শুক্রবার, ০৯ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩

ধর্ম প্রচার করে বিনিময় গ্রহণ

মোহাম্মদ সালেহ নূর | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৪:০৫ পিএম

ধর্ম প্রচার করে বিনিময় গ্রহণ

আমি যুক্তরাজ্যে দেখেছি, খ্রিস্টান মিশনারিরা বাংলাভাষা বলতে পারে এবং লিখতে পারে। তারা বাংলাভাষায় এবং নিজের টাকা-পয়সা খরচ করে খুব আন্তরিকতার সংঙ্গে ধর্ম প্রচার করছে। তারা মনে করে সত্যের পথে আছে।

মহানবী (সা.) নির্দেশ হলো যখন উম্মত বিভিন্ন মতপার্থক্যে বিভক্ত হবে তখন যেন রাসূল (সা.) খায়রুল কুরুনের অর্থাৎ সাহাবি, তাবেঈন এবং তাবে তাবেঈনদের অনুসরণ করে। কেউ যদি খুব আন্তরিকতার সঙ্গে দীন ইসলামের প্রচারের জন্য সামান্য পরিমাণও পারিশ্রমিক গ্রহণ করে তাহলে সেটা বাহ্যিক দৃষ্টিতে ইসলাম প্রচারের জন্য সহায়ক মনে হলেও সুদূর প্রসারী এর কুপ্রভাব মুসলমানদের মাঝে ক্যান্সারের আকার ধারণ করবে, যেহেতু এটা অনেক ত্যাগী আলেম হালাল মনে করেন না সুস্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হয় জরুরত পরিমাণ বিনিময় গ্রহণ অনুমতি দেয়া না হলে দীন ইসলামের হেফাজত কঠিন হতো। প্রকৃতপক্ষে এর কুপ্রভাব মুসলমান সমাজে ক্যান্সারের আকার ধারণ করেছে।

যেখানে প্রতিদিন মসজিদে দীনি আলোচনা হওয়ার কথা ছিল সেখানে আজ বিনিময় ছাড়া খুব কম সংখক আলেমকেই দীনি আলোচনার ব্যবস্থা করতে দেখা যায়। সাধারণ মুসলিমদের তিন দিনের অধিক সময় দীনি আলোচনায় উপস্থিত না থাকলে ঈমান রক্ষা করাই কঠিন হয় পড়ে। ইসলামের পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত আলেমরা দীনি খেদমতের যে নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টা ছিল, আজকে খুব কম সংখ্যক আলেমকেই সেরকম করতে দেখা যায়। যদি জরুরত পরিমাণ পারিশ্রমিক গ্রহণের অনুমতি দেয়া না হতো তাহলে বর্তমানের অনেক আলেমরা (সবাই নয়) দৈনিক দুই ঘণ্টা করে হলেও ফল বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করতেন এবং আল্লাহ অবশ্যই তাতে বরকত দিতেন। এর ফলে ওয়াজ নসিহত বা মাদরাসায় শিক্ষকতা করে জীবিকা নির্ধারণের তাদের সর্বক্ষণ চিন্তা থাকত না।

তারা চিন্তা করতেন, তাদের অর্জিত এলম কিভাবে সর্বসাধারণের দ্বারে দ্বারে পৌঁছানো যায়। সেটা না হয়ে আজকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মসজিদের ইমাম বা মাদরাসায় শিক্ষাকতা করাই কিছু আলেমের (সবাই নয়) বৈশিষ্ট্য হয়ে গেছে।

অসংখ্য মুসলমান আছেন, যারা দীনি আলোচনা শুনতে চান কিন্তু শুনানোর মতো পর্যাপ্ত ত্যাগী লোক নেই। মাঝে মাঝে বার্ষিক কিছু ওয়াজ মাহফিল হয়, তবে সেটা চুক্তিভিত্তিক অর্থ ব্যয় করে আয়োজন করতে হয়। জরুরত পরিমাণ বিনিময় গ্রহণ করা জায়েজ করার কারণে অসংখ্য ওয়াজ নসিহতের আয়োজন করা যায় না শুধু পরিশ্রমিক নিয়ে মতভেদ হওয়ার কারণে। অনেকে দাবি করেন প্রত্যেক ওয়াজে বিশ হাজার টাকাই জরুরত পরিমাণ।

উদাহরণ এভাবে দেয়া যেতে পারে, কোন ডাক্তার রোগীর অবস্থা বুঝে জরুরত পরিমাণ নেশাজাতীয় ওষুধ গ্রহণের অনুমতি দিল। এখন সেই রোগী ওই পরিমাণ নেশাজাতীয় ওষুধ ক্রয় করার অনুমতি পেল। ফলশ্রুতিতে যদিও ডাক্তারের উদ্দেশ্য ছিল জরুরত পরিমাণ, কিন্তু রোগী তার জরুরত এমনভাবে পূরণ করা শুরু করল, সে মনে করে যে, দৈনিক দশ বার ওষুধ নেয়াটাই তার জরুরত। পরিশেষে রোগী মৃত্যুবরণ করল এবং এ ডাক্তার জরুরত পরিমাণ সার্টিফিকেট দেয়ার কারণে আরও হাজার হাজার রোগী মৃত্যুবরণ করল।

যদি যুগের দোহাই দিয়ে জরুরত পরিমাণ বিনিময় গ্রহণ করাকে ইসলামের চার মাজহাবের স্বীকৃত ফতোয়ার বিপরীতে কোন ফতোয়া দেয়া হয় তাহলে আজ সাধারণ মুসলিমরা দ্বিধায় পড়ে যাবে হালাল হারামের বাছাই করার সময়। উদাহরণ স্বরূপ এক ব্যক্তি মাস্টারস করার পর নিম্নলিখিত চাকরি একটার পর একটা পরিত্যাগ করে। সেগুলো হলো

১. সুদভিত্তিক ব্যাংক, ২. ইনস্যুরেন্স কোম্পানি, ৩. ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। ৪. শেয়ার ব্যবসা (নিরানব্বই শতাংশ কোম্পানি সুদভিত্তিক)।

সে চিন্তা করল, এ চাকরির দুর্বাজারে সে কোন মতে আর একটা চাকরি যোগাড় করল। তার দায়িত্ব হল বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের বিজ্ঞাপন দেয়ার জন্য কিছু নির্দিষ্ট বিলবোর্ড ভাড়া দেয়া। এখন বেশিরভাগ কোম্পানি বিলবোর্ডে বিভিন্ন নারী মডেলদের ছবি সংযোজন করে। এখন Unilver-এর সাবানের বিজ্ঞাপনে এক নায়িকার ছবি আমাদের অলিতে গলিতে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন এ ব্যক্তি একটার পর একটা চাকরি ত্যাগ করে বহু কষ্টে এক বছর পর যখন এ চাকরি পেল, সে তখন মনকে বুঝ দেয় জীবিকা নির্ধারণের জন্য জরুরত পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করা এ চাকরি থেকে তার জন্য হালাল। যেহেতু চার মাযহাবে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও জীবিকা নির্ধারণের জন্য এমন একটি কাজকে হালাল সাব্যস্ত করা হয়েছে যেটা ইসলামের পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত হারাম ছিল। এভাবে অনেক হালাল-হারাম বাছাই করার ব্যাপারে মানুষ ছাড় দিতে শুরু করেছে।

ইসলামের পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত দীন ইসলাম প্রচারে বা কোরআন শিক্ষার বিনিময়ে ন্যূনতম অর্থ বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করা হারাম ছিল। তখনকার সময় আমাদের মুসলিম সমাজে দীন ইসলাম শক্তিশালীভাবে বিরাজ করছিল, আজকে ইসলাম বা কোরআন শিক্ষার বিনিময়ে জরুরত পরিমাণ পারিশ্রমিক গ্রহণ করাকে হালাল করে দিয়ে আমরা পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত যে দীন ইসলাম ছিল তার চেয়ে বেশি দীন ইসলাম হেফাজত করতে পেরেছি? আজকে যদি সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন অথবা তাবে তাবেঈন সময়ের কেউ বেঁচে থাকতেন, তাহলে সারা পৃথিবীতে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলেও তারা দীন ইসলাম প্রচার বা কোরআন শিক্ষার বিনিময়ে ন্যূনতম পরিমাণ অর্থ বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করা কোন অবস্থাতেই হালাল মনে করতেন না।

সোনালীনিউজ/ঢাকা/আকন

শুক্রবার, ০৯ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩