচনাসভার আয়োজক হচ্ছে ‘সিটিজেনস মুভমেন্ট ইউকে’ নামের একটি নাগরিক সংগঠন। এই সংগঠনটির আহ্বায়ক হলেন যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি ও তারেকের বিশ্বস্ত অনুগামী এম এ মালেক। সোজা কথায়, সিটিজেনস মুভমেন্টের যুক্তরাজ্য শাখা বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বই পিলখানা হত্যাকাণ্ড উপলক্ষে স্মরণসভাটির আয়োজন করছে।

তবে এই অনুষ্ঠানের প্রচারণায় বিএনপির চেয়ে স্থানীয় জামায়াত নেতৃত্বকেই বেশি তৎপর হতে দেখা যাচ্ছে। ইউরোপে জামায়াতে ইসলামী (বাংলাদেশ)-এর মুখপাত্র ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লা ইতোমধ্যেই নিজের ফেসবুক পোস্টে এই আলোচনাসভার জন্য প্রচার শুরু করেছেন, সবাইকে যোগ দিতে আমন্ত্রণও জানিয়েছেন। পূর্ব লন্ডনের একজন প্রথম সারির জামায়াত নেতা সাংবাদিকদের এমনও বলেছেন, ‘দেখবেন বিএনপির চেয়ে আমাদের নেতাকর্মীরাই হয়তো অনুষ্ঠানে বেশি সংখ্যায় আসবেন!’

 গত বছরও ২৫ ফেব্রুয়ারিতে ‘পিলখানায় সেনা হত্যাকাণ্ড: একটি জাতীয় বিপর্যয়’ নামে লন্ডনে অনুরূপ একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল বিএনপি। বিপুলসংখ্যক বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের উপস্থিতিতে সেখানে তারেক রহমান নিজেই ছিলেন প্রধান অতিথি। কিন্তু তারপর দেশে গত এক বছর ধরে বিএনপি নানাভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে জোট শরিক জামায়াতের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বেড়েছে, খালেদা জিয়া জনসভাসহ বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাদের সরাসরি ডাকা হয়নি। গত সেপ্টেম্বরে লন্ডন সফরে এসেও দীর্ঘ আড়াই মাসে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া একবারের জন্যও কোনো জামাত নেতার সঙ্গে দেখা করেননি। কিন্তু তারেকের সঙ্গে জামাতের সম্পর্ক যে আগের মতোই রয়ে গেছে, সেটাই এখন আরও একবার প্রমাণ হতে যাচ্ছে।

এমনিতে জামায়াতের ব্যাপারে তারেক রহমানের যেকোনো রাজনৈতিক ছুৎমার্গ আছে, প্রায় সাড়ে আট বছরের দীর্ঘ লন্ডন প্রবাসে তিনি অবশ্য কখনওই তেমন কোনো প্রমাণ দেননি। লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের একদা বিপুল প্রভাবশালী মেয়র লুৎফর রহমান–যিনি জামায়াতের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং গত বছর নির্বাচনি দুর্নীতির দায়ে যাকে বরখাস্ত হতে হয়, তার সঙ্গে তারেক রহমানের হৃদ্যতা ছিল নিবিড়। বহু অনুষ্ঠানে তাদের দুজনকে একসঙ্গে দেখা গেছে, মেয়র থাকাকালীন লুৎফর রহমান তারেক রহমানকে নানা সুযোগ সুবিধা পাইয়ে দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ আছে।

জামায়াতের সঙ্গে তারেকের এই দীর্ঘ ঘনিষ্ঠতায় বরাবরই সেতুবন্ধের কাজ করেছেন এম এ মালেক। লন্ডনে জামায়াতের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মালেককে বরাবরই দেখা যায়, জামায়াতের আরেক নেতা আবু বকর মোল্লা বা সেইভ বাংলাদেশ থিঙ্কট্যাঙ্কের প্রধান ব্যারিস্টার নজরুল ইসলামের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত স্তরেও ভালো ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। এই কারণেই লন্ডন তথা যুক্তরাজ্যের বিএনপি নেতারা যখন নানা কারণে জামায়াতের বিভিন্ন অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলতেন, এম এ মালেক কিন্তু সব সময়ই তার সঙ্গীদের নিয়ে সেখানে হাজির থাকতেন। সঙ্গে অবধারিতভাবে থাকত এই প্রচ্ছন্ন বার্তা, আমি তারেক রহমানেরই প্রতিনিধি।

এই এম এ মালেককেই যখন কয়েক বছর  আগে যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতির পদ থেকে অপসারিত হতে হয়, তখনই তিনি গড়ে তোলেন ‘সিটিজেনস মুভমেন্ট’ নামের ওই নাগরিক সংগঠনটি। এই সংগঠনের ব্যানারেই তিনি লন্ডনসহ যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের নানা শহরে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অসংখ্য বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেছেন। সিটিজেনস মুভমেন্ট ইউকে লন্ডন ও বার্মিংহামে ভারতীয় দূতাবাসের সামনেও বিক্ষোভ দেখিয়েছে। সে সময় যুক্তরাজ্য বিএনপির অফিসিয়াল ইউনিটের চেয়েও সিটিজেনস মুভমেন্টের সাংগঠনিক শক্তি অনেক বেশি ছিল বলে অনেকে মনে করেন, যার অনেকটাই মালেকের অর্থবল ও পেশীশক্তির কারণে, তা ছাড়া ছিল খোদ তারেক রহমানের সমর্থনও।

গত বছর যুক্তরাজ্য বিএনপিতে সভাপতির পদ ফিরে পাওয়ার পরও এম এ মালেক কিন্তু সিটিজেনস মুভমেন্ট ইউকের পাট গুটিয়ে দেননি। বরং সংগঠনটিকে একটু নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছিল পরে প্রয়োজন হতে পারে ভেবেই। আজ যখন বাইরে বিএনপির এটা দেখানো দরকার যে জামায়াতের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বেড়েছে ঠিক তখনই আবার জিইয়ে তোলা হয়েছে এম এ মালেকের নেতৃত্বাধীন এই নাগরিক সংগঠনটিকে। আর জামায়াতের সঙ্গে মিলে তারা একযোগে আয়োজন করতে চলেছে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের স্মরণসভা।

গত বছর লন্ডনের এই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা হাজির ছিলেন, এমনকি পিলখানায় নিহত বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের ছেলে রাকিন আহমেদকেও সেখানে দেখা গিয়েছিল। এবারেও মেজর (অব.) সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক, মেজর (অব.) ফারুক আহমেদ, মেজর (অব.) জহির উদ্দিন বা ইমরান চৌধুরীর মতো বর্তমানে যুক্তরাজ্য প্রবাসী অনেক অবসরে যাওয়া বাংলাদেশি সেনা অফিসার সেখানে থাকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

‘আসলে পিলখানায় যেভাবে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী তথা দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়েছিল, বিএনপি ও জামায়াত উভয়েই মনে করে এর জোরালো প্রতিবাদ হওয়াটা জরুরি। এই দৃষ্টিভঙ্গির অভিন্নতাই কিন্তু এই অনুষ্ঠান আয়োজনে আমাদের কাছাকাছি এনে দিয়েছে, সম্প্রতি সাংবাদিকদের এভাবেই বলেছেন লন্ডনে জামায়াতের একজন প্রথম সারির নেতা।

সোনালীনিউজ/এমএইউ

add-sm
Sonali Tissue
শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩