মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই, ২০১৮, ১ শ্রাবণ ১৪২৫

তিস্তা নয়, মোদির সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে কথা হবে প্রধানমন্ত্রীর!

কূটনৈতিক প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০১৮, সোমবার ০২:০০ পিএম

তিস্তা নয়, মোদির সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে কথা হবে প্রধানমন্ত্রীর!

ফাইল ছবি

ঢাকা: আট দিনের সরকারি সফরে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রোববার (১৫ এপ্রিল) সৌদি আরবের হাম্মামের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন তিনি। সেখান থেকে সোমবার বিকেলেই লন্ডনের উদ্দেশে সৌদি ত্যাগ করবেন শেখ হাসিনা। ব্রিটেনে চোগাম (কমনওয়েলথ হেড অব গভর্নমেন্ট মিটিং)-এ অংশগ্রহণের জন্য সাত দিন অবস্থান করবেন। 

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে কূটনীতিকরা। এর কারণ, শেখ হাসিনা যখন ব্রিটেনে সফর করছে ঠিক তখন ভারতের নরেন্দ্র মোদিও সেখানে যাচ্ছেন। এই সফরে দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের বিষয়ে ইতোমধ্যেই দুদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণায়লকে ব্যাপক তৎপরতা দেখা গেছে।

ওই বৈঠকে বাংলাদেশের বহুল প্রত্যাশিত তিস্তা চুক্তির বিষয়ে কোনো পাকা কথা দিচ্ছেন না মোদি। তবে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে কথা হবে। 

ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লন্ডনের ওই সম্মেলনের ফাঁকে মোদি-হাসিনার মধ্যে একটি বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক অনেক বিষয় ছাড়াও বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়েও কথা হবে।

মাত্র বছর খানিকের আগেই মোদি-হাসিনার বৈঠক হয়েছে। এর মধ্যে কোনো তৃতীয় দেশের সঙ্গে দুই দেশই দ্বিতীয় বার বৈঠকে বসেনি। তার মধ্যে দু’টি দেশেই নির্বাচন কড়া নাড়ছে। লন্ডনের বৈঠকটি সম্ভব হলে, কূটনৈতিক শিবিরের হিসেব মতো বর্তমান সরকারের আমলে এটাই দু’দেশের শেষ শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক হবে। ফলে এই বৈঠকের গুরুত্ব গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই যথেষ্ট। 

তাদের এই বৈঠকের বিষয়ে গুরুত্ব দিতে গত ৮ এপ্রিল ঢাকা সফরে এসেছিলেন দেশটির নবনিযুক্ত পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলে। তার ওই সফরে তিনি জানিয়ে দেন আপাতত মোদি তিস্তা সম্পর্কে খুশির খবর দিতে পারছেন না। সফরকালে ভারতের সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে ছয়টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে ভারত থেকে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য পাইপলাইন স্থাপন, বাংলাদেশ বেতার ও প্রসার ভারতীর মধ্য সহযোগিতা, রংপুর সিটি করপোরেশনে সড়ক নির্মাণ, বাংলাদেশে ৫০৯টি স্কুলে ল্যাংগুয়েজ ল্যাব স্থাপন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উর্দু চেয়ার স্থাপন আর দুই দেশের আণবিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা।

তারও আগে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল বিমস্টেক-এর নিরাপত্তা বিষয়ক বৈঠকে যোগ দিতে ঢাকা এসেছিলেন। তিনিও মোদি ও শেখ হাসিনার বৈঠকের বিষয়টি জানিয়েছিলেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রের খবর।

গোটা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের ওপরই চীনের প্রভাব বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের গুরুত্ব দিল্লির কাছে অনেক বেশি। ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের পূর্বে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। ওই নির্বাচন বিএনপি বর্জন করায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউসহ পশ্চিমারা হতাশ হয়েছিল। কিন্তু সুজাতা সিং ওই নির্বাচনের প্রতি ভারতের সমর্থনের কথা জানিয়েছিলেন। 

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ সরকারের আরো বেশি আস্থা অর্জন করাটাকে এখন অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। সাংস্কৃতিক মাধ্যমে ‘ট্র্যাক টু’ কূটনীতির দিকেও জোর দেয়া হচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে ১০ এপ্রিল ঢাকায় আসেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে একটি আলোচনা সভায় যোগ দিতে ঢাকায় আসবেন রবীন্দ্রভারতীর উপাচার্য সব্যসাচী বসু রায় চৌধুরী এবং বিশ্ব ভারতীর উপাচার্য সবুজকলি সেন।

এছাড়াও, বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে বিশেষ করে চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও বেশ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে যৌথ প্রযোজনায় সিনেমা নির্মাণ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোও বেশ ভূমিকা পালন করছে।

আনন্দবাজার বলছে, লন্ডনে বৈঠক হলে আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক সমস্যাগুলি নিয়ে আলোচনা করবেন দু’দেশের প্রধানমন্ত্রী। সম্প্রতি ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তিস্তা ছাড়াও আরো অনেকগুলি দিক রয়েছে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে। বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ভারত পাশে রয়েছে। যে কাজগুলি ইতিমধ্যেই চলছে তার পাশাপাশি, নতুন কোন ক্ষেত্রে সমন্বয় বাড়ানো যায়, তা নিয়ে কথা বলবেন মোদি-হাসিনা। কথা হবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়েও।

সন্ত্রাসের মোকাবিলা করতে পারস্পরিক সহযোগিতা আগামি দিনগুলিতে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে মনে করে ভারত। প্রতিবেশী রাষ্ট্রে নির্বাচনের মুখে প্রতিহিংসার ঘটনা বাড়লে তার প্রভাব সীমান্তে পড়তে পারে— এই উদ্বেগও রয়েছে নয়াদিল্লির। নিরাপত্তা সহযোগিতা আরো জোড়দার করা নিয়ে কথা চলছে দু’দেশের।

তিস্তা নিয়ে খুশির সংবাদ না দিতে পারার বিষয়ে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, তিস্তা চুক্তি সই করার জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সম্মতি এখনো পাওয়া যায়নি। তার সম্মতির পাওয়া গেলে মোদি ভোটের আগেই বাংলাদেশ সফরে আসবেন। তবে মমতা তার দেশের রাজনীতিতে মোদির বিরোধিতায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। ফলে তিস্তার ব্যাপারে তার সম্মতি পাওয়া এখনও সুদূরপরাহত।

তবে তিস্তা নিয়ে আশু নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা না থাকলেও রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য তাদের আগ্রহের কথা জানাবে মোদি। রাখাইন প্রদেশকে আর্থ সামাজিকভাবে ঢেলে সাজার জন্য কী পদক্ষেপ করলে সুবিধা হয়, সে বিষয়ে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের কাছে জানতে চেয়েছে ভারত।

তারই অংশ হিসেবে বিজয় গোখলের সফরে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে ভারত বাংলাদেশকে ত্রাণ সহায়তা বাড়ানো আশ্বাস দিয়েছে। তাছাড়া রোহিঙ্গদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে সহায়তা করবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন ভারতের এই নতুন কূটনীতিক। 

যদিও, গত বছরের শেষে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত জেলা রাখাইনের উন্নয়নের জন্য একটি চুক্তিপত্রে সই করেছে ভারত। সেখানে প্রস্তাবিত আবাসন তৈরির প্রকল্পগুলি শুরু করে দিতে সক্রিয় হচ্ছে মোদি সরকার। 

শেখ হাসিনার ব্রিটেন সফরের সূচি
প্রধানমন্ত্রী ১৭ এপ্রিল সকালে ওয়েস্টমিনস্টারের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠেয় কমনওয়েলথ নারী ফোরামের ‘এডুকেট টু এম্পাওয়ার: মেকিং ইকুইটেবল অ্যান্ড কোয়ালিটি প্রাইমারি এডুকেশন অ্যান্ড সেকেন্ডারি এডুকেশন আ রিয়েলিটি ফর গার্লস অ্যাক্রোস দ্য কমনওয়েলথ’ শীর্ষক অধিবেশনে বক্তব্য দেবেন।

প্রধানমন্ত্রী বিকেলে যুক্তরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ থিংক ট্যাংক বৈদেশিক উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (ওডিআই) আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। তিনি ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতি: নীতি, অগ্রগতি ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।

১৮ এপ্রিল শেখ হাসিনা এশীয় নেতাদের ‘ক্যান এশিয়া কিপ গ্রোইং?’ রাউন্ড টেবিলে অংশ নেবেন। বিকেলে তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে আয়োজিত অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান ও পরে নৈশভোজে যোগ দেবেন। 

১৯ এপ্রিল শেখ হাসিনা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের বৈঠকের (সিএইচওজিএম) আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে যোগদান করবেন। শেখ হাসিনা কমনওয়েলথ মহাসচিব প্যাট্রিসিয়া স্কটল্যান্ড কিউসির দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। তিনি সরকারপ্রধান ও তাঁদের স্বামী/স্ত্রীদের সম্মানে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের দেওয়া সংবর্ধনা ও নৈশভোজে যোগদান করবেন।

২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তিনটি ‘রিট্রিট সেশন’ ও শীর্ষ সম্মেলনের সমাপনী কার্যনির্বাহী অধিবেশনে অংশ নেবেন।

২১ এপ্রিল তিনি রয়েল কমনওয়েলথ সোসাইটি (আরসিএস) আয়োজিত শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী সরকারপ্রধানদের জন্য সংবর্ধনা এবং রানির জন্মদিনের অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। একই দিনে প্রধানমন্ত্রী এক কমিউনিটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। এ ছাড়া শেখ হাসিনা শীর্ষ সম্মেলনের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। তিনি ২৩ এপ্রিল দেশে ফিরবেন।

সোনালীনিউজ/ঢাকা/এআই

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue