বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

নির্বাচনী এলাকাতে জনবিচ্ছিন্ন চার এমপি!

সোনালী বিশেষ | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১০ আগস্ট ২০১৭, বৃহস্পতিবার ০২:১১ পিএম

নির্বাচনী এলাকাতে জনবিচ্ছিন্ন চার এমপি!

ঢাকা : মহাজোটের শরীক দলগুলো থেকে নির্বাচিত ঢাকার বিভিন্ন আসনের এমপিদের কাজ নিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দারা প্রশ্ন তুলেছেন। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর শরীক দলগুলোর এমপিদের এলাকাগুলোতে আর দেখা যায়নি। রাজধানীর ভেতরেই রয়েছে শরীক দলগুলো থেকে নির্বাচিত চারজন সংসদ সদস্য (এমপি)।

সর্বশেষ রাজধানীর জলবদ্ধতা নিয়ে সরকারের ভেতর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হলেও শরীক দলের এমপিরা বরাবরের মতই নিশ্চুপ থেকেছে। এ সমস্যা নিয়ে স্থানীয় জনগনের সঙ্গেও এই এমপিরা কথা বলেননি, খোঁজখবরও নেননি। জনসম্পৃক্ততা কম এসব এমপিদের বিরুদ্ধে এলাকার উন্নয়ন নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।

অন্যদিকে, বিগত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের শরীকদের দেয়া এসব আসন নিয়ে আওয়ামী লীগের ভেতর কোন আলোচনা নেই। একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কেউ এই আসনগুলোতে মনোনয়ন পাবে এমনটা নিশ্চিত নয়। যেকারণে এসব আসনের উন্নয়ন কাজে সরকারী দলীয় নেতারাও আগ্রহী নয়।

ফলে এসব আসনের জনগণ অনেকটা অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। মহাজোটের নেতৃত্বে থাকা দল আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা এসব আসনে দলের পক্ষ থেকে মুল্যায়ন করা এবং এসব আসনে প্রার্থী দেয়ার বিষয়টি বিবেচনার জন্য দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বকে অনুরোধ করেন।

পুরান ঢাকার প্রাচীন শিল্পনগরী শ্যামপুর-কদমতলী। চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, দূষণ আর জলাবদ্ধতায় জর্জরিত এক জনপদ। এককালে ডিএনডি বাঁধের অন্তর্ভুক্ত রাজধানীর দক্ষিণ-পূর্বাংশের নিুাঞ্চলীয় বিশাল এলাকা নিয়ে ছিল ঢাকা-৪ নির্বাচনী আসন। নবম জাতীয় নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে যাত্রাবাড়ী, ডেমরা নিয়ে ঢাকা-৫ আসন গঠিত হলে শ্যামপুর-কদমতলীর শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করে সীমিত হয়ে পড়ে ঢাকা-৪ আসনের পরিধি।

সীমানা পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে আকারে ছোট হলেও সমস্যার তীব্রতা কমেনি এলাকাবাসীর। বন্যানিয়ন্ত্রণে নির্মিত সে ডিএনডি বাঁধ এখন প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জলাবদ্ধতার। ডিএনডি থেকে দ্রুত পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় সামান্য বৃষ্টি হলেই তলিয়ে যায় নিচু এলাকার বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, শিল্প-কারখানা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পানিবন্দি হয়ে পড়ে লাখ লাখ মানুষ। জলাবদ্ধতার সঙ্গে যোগ হয়েছে সুপেয় পানির সঙ্কট।

শ্যামপুর-কদমতলীর বিভিন্ন এলাকায় লাইনে দাঁড়িয়ে পাম্পের পানি সংগ্রহ দৃশ্য নিত্যকার। এছাড়া বিদ্যুৎ সঙ্কট, মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির সমস্যা কমেনি। এই আসনের শ্যামপুর-কদমতলীর দুইটি শিল্প এলাকায় ডায়িং, গার্মেন্ট, আসবাব, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সিমেন্ট, রি-রোলিং মিলস, তামার কারখানা, ফ্যান ফ্যাক্টরিসহ রয়েছে ছোট-বড় প্রায় চারশ’ শিল্প কারখানা। 

পূর্ব কদমতলীর বাসিন্দা নজরুল ইসলাম মোল্লা বলেন, বৃষ্টি হলেই শ্যামপুর-কদমতলীর একাধিক সড়ক ডুবে যায়। খানাখন্দে ভরা এসব সড়ক পয়ঃনিষ্কাশন লাইনের ময়লা পানিতে ডুবে যাওয়ায় চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন কয়েক লাখ বাসিন্দা। এমনকি কোন কোন এলাকায় স্থায়ী জলবদ্ধতাও রয়েছে। এসব বিষয়ে স্থানীয় এমপির কোন উদ্যোগ নজরে পড়ে না।

কদমতলীর বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, রাসায়নিক ও তরল বর্জ্যরে মাধ্যমে শিল্পদূষণের কারণে আরেক হাজারীবাগে পরিণত হয়েছে শ্যামপুর। এখানে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইপিপি) স্থাপনের দাবি থাকলেও সেটা হয়নি।

পশ্চিম জুরাইন তুলাবাগিচার বাসিন্দা রইসুল ইসলাম বলেন, জলাবদ্ধতা এবং রাস্তাঘাটের সমস্যাই এলাকাবাসীর ভোগান্তির প্রধান কারণ। পশ্চিম জুরাইনের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জানে আলম খান বলেন, সন্ধ্যা নামলেই শ্যামপুর-কদমতলীর নানা পয়েন্টে জমে ওঠে মাদকসেবীদের আড্ডা। যাদের কারণে এলাকার কিশোর ও তরুণরা বখে যাচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে স্থানীয় সংসদ সদস্যের কোন তৎপরতা দেখা যায় না।

একইভাবে ঢাকা-৮ আসনের শরীক দলের সংসদ সদস্য ওয়ার্কাস পার্টির রাশেদ খান মেনন। মতিঝিল-রমনা-পল্টন থানা নিয়ে গঠিত ঢাকা-৮ আসন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৮, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৯, ২০ ও ২১ নম্বর ওয়ার্ড এ আসনের আওতাভুক্ত। সরজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই আসনের প্রধান সমস্যা মাদক। এছাড়া অলিগলির রাস্তার বেহাল দশা রয়েছে।

২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে বিনা প্রতিদ্ধন্ধিতায় সংসদ সদস্য হওয়া রাশেদ খান মেননের বিষয়ে রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের তেমন কোন আপত্তি নেই। তবে এই এলাকার স্থানীয় জনগণ এই আসনের সমস্যার প্রতি সংসদ সদস্যের আরও মনোযোগি হওয়া কথা বলেন।

তারা বলেন, এই এলাকায় থাকা নামী দামী বিদ্যালয় গুলোতে মেননের আধিপত্য রয়েছে। এই নির্বাচনী এলাকার সরকারদলীয় নেতারা জানান, এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের ভার তারা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের হাতেই ছেড়ে দিয়েছেন। আর দলীয় সূত্রে এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে, তাতে এই নির্বাচনী এলাকার আওয়ামী লীগের প্রার্থিতার বিষয়ে এখনো তেমনভাবে কেউ প্রচার প্রচারণায় নামেননি।

ঢাকা-৬ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম মেম্বার ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা কাজী ফিরোজ রশীদ। রাজধানীর সুত্রাপুর-কোতোয়ালী এলাকা নিয়ে এই আসন। এই আসনের মুল সমস্যা হল কোন সমস্যার জন্য স্থানীয় এমপিকে কাছে না পাওয়া। এমন অভিযোগ করে সুত্রাপুরের একাধিক বাসিন্দা জানান, আমাদের সমস্যায় এমপি কাছে পাওয়া যায় না। এলাকার উন্নয়নে স্থানীয় এমপির কোন কাজের তৎপরতা চোখে পড়ে না।

সুত্রাপুর-কোতোয়ালি এলাকার রাস্তাঘাটের সমস্যা ভয়াবহ। তারচেয়ে বেশি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে মাদক তথা ইয়াবা। এসব নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যাদের কাছে একাধিকবার অভিযোগ দিলেও এর কোন সুরাহা হয়নি। ইয়াবা এই এলাকায় এমনভাবে বিস্তার করছে; এর ফলে এলাকার সকল ধরনের সামাজিকতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া সরকার দলীয় বিভিন্ন সংগঠনের চাঁদাবাজির বিষয়ে তাকে অবহিত করা হনেলও কার্যত কোন ফল পাওয়া যায়নি।

মহাজোটের আরেক শরীকদল বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) থেকে এস এম আবুল কালাম আজাদ বিনাপ্রতিদ্ধিতায় নির্ববাচিত হয়েছেন। বিজয়ী হওয়ার পর এই আসনের এমপিকে জনগন তেমন একটা দেখেছে বলে কেউ বলতে পারলেন না।

সোনালীনিউজ/জেডআরসি/এমটিআই