বুধবার, ২৮ জুন, ২০১৭, ১৪ আষাঢ় ১৪২৪

নাবিক নিয়োগের নামে প্রতারণা, মানবপাচারের অভিযোগ

আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৩:৫৮ পিএম

নাবিক নিয়োগের নামে প্রতারণা, মানবপাচারের অভিযোগ

সোনালীনিউজ রিপোর্ট

সমুদ্রগামী জাহাজে নাবিক নিয়োগের নামে চলছে অর্থ আত্মসাৎ, প্রতারণা ও মানবপাচারের ঘটনা। কিন্তু এই অপকর্মের সঙ্গে জড়িত মেনিং এজেন্টগুলো থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। দুর্নীতিবাজ ওই সব মেনিং এজেন্টের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরে (ডিজি শিপিং) অভিযোগের পাহাড় জমলেও অজ্ঞাত কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরব।

ভুক্তভোগী নাবিকদের অভিযোগ─ ডিজি শিপিংয়ের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যোগসাজশেই নাবিক নিয়োগের নামে মেনিং এজেন্টগুলো নানামুখী অপতৎপরতা চালাচ্ছে। যা একদিকে যেমন সাধারণ নাবিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে বহির্বিশ্বে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের সুনাম। ডিজি শিপিং ও ভুক্তভোগী নাবিকদের সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাংলাদেশ সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর সমুদ্রগামী জাহাজে নাবিক নিয়োগের জন্য ৯৬টি বেসরকারি সংস্থাকে মেনিং এজেন্ট লাইসেন্স দিয়েছে। তার মধ্যে ৩৩টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠায় ওসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হয়। বর্তমানে ৬৩টি মেনিং এজেন্ট জাহাজে নাবিক নিয়োগের কার্যক্রম চালাচ্ছে রয়েছে। আবার ওসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেশ কয়েকটির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে।

আর অভিযোগ প্রমাণের পর সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর তাদের লাইসেন্স স্থগিত করে। কিন্তু এক মাস না যেতেই রহস্যজনক কারণে ওই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। ২০১৪ সালের ২৮ আগস্ট সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর এম জাকিউর রহমান ভূঁইয়া বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে মেসার্স এভার চিয়ার মেরিন সার্ভিসেসের লাইসেন্সের কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থগিত করেন (স্মারক নং-৪০১.০০৬.০৫৯.০০.০০.২০৫/এভার চিয়ার মেরিন সার্ভিসেস/৪৬৬৩ (৭)।

কিন্তু ওই আদেশ জারির মাত্র তিন মাসের মধ্যেই ৬টি শর্ত আরোপ করে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। তারপর ২০১৫ সালের ১৬ নভেম্বর নানা অভিযোগের কারণে আবারো মেসার্স এভার চিয়ার মেরিন সার্ভিসেসের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়। তবে মাত্র ৩৫ দিনের ব্যবধানে সেই স্থগিতাদেশ আবারো প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। তাছাড়া সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের শর্ত পূরণ না করাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মেসার্স কেএসএফ শিপিং সার্ভিসেস নামের একটি মেনিং এজেন্টের লাইসেন্স অধিদপ্তর ২০১০ সালের ১০ মে ৩ মাসের জন্য বাতিল করে।

কিন্তু একই বছর ডিসেম্বর মাসে ওই প্রতিষ্ঠানই ১৭ জন নাবিককে সৌদি আরব পাঠায়। কিন্তু ওই নাবিকরা জেদ্দার একটি হোটেল থেকে পালিয়ে যায়। এ ঘটনার পর থেকে সৌদি আরবে বাংলাদেশি নাবিকদের ভিসা দেয়া বন্ধ হয়ে যায়। ওই ঘটনার পর সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর মেসার্স কেএসএফ শিপিং সার্ভিসেসের লাইসেন্স স্থগিত করে। কিন্তু মানবপাচারের মতো অপরাধ করার পরও মাত্র ৪ মাসের ব্যবধানে (১৯-০৪-২০১১) অজ্ঞাত কারণে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ওই প্রতিষ্ঠানের ওপর বিদ্যমান স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়।

সূত্র জানায়, নানা ধরনের অপকর্মেও কারণে বিভিন্ন মেনিং এজেন্টের লাইসেন্স স্থগিত করা হলেও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অধিদপ্তরের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে ওসব স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। মেনিং এজেন্টরা মূলত তাদের নিজস্ব মেরিন একাডেমির ক্যাডেটদেরই জাহাজে নিয়োগ দেয়ার জন্য সরকারি মেরিন একাডেমির ক্যাডেটদের সাইন-অন করায়। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের আর জাহাজে চাকরি দেয়া হয় না।

সূত্র আরো জানায়, জাহাজে নাবিক নিয়োগের ক্ষেত্রে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর নিয়ম করে দিয়েছে একজন বেসরকারি মেরিন একাডেমির কিংবা ডাইরেক্ট এন্ট্রির একজন ক্যাডেটকে চাকরি দিতে হলে সরকারি মেরিন একাডেমির ২জন ক্যাডেটকে (২ঃ১ পদ্ধতিতে) নিয়োগ দিতে হবে। ওই নিয়মকে ফাঁকি দেয়ার জন্য মেনিং এজেন্টরা সরকারি মেরিন একাডেমির ক্যাডেটদের শুধুমাত্র সাইন-অন করিয়ে রাখে। কিন্তু তাদের জাহাজে নিয়োগের ব্যবস্থা করে না।

মেনিং এজেন্টগুলোর প্রতারণা ও মানবপাচার সম্পর্কে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা মানতে নারাজ। এ ব্যাপারে মেসার্স এভার চিয়ার মেরিন সার্ভিসেসের মালিক আব্বাস উদ্দিন জানান, যারা কাজ করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগও বেশি। গত কয়েক বছওে হাজারো নাবিককে এই প্রতিষ্ঠান জাহাজে নিয়োগ দিয়েছে। কাজেই এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকাই স্বাভাবিক।

অন্যদিকে জাহাজে নাবিক নিয়োগে নানামুখী প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও মানবপাচার সম্পর্কি অভিযোগ সরাসরি  অস্বীকার না করে বাংলাদেশ মেনিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জন্য দেশের সব মেনিং এজেন্টের দুর্নাম হচ্ছে। সরকার চাইলে ওসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে। অসাধু মেনিং এজেন্টরা মানব পাচার করায় বিভিন্ন দেশে এখন বাংলাদেশি নাবিকরা যেতে পারছেন না। ফলে বাংলাদেশি নাবিকদের চাকরির বাজার সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

মূলত সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার কারণেই ওসব অসাধু মেনিং এজেন্টগুলো বারবার অপরাধ, অনিয়ম, দুর্নীতি করেও পার পেয়ে যায়। ওসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে অনিয়ম অনেকটা দূর হবে।

এ ব্যাপারে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের একাধিক উচ্চপদস্থ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলেও তারা এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সোনালীনিউজ/আমা

Sonali Bazar

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue
বুধবার, ২৮ জুন, ২০১৭, ১৪ আষাঢ় ১৪২৪