শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩

এবার টাকা কাটা হবে বেতন থেকে, বেসরকারি খাতেও চালু হবে পেনশন

বদলে যাচ্ছে ‘পেনশন রেওয়াজ’

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৪:০৫ পিএম

বদলে যাচ্ছে ‘পেনশন রেওয়াজ’

সরকারি কর্মচারীরা চাকরিজীবন শেষে যে পেনশন পান, তাতে তাঁদের কোনো অংশগ্রহণ থাকে না। অর্থাৎ পেনশন খাতে মাসে মাসে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো টাকা জমা করতে হয় না। এর পুরোটাই দেয় সরকার।

তবে দীর্ঘদিনের এই রেওয়াজ এবার বদলানোর ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। আগামীতে পেনশনে সরকারি কর্মচারীদেরও অংশ নিতে হবে। বৃহস্পতিবার (২ জুন) বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পেনশন চালুর নতুন এ রেওয়াজের কথা বলেছেন।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘পেনশনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনার কথা ভাবছি। এতে ভবিষ্যতে যোগদানকারী সব সরকারি চাকরিজীবীর জন্য বিদ্যমান পদ্ধতি পরিবর্তন করে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পেনশন পদ্ধতি চালু করব।’

অর্থমন্ত্রীর এই বক্তৃতার প্রতিক্রিয়ায় সচিবালয়ের একজন কর্মচারী বলেন, ‘মানুষ সরকারি চাকরিতে যে কয়টি কারণে আকৃষ্ট হয় তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পেনশন। এখন সেই পেনশন না থাকলে সরকারি চাকরি আকর্ষণ হারাবে। আর অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ভবিষ্যতে যাঁরা যোগ দেবেন, তাঁদের জন্য এই ব্যবস্থা গড়ে তুলবেন। এটা অর্থমন্ত্রীর পক্ষে চালু করা হয়ত সম্ভব হবে, কিন্তু তাঁর এই পরিকল্পনায় যদি বর্তমান কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে সেটা সম্ভব হবে না। কারণ আমাদের পেনশন দেয়ার কথা বলেই চাকরিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এখন সেটা কর্তন করা সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে না।’

প্রস্তাবিত বাজেটে পেনশন খাতে আরো সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। দেশে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই পেনশন পান। আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার ক্ষেত্রেও সীমিত পর্যায়ে পেনশনের ব্যবস্থা আছে। তবে বেসরকারি খাতে নেই। এ খাতের কর্মীরা দীর্ঘ চাকরিজীবনের ইতি টানার পর অবসরকালীন কোনো আর্থিক সুবিধা পান না। অথচ দেশে সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীর সংখ্যা অনেক বেশি।

বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের জন্য পেনশন চালু করতে চায় সরকার। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় এই স্বপ্নের কথা জানিয়েছেন। ডিপোজিট পেনশন স্কিমের (ডিপিএস) আদলে এ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। তিনি বলেছেন, ‘সব স্তরের জনগোষ্ঠীর জন্য সরকার নিয়ন্ত্রিত একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা প্রণয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। ডিপিএস ব্যবস্থা যেভাবে বেসরকারি খাতে একটি পেনশনের সুযোগ করে দিয়েছে, এটাকে সর্বজনীন করার জন্য কী ব্যবস্থা নেয়া যায় সেটিই হবে নতুন পরিকল্পনার ভিত্তি। এ ব্যবস্থায় একদিকে যেমন প্রবীণদের আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে দেশের আর্থিক খাতের গভীরতা নিশ্চিতসহ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ চাহিদা পূরণে সহায়ক তহবিল সৃষ্টি করবে।’

বর্তমানে কর্মক্ষম মানুষের ৫ শতাংশ সরকারি চাকরিতে থেকে পেনশন এবং ৮ শতাংশ বেসরকারি চাকরিতে থেকে গ্র্যাচুইটি পান। অবশিষ্ট ৮৭ শতাংশ কর্মক্ষম মানুষের জন্য এর কোনোটিই নেই। বিষয়টি উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীসহ প্রবীণদের জন্য একটি সর্বজনীন ও টেকসই পেনশন পদ্ধতি প্রবর্তন এখন সময়ের দাবি।’

অর্থমন্ত্রী জানান, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাস ও গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণে জনমিতিক কাঠামো পরিবর্তিত হচ্ছে। এতে প্রবীণের সংখ্যা এবং মোট জনগোষ্ঠীতে এর অনুপাত ক্রমে বাড়ছে। অন্যদিকে নগরায়ণের কারণে একক পরিবারের সংখ্যাও বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে প্রবীণদের আর্থিক ও সামাজিকভাবে নিরাপত্তাহীন হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সরকারের একার পক্ষে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা দুরূহ। এই অবস্থায় অর্থমন্ত্রী পেনশনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনার কথা জানান।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০১৮ সাল থেকে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের জন্য পেনশনব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করছে সরকার। আগামী অর্থবছরের বাজেটে এটিকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে একটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে।

সরকার চাচ্ছে দীর্ঘ চাকরিজীবন শেষে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীরাও যাতে সরকারি খাতের চাকরিজীবীদের মতো পেনশন সুবিধাটি পান। এতে তাঁদের অবসরকালীন জীবন মোটামুটি সচ্ছলভাবে কাটবে। এ বিষয়ে সহায়তা দেবে বিশ্বব্যাংক। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মাল্টিন্যাশনাল কম্পানি, টেলিকম খাতসহ সংগঠিত বেসরকারি খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রথমদিকে পেনশনের আওতায় আসবেন। মূলত যেসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে দেয়া হয়, হিসাব-নিকাশে প্রযুক্তির ব্যবহার রয়েছে এসব খাতে পরীক্ষামূলকভাবে ২০১৮ সাল থেকে পেনশন চালুর চেষ্টা করা হবে। প্রয়োজনে এ খাতে সরকার কিছুটা ভর্তুকি দেবে। কোন প্রক্রিয়ায়, কত টাকা পেনশন দেয়া যায়, সে বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

সরকারি চাকরিজীবীরা অবসরকালীন ছুটিতে যাওয়ার পর গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, অর্জিত ছুটির টাকা ও অবসর ভাতা পান। গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও অর্জিত ছুটির টাকা অবসরের পরপরই পাওয়া যায়। অবসর ও চিকিৎসা ভাতা পেনশনহোল্ডার আজীবন পেয়ে থাকেন। পেনশনহোল্ডার মারা গেলে তাঁর স্ত্রী আজীবন এ সুবিধা পান। ১৫ বছর পেনশনভাতা পাওয়ার পর স্ত্রী মারা গেলে তাঁর সন্তানরা এ ভাতা আর পায় না।

বেসরকারি চাকরিজীবীরা কিছু ক্ষেত্রে গ্র্যাচুইটি, অর্জিত ছুটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের জমা টাকা এককালীন পেয়ে থাকেন। তবে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানেই এসব সুবিধা নেই। অবসর ভাতা তো একেবারেই দেওয়া হয় না। ফলে এই খাতের চাকরিজীবীরা দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে শূন্য হাতে অনিশ্চিত অবসরজীবন শুরু করেন। সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোয় আইন দ্বারা এসব সুবিধা দেওয়া হলেও বেসরকারি খাতে এসব আইন নেই। কিছু ক্ষেত্রে আইন থাকলেও তা বাস্তবায়নে কোনো পক্ষই তদারক করে না। এ ছাড়া মালিকপক্ষ নানা কায়দায় অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে সুবিধা থেকে চাকরিজীবীদের বঞ্চিত করে থাকে।

সোনালীনিউজ/ঢাকা/জেডআরসি

add-sm
Sonali Tissue
শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩