বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৩ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩

পুলিশের পদোন্নতি রাজনৈতিক বিবেচনায়!

আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৩:৪৩ পিএম

পুলিশের পদোন্নতি রাজনৈতিক বিবেচনায়!

বিশেষ প্রতিনিধি

পুলিশের পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে পদোন্নতিযোগ্য পুলিশ সদস্যের পারিবারিক সদস্যদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাও বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে পদোন্নতির ক্ষেত্রে অনেক পুলিশ অফিসারের গ্রামের বাড়ি গিয়ে তাদের সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে। পুলিশের বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তাদের ও পরিবারের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ নিয়ে খোদ পুলিশ অফিসারদের মধ্যেই ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। পাশাপাশি অভিযোগ উঠেছে, নিয়ম ভেঙে তেলবাজ ও রাজনৈতিক দলের কর্মী বনে যাওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেয়ার জন্য নানা তদবির চলছে। একই সাথে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালীদের পছন্দের পুলিশ কর্মকর্তাকে পদোন্নতির সুবিধা তৈরি করতে মাঠপর্যায়ে পদোন্নতির যোগ্য পুলিশ কর্মকর্তাদের সরকারবিরোধী রাজনীতি করা পরিবারের সদস্য বানিয়ে পদোন্নতি বঞ্চিত করার আশঙ্কাও তীব্র হচ্ছে। এক্ষেত্রে পদোন্নতিযোগ্য পুলিশ কর্মকর্তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্থানীয় সরকার সমর্থিত নেতা ও জনপ্রতিনিধিরা ওসব পুলিশ সদস্যদের পরিবার সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করছে। পুলিশ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সম্প্রতি এএসপি থেকে এডিশনাল ডিআইজি পদে প্রায় ২ শতাধিক কর্মকর্তার পদোন্নতির বিষয়ে সভা হয়েছে। তাতে একটি খসড়া তালিকা তৈরি হয়। কিন্তু খোদ পুলিশ কর্মকর্তাদের আশঙ্কা- তালিকাভুক্তদের এএসপি থেকে এডিশনাল এসপি, এডিশনাল এসপি থেকে এসপি এবং এসপি থেকে এডিশনাল ডিআইজি ও এডিশনাল ডিআইজি থেকে ডিআইজি পদে পদোন্নতির তালিকায় থাকা যোগ্য ও কর্তব্যে নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদের বদলে দলীয় বিবেচনায় পদোন্নতি হতে পারে। এ নিয়ে পদোন্নতি প্রত্যাশীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে কাদের পদোন্নতি দেয়া হবে তা নিয়ে পুলিশের উচ্চপর্যায়ে দু’দফা বৈঠক হয়েছে। তবে ওসব বৈঠকে পদোন্নতির বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চূড়ান্ত কোনো পর্যায়ে পৌঁছতে পারেননি। কারণ এএসপি থেকে এডিশনাল এসপি পর্যায়ে প্রায় দেড় শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তা পদোন্নতির তালিকায় রয়েছেন। আর এডিশনাল এসপি থেকে এসপি পর্যায়ে রয়েছেন ৭০ জন পুলিশ কর্মকর্তা। তাছাড়া এসপি থেকে এডিশনাল ডিআইজি হওয়ার জন্য ২৯ জনের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে ওসব পদোন্নতি প্রত্যাশী কর্মকর্তারা পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করছেন। কিন্তু পদোন্নতির ক্ষেত্রে এখন ওসব অফিসারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে। সরকার বিরোধী বা বিএনপি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে ওসব পুলিশ কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরা জড়িত কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এসবিসহ বিভিন্ন সংস্থার গোয়েন্দাদের মাধ্যমে পদোন্নতি প্রত্যাশীদের ব্যাপাওে খোঁজ-খবর নিচ্ছে পুলিশ সদর দপ্তর।

সূত্র আরো জানায়, পুলিশ কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি কমিটি রয়েছে। ওই কমিটিতে পুলিশের আইজি, স্বরাষ্ট্র সচিব, অর্থ সচিবসহ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রয়েছেন। মূলত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মিটিংয়েই পদোন্নতি বিষয়ে বিশ্লেষণ হয়। আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও তারাই নিয়ে থাকেন। তবে পদোন্নতি যোগ্য পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রাথমিক তালিকা পুলিশ সদর দপ্তর থেকে করা হয়। ওই মিটিংয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা থাকেন। মিটিংয়ে পদোন্নতি যোগ্য পুলিশ কর্মকর্তাদের একটি তালিক তৈরি করা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসার পর পরই এক শ্রেণীর পুলিশ কর্মকর্তা ক্ষমতাসীন দলের কর্মী ও সমর্থক বনে নিজেদের জাহির করতে থাকেন। ওসব কর্মকর্তারা যখন যে দল ক্ষমতায় আসে তখন নিজেদের ওই দলের মনোভাবের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে নানা ধরনের সুবিধা আদায় করেন। সুবিধাবাদী ওসব পুলিশ কর্মকর্তা পদোন্নতি, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী পোস্টিংও নিয়ে থাকেন। ওসব পুলিশ কর্মকর্তাদের দাপটে মাঠপর্যায়ে নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করা পুলিশ কর্মকর্তারা সব ধরনের সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন।

এদিকে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এবারও পুলিশ সদর দপ্তর থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ে ওসব চিহ্নিত কর্মকর্তারাই পুলিশ বিভাগে সব ধরনের কাজে দাপট দেখিয়ে আসছে। গত ৫ বছরে ওসব কর্মকর্তারা বারবার পদোন্নতি পেয়েছে। মূলত পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তাই পদোন্নতি বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন। তারা যখন যেভাবে তাদের পছন্দের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বিষয়ে সুপারিশ করছেন তখন ওই কর্মকর্তার পদোন্নতি হচ্ছে। গুঞ্জন রয়েছে, কোনো কোনো কর্মকর্তা আবার অর্থের বিনিময়ে পদোন্নতি পাওয়ার চেষ্টা করছেন। অথচ পুলিশ সদর দপ্তরসহ মাঠপর্যায়ে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে যাদের পদোন্নতি হচ্ছে না। বরং নানা অজুহাতে ওসব পুলিশ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি না দিয়ে তাদের জুনিয়রদের পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে এরকম পদোন্নতি নিয়ে পুলিশ বিভাগে ক্ষোভেরও সৃষ্টি হয়েছে। এবারও প্রায় দুই শতাধিক বিভিন্ন পর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেয়ার প্রস্তুতি চলছে। এক্ষেত্রে সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাদের স্থলে রাজনৈতিক বিবেচনায় জুনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেয়ার তদবির শুরু হয়েছে। পাশাপাশি পদোন্নতি নিয়ে মোটা অঙ্কের টাকার লেনদেন হচ্ছে বলেও গুঞ্জন রয়েছে।

অন্যদিকে পদোন্নতি বঞ্চিত পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। তারা বলছেন, সঙ্গের অনেক পুলিশ কর্মকর্তাই স্বীয় পদ থেকে পদোন্নতি পেয়ে এএসপি থেকে এডিশনাল এসপি, এডিশনাল এসপি থেকে এসপি এবং এসপি থেকে এডিশনাল ডিআইজিও হয়ে গেছেন। কিন্তু অনেক যোগ্য কর্মকর্তাই এখনো পদোন্নতি পায়নি। কোন অপরাধে কেন পদোন্নতি হয়নি তাও তারা জানেন না। এখন পদোন্নতির তালিকায় নাম আসা পুলিশ কর্মকর্তাদের বাড়িতে খোঁজ নেয়া হচ্ছে তার পরিবারের কেউ রাজনীতির সাথে জড়িত কি না। বিশেষ করে বিএনপি করেন কি না। হয়তো দেখা যাবে তদন্ত করে একটি প্রতিবেদনে বলা হবে অফিসারের পরিবারের সদস্যরা সরকার বিরোধী দলের সঙ্গে জড়িত। আর এ কারণে তার প্রমোশনও হবে না।

 

সোনালীনিউজ/এমএইউ

add-sm
Sonali Tissue
বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৩ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩