শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩

থমকে গেছে ট্রান্সশিপমেন্ট কার্যক্রম

আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৩:৫৬ পিএম

থমকে গেছে ট্রান্সশিপমেন্ট কার্যক্রম

বিশেষ প্রতিনিধি

ভারতের ট্রান্সশিপমেন্ট ফি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। গতবছর দু’দেশের সচিব পর্যায়ে বৈঠকে প্রতি টন পণ্য পরিবহনে ১৩০ টাকা ট্রান্সশিপমেন্ট ফি নির্ধারিত হয়। কিন্তু সম্প্রতি বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে এনবিআর নির্ধারিত ফি ১৩০ টাকার সাথে আরো ৩১০ টাকা যোগ করতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। কিন্তু এনবিআরের এ আপত্তিকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় অসহযোগিতা হিসাবে দেখছে। মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ- এনবিআরের এ আপত্তির নিষ্পত্তি না হওয়ায় দু’দেশের মধ্যে ট্রান্সশিপমেন্ট কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ট্রান্সশিপমেন্ট ফি কতো হবে তা নিয়ে গতবছরের নভেম্বরে নয়াদিল্লিতে দু’দেশের নৌ-সচিব পর্যায়ের বৈঠকে নৌ-প্রটোকলের আওতায় তা পর্যালোচনা করে সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়। এমনকি উভয় দেশই এ নিয়ে তখন অনুমোদিত কার্যপত্রও (এগ্রিড মিউনিটস) স্বাক্ষর করে। ওই বৈঠকে এনবিআরের একজন সদস্যও উপস্থিত ছিলেন। তখনই ট্রান্সশিপমেন্ট ফি নির্ধারণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। তবে সেক্ষেত্রে কোনো সংযোজন বা সংশোধনের প্রয়োজন হলে পরবর্তী নৌ-সচিব পর্যায়ের সভায় তা উত্থাপন করে সংশোধনের সিদ্ধান্ত হয়। ওই সিদ্ধান্ত গ্রহণের দু’মাসের মধ্যেই নির্ধারিত ফি নিয়ে আপত্তি তুলেছে এনবিআর। সংস্থাটি ১৩০ টাকার সাথে স্ক্যানিংয়ের জন্য ৩শ’ টাকা এবং অটোমেশন সেবা বাবদ ১০ টাকাসহ মোট শুল্কায়নে ৪৪০ টাকা দাবি করেছে।

সূত্র জানায়, শুরুতেই এনবিআর দ্বিপক্ষীয় ট্রান্সশিপমেন্ট ফি ৫৮০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এনবিআরই ফি বাবদ টনপ্রতি ১৩০ টাকায় নামিয়ে আনার প্রস্তাব করে। সেক্ষেত্রে স্ক্যানিংয়ের জন্য ৩শ’ টাকা, মার্চেন্ট ওভারটাইম ৪০ টাকা, অটোমেশন সেবা বাবদ ১০ টাকা ও অন্যান্য প্রশাসনিক সেবা বাবদ ৫০ টাকা বাদ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া নথি প্রক্রিয়াকরণে ১০ টাকা, ট্রান্সশিপমেন্ট বাবদ ২০ ও নিরাপত্তা বাবদ ১০০ টাকাসহ মোট ১৩০ টাকা ফি ধার্যের প্রস্তাব করা হয়। আর পণ্য যদি নিরাপদে পৌঁছে দিতে এসকর্ট প্রদান করতে হয় তাহলে আরো ৫০ টাকা যোগ করার কথা ওই প্রস্তাবে বলা হয়। এর বাইরে ট্রানজিট ফি নির্ধারণী সভায় মার্চেন্ট ওভারটাইম চার্জ আরোপের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হওয়ার দু’মাসের মধ্যে এনবিআর নতুন করে আপত্তি জানায়। এ প্রেক্ষিতে নৌ মন্ত্রণালয় থেকে গত নভেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারতের নৌ-সচিব পর্যায়ে বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তকেই আদেশ হিসেবে জারি করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য এনবিআরকে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু এনবিআর ওই আদেশ হিসেবে জারি করছে না। ফলে কলকাতা থেকে আশুগঞ্জ নদীবন্দর ট্রান্সশিপমেন্ট কার্যক্রম চালু করতে পারছে না ভারতীয় বিভিন্ন এজেন্ট এবং বাংলাদেশের অপারেটররা।

সূত্র আরো জানায়, ট্রানজিট সুবিধা চালু হলে নৌ-প্রটোকলের আওতায় বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রাথমিকভাবে ভারত ১৫ লাখ টন পণ্য আনা-নেয়া করবে। ফলে বাংলাদেশ বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে। কারণ এই প্রটোকলের আওতায় সিংহভাগ জাহাজই বাংলাদেশের মালিকানায় থাকছে। কিন্তু শুল্কায়ন নিয়ে এনবিআরের আদেশ না হওয়ায় সেই কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে এনবিআর স্ক্যানিংয়ের এবং অটোমেশন সেবা বাবদ টাকা চাইছে। কিন্তু তাদের ওই সেবা দেয়ার যন্ত্রপাতিই নেই। আগে এনবিআর  ওগুলো স্থাপন করে তারপর তার জন্য চার্জ করলেই ভালো হতো। কিন্তু হঠাৎ করেই এনবিআর নতুন করে চার্জ আরোপ করায় এখন দু’দেশের নৌ-সচিব পর্যায়ের পরবর্তী বৈঠকে উত্থাপন করে তা সংশোধন করতে হবে।

এদিকে এনবিআর সংশ্লিষ্টদের দাবি- আইন মেনেই ট্রান্সশিপমেন্ট ফির বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে এনবিআর। ইতিপূর্বে এগ্রিড মিউনিটসে পরবর্তীতে স্ক্যানিং এবং অটোমেশন চার্জ যোগ করার কোনো শর্ত ছিল না। এখন তা যোগ করতে বলা হয়েছে। কারণ এনবিআর যখন সেবা দেবে তখনই চার্জ  নেবে। সেক্ষেত্রে এ চার্জ যোগ করতে নৌ মন্ত্রণালয়ের সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তাছাড়া এনবিআর ট্রানজিট পণ্যের ব্যাংক গ্যারান্টি নিতে পারবে না। কারণ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) জাহাজে পণ্য পরিবহনের জন্য প্রতি যাত্রায় ২ লাখ টাকার জামানত গ্রহণ করে। একই পণ্যে দুই গ্যারান্টির জটিলতা এড়াতেই এনবিআরের ব্যাংক গ্যারান্টি নেয়ার দরকার নেই বলে সিদ্ধান্ত নেয়।

অন্যদিকে বিআইডব্লিউটিএ নৌ-প্রটোকলের আওতায় নতুন করে টনপ্রতি ১০ টাকা কার্যবেক্ষণ চার্জ আরোপের প্রস্তাব করেছে। তার বাইরে সংস্থাটি প্রতি যাত্রায় নৌযান প্রবেশ ফি ২ হাজার ৫০০ টাকা, প্রতি বিটে পাইলটেজ চার্জ বাবদ ৩০০, জাহাজের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী সংরক্ষণ (কনজারভেন্সি) বাবদ প্রতি বছর টনপ্রতি ৭৩, আশুগঞ্জে বার্দিং বাবদ ২৫০, শ্রমিক হ্যান্ডেলিংয়ে টনপ্রতি ৪০ ও ল্যান্ডিং শিপিং চার্জ বাবদ ৩০ টাকা নিয়ে থাকে। তার সাথে মংলা-ঘষিয়াখালী রুটটি ব্যবহারের জন্য গড় টনপ্রতি ৬ টাকা এবং গাবখান রুটটির জন্য ৪ টাকা ক্যানেল চার্জ আদায় করা হয়। আর অপারেটরদের লাইসেন্স ফি বাবদ বছরে ২০ হাজার টাকা নিয়ে থাকে বিআইডব্লিউটিএ। সেগুলো বহাল থাকবে। তবে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর নৌযানগুলোর মান নিয়ন্ত্রণের জন্য টনপ্রতি ২ ডলার মাশুল নির্ধারণের প্রস্তাব বাতিল করা হয়েছে।

এ বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব অশোক মাধব রায় কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন। তবে নৌমন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, হঠাৎ করে কোনো কারণ ছাড়াই এক প্রকার ভেটো দিয়ে বসেছে এনবিআর। তাদের অসহযোগিতার কারণে দ্বিপক্ষীয় ট্রান্সশিপমেন্ট চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। যদিও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় তথা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেই ওই ফি নির্ধারণের অনুমোদন নেয়া হয়েছে।

সোনালীনিউজ/এমএইউ

add-sm
Sonali Tissue
শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩