রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২০ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩

টার্গেট কিলিং : রহস্য উদঘাটনে ব্যর্থ পুলিশ

জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৪:০৫ পিএম

টার্গেট কিলিং : রহস্য উদঘাটনে ব্যর্থ পুলিশ

দেশে টার্গেট কিলিং যেভাবে বেড়েছে, সে তুলনায় রহস্য উদঘাটনে কোনো কূল কিনারা করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চলতি বছরে সংঘটিত একের পর এক জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটছে।

এসব টার্গেট কিলিংয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত সাধারণ মুদি দোকানি থেকে শুরু করে শিক্ষক, লেখক, প্রকাশক, ব্লগার, পুলিশ সদস্য, শিয়া অনুসারী, সমকামীদের অধিকারকর্মী, পীর ও ধর্মান্তরিত ব্যক্তিরা হামলাকারীদের নিশানায় পরিণত হচ্ছেন। সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে পুলিশ কর্মকর্তার স্বজনও। এমন বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের স্বজনরাও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জঙ্গি তৎপরতায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব না হওয়ায় একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এমনকি জঙ্গিদের আর্থিক নেটওয়ার্কের শেকড়ও পুরোপুরি কাটা সম্ভব হচ্ছে না। সব মিলিয়ে টার্গেট কিলিং ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছেন পুলিশ-র‌্যাবের সদস্যরা। গত দেড় বছরে দেশে ৪৫টি জঙ্গি হামলায় ৪৭ জন নিহত হন। এর অধিকাংশ ঘটনায় জড়িত মূল আসামি এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। ২৪টি ঘটনার রহস্যভেদ করা যায়নি।

রোববার (৪ জুন) চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুর হত্যার ঘটনার পর জড়িতদের গ্রেফতারের বিষয়টি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত উগ্রপন্থিদের আইনের আওতায় এনেই পুলিশ তাদের সক্ষমতার প্রমাণ দিতে চায়। তাই ঘটনার দিন রাত থেকেই রাজধানীসহ সারাদেশে জঙ্গিবিরোধী অভিযান শুরু করেছে পুলিশ।

ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের একটি দল এরই মধ্যে চট্টগ্রাম গিয়ে মাহমুদা হত্যার তদন্তে সহায়তা করছে। পুলিশ বলছে, জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে নেমেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যে কোনো সময় পুলিশের অপারেশনের দৃশ্যমান অগ্রগতি চোখে পড়বে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা সব পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট ইউনিটে পাঠানো হয়েছে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে সোমবার (৬ জুন) আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠক হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের সভাপতিত্বে সেখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা বিভাগের ঊর্ধ্বতনরা উপস্থিত ছিলেন। এসব বৈঠকে জঙ্গি তৎপরতার ঘটনায় জিরো টলারেন্স দেখানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠকে অন্তত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে। এসপিপত্নী মাহমুদা হত্যার ঘটনায় ছায়া তদন্ত পুলিশের সব ইউনিটের জন্য 'ওপেন' রাখা হয়। জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে সারাদেশের সব থানার ওসিদের আরও সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়ার ব্যাপারে জোর তাগিদ দেয়া হয়। যেসব উগ্রপন্থি এরই মধ্যে জামিন পেয়েছেন, তাদের ব্যাপারে খোঁজ নেয়া ও জামায়াত-শিবির কর্মীদের তৎপরতার ব্যাপারে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব স্থাপনা ও বসবাসের জায়গায় নিরাপত্তা জোরদার করার কথাও বলা হয়েছে। আইজিপি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার পর ৯ জুন উগ্রপন্থিদের তৎপরতা মোকাবেলার ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে আবার বৈঠক করার কথা রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ষড়যন্ত্রে এসব 'টার্গেট কিলিং' হচ্ছে। এগুলো বন্ধ করতে সরকার সব ধরনের কাজ করে যাচ্ছে। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, পুলিশের মনোবল যাতে নষ্ট হয়, সে জন্য জঙ্গিরা এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রীকে হত্যা করেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে সম্প্রতি একের পর এক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেন, এরই মধ্যে বাইরের একটি গোয়েন্দা সংস্থা এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য তিনি বিরোধী রাজনৈতিক দলকেও দায়ী করেন। তিনি মনে করেন, এ জন্য বিএনপি ও জামায়াত-শিবির দায়ী।


ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি (দক্ষিণ) মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, লেখক-প্রকাশক হত্যার সঙ্গে জড়িত উগ্রপন্থিদের ব্যাপারে এরই মধ্যে অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। শিগগিরই আরও কয়েকটি ঘটনা তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ড. জিয়া রহমান সমকালকে বলেন, টার্গেট কিলিং মোকাবেলায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বলতা রয়েছে। এমনকি সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয়েরও ঘাটতি রয়েছে। পুলিশের মধ্যে যারা জঙ্গি তৎপরতাসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রয়েছেন, তাদের নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। এসব পুলিশ কর্মকর্তার স্বজনদের নিরাপত্তার বিষয়টি নতুনভাবে চিন্তা করা জরুরি।

গত দেড় বছরে উগ্রপন্থিরা যেসব হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় তার অধিকাংশ ঘটনার রহস্যের কোনো কিনারা হয়নি। গত ৭ এপ্রিল সূত্রাপুরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজিমুদ্দিন সামাদকে হত্যা করা হয়। দুই মাস পরও এ ঘটনায় জড়িত একজনকে গ্রেফতার করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত ২৫ এপ্রিল কলাবাগানে ইউএসএইড কর্মকর্তা জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু মাহবুব তনয়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সিসিটিভির ফুটেজে পাঁচজনকে পালিয়ে যেতে দেখা গেছে। এ ঘটনায় শরিফুল ইসলাম শিহাব নামে পুলিশ সন্দেহভাজন একজনকে গ্রেফতার করলেও মূল আসামিরা এখনও অধরা। গত ৩০ এপ্রিল টাঙ্গাইলে হিন্দু দর্জি নিখিল চন্দ্র জোয়ার্দারকে হত্যা করা হয়।

পুলিশ বলছে, ওই ঘটনায় জেএমবির সম্পৃক্ততা রয়েছে। যদিও এখনও জড়িত একজনকেও গ্রেফতার করা যায়নি। ২৭ ফেব্রুয়ারি ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন সাতজনকে গ্রেফতার করা হলেও মূল আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ ছাড়া গত বছরের ২ নভেম্বর প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যার ঘটনায় একজনকেও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। শুদ্ধস্বরের কর্ণধার আহমেদুর রশীদ টুটুলের ওপর হামলাকারীরা এখনও আইনের আওতায় আসেনি। গত দেড় বছরে দেশে ৪৫টি জঙ্গি হামলার ঘটনার মধ্যে ২৪টির রহস্য উদ্ঘাটন করা যায়নি। মাত্র চারটি ঘটনায় দায়ের করা মামলার চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ।

যদিও গত ৩ মে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক দাবি করেন, 'সম্প্রতি ৩৭টি জঙ্গি হামলার মধ্যে ৩৪টির মূল রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে।'

সোনালীনিউজ/ঢাকা/জেডআরসি/এমটিআই

 

 

add-sm
Sonali Tissue
রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২০ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩