শুক্রবার, ০৯ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩

ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বাল্যবিয়ে

আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৩:৫৪ পিএম

ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বাল্যবিয়ে

সাজেদুর রহমান, অতিথি লেখক, ঝিনাইদহ থেকে
জেলার কালীগঞ্জ উপজেলা চিত্রা নদীর কুল ঘেঁষে গড়ে ওঠা একটা জনপদ। এখানকার গ্রামগুলোতে এখনও বাল্য বিবাহ বন্ধ হয়নি। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে কিংবা মুখে কুলূপ এটে লোকচক্ষুর সামনেই চলছে বাল্য বিয়ের আয়োজন।

উপজেলা প্রশাসন এ বিষয়ে বেশ তৎপর। তবে আয়নার উল্টো পিঠের মতো অস্বচ্ছ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসন। অনুসন্ধানে বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মেম্বর ও সচিবদের বিরুদ্ধে জন্ম নিবন্ধনে বয়স বাড়িয়ে দিয়ে এসব বিয়েতে সম্পৃক্তার অভিযোগ রয়েছে। তেমনি ভাবে অনেক সময় অজ্ঞ অভিভাবকরা গোপানে কাজী ডেকে বিয়ে রেজিষ্ট্রেশন করিয়েও নিচ্ছেন।

আশার কথা, কিছুদিন আগের চেয়ে বর্তমানে অনেক কমে গেছে এই  প্রবণতার হার। জনগন আরও বেশি সচেতন হলে বাল্য বিয়ে মোটেই থাকবে না বলে দাবি করেন স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব মানোয়ার হোসেন মোল্লা বলেন, কালীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন সবসময় বাল্য বিয়ে প্রতিরোধ করতে প্রস্তুত। সেই সঙ্গে আমরা যখনই খবর পাই কোনো গ্রামে বাল্য বিয়ের আয়োজন করা হচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে আমরা সেখানে গিয়ে তা বন্ধ করি। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আর্থিক দণ্ড কিংবা কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড দেয়ার নজিরও আছে। ইউনিয়ন প্রশাসনের অবহেলার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এমন কোনো অভিযোগ এখনো পায়নি, তবে কেউ অভিযোগ করলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সচেতনার অভাবে বাল্য বিয়ের কারণে গর্ভধারণে মৃত্যুর হার বেড়ে যায়। অল্প বয়সে নানান রোগ জেঁকে বসে মায়েদের। ফলে অকাল মৃত্যুর হারও কম নয়। আর এ জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ি অভিভাবকরা। অনেক সময় সংসারে অভাবসহ একাধিক মেয়ে থাকায় অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে বিয়ে দিয়ে দেয়। তবে এ ক্ষেত্রে অনক সময় মেয়েরা স্বামী পরিত্যক্ততার খাতায় নাম লেখায়।

কালীগঞ্জ উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ১৯৮টি গ্রামের কোনো না কোনো গ্রামে বাল্য বিয়ের আয়োজন হচ্ছে প্রতিদিন। কোনোটা রুখতে পারছে প্রশাসন কিংবা স্থানীয় সচেতন সমাজ। আবার কোনোটা লোকচক্ষুর সামনেই চলে যাচ্ছে বাল্য বিয়ের নামের চিতায়। কালীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন থানা পুলিশের সহযোগীতায় অনেক বাল্য বিয়ে বন্ধ করেছে। এমনকি জরিমানা কিংবা সাজার ব্যবস্থা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদলত।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব মানোয়ার হোসেন মোল্লা আরও বলেন, প্রত্যন্ত গ্রামে বাল্য বিয়ের প্রবণতা বেশি। তাদের মধ্যে শিক্ষিতের হারও অনেক কম। অভাব অনটনের কারণেও গ্রামঞ্চলে মানুষের মধ্যে অল্প বয়সে বিয়ে দেয়ার হার বেশি। নাম প্রকাশে অনইচ্ছুক, একাধিক ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, গরীব অসহায় অভিভাবকরা এসে এমন ভাবে ধরে না বলা যায় না। বাধ্য হয়ে নতুন করে বয়স বাড়িয়ে জন্ম নিবন্ধন দিতে হয়। এতে করে কোনো অর্থ নেওয়া হয় না। একই কথা বলেন, রায়গ্রাম ইউপি মেম্বর আব্দুল গণি।

রায়গ্রাম ইউনিয়ন বিবাহ রেজিষ্ট্রার আব্দুস সালাম জানান, আমরা জন্ম নিবন্ধন অনুযায়ী সরকারী নিয়মে বিয়ে রেজিষ্ট্রির কাজ সম্পাদন করে থাকি। তবে অনেক সময় যদি বুঝতে পারি ছেলে মেয়ের বয়স কম সেক্ষেত্রে বিয়ে রেজিষ্ট্রি থেকে বিরত থাকি। অনেক রেজিষ্ট্রার আছে টাকার কাছে বিক্রি হয়ে বিবাহ রেজিষ্ট্রেশন করায়। সরকারী আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ে ও ২১ বছরের কম বয়সী ছেলের মধ্যে বিবাহ রেজিষ্ট্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তথাপি গ্রাম-গঞ্জ গুলোতে মানুষ ততটা আইন-কানুন বোঝে না। তারা বিশেষ করে মেয়েদের শারীরিক পরিবর্তন দেখলে বিয়ের জন্য পাত্র দেখা শুরু করে। অল্প বয়সে বছর ঘুরতে না ঘুরতে সন্তানের মা হয়ে যায় মেয়েরা।

জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের ১৮ বছরের আগে ৬৬ শতাংশ মেয়ে এবং ৫ শতাংশ ছেলের বিয়ে দেয়া হচ্ছে। এ তথ্যে আরও জানানো হয়, বাংলাদেশের ১০ থেকে ১৯ বছরের দুই তৃতীয়াংশ কিশোরী বাল্য বিয়ের শিকার। যার ৬৯ শতাংশ গ্রামঞ্চালে ঘটছে বলে ইউনিসেফ ২০১০ সালের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করেন। এতে দেখা যায় বাংলাদেশের ১৫ বছরের কম বয়সে বিবাহিত মেয়েদের ২৪ বছর পেরনোর আগে দুই বা ততোধিক সন্তানের মা হবার হার ২০ শতাংশের বেশি।

সোনালীনিউজ/ঢাকা/আকন

add-sm
Sonali Tissue
শুক্রবার, ০৯ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩