বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৩ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩

বরাদ্দ থাকলেও গবেষণাতে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের আগ্রহ

আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৩:৫৪ পিএম

বরাদ্দ থাকলেও গবেষণাতে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের আগ্রহ

বিশেষ প্রতিনিধি

সরকারের প্রায় সব মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ দপ্তরের জন্যই গবেষণা বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু বছর শেষে অধিকাংশ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সরকারি বরাদ্দ ফেরত যায়। তবে হাতেগোনা কিছু প্রতিষ্ঠান গবেষণা খাতে অর্থের ব্যবহার করছে। বেশিরভাগ মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের গবেষণা অর্থ ফেরত যাওয়ায় ওসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের যোগ্যতা, দক্ষতা ও মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে- সরকারি প্রতিষ্ঠানে গবেষণার গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ কোনো একটা দপ্তর খারাপ করলে কেন খারাপ করছে তা গবেষণায় বের হয়ে আসে। ভালো করলেও গবেষণা হয়। ওসব কারণেই প্রতিবছর গবেষণার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। কিন্তু ব্যবহার না হয়ে ওই বরাদ্দ ফেরত যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, জনপ্রশাসন হচ্ছে সরকারের সাধারণ বাজেট-ব্যয়ের বড় খাত। অথচ এই মন্ত্রণালয়টিই গবেষণায় তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। আর স্বাস্থ্য বাজেটের গবেষণা খাতে বরাদ্দ খুবই কম। অথচ ওই অপ্রতুল বরাদ্দের অর্ধেকও খরচ হয় না। তাছাড়া শিক্ষা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণার টাকা বছরের পর বছর অব্যয়িত থাকছে। শুধু গবেষণা যাদের কাজ সেসব প্রতিষ্ঠান খরচ করলেও বরাদ্দের পুরোটা কাজে লাগাতে পারে না। আবার এই জাতীয় কিছু প্রতিষ্ঠানের কোনো ব্যয়ই নেই। এজন্যই বিশ্বের  বিভিন্ন দেশের সরকারের সাথে এদেশের সরকারের পার্থক্য হচ্ছে গবেষণায়। বিদেশিরা কোনো বিধিমালা করার আগে পর্যাপ্ত গবেষণা করে। বিধিমালার প্রভাব কী হতে পারে তা নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা হয়। আর আইন করার আগে তো রীতিমতো মহা আয়োজন করে বসে। কিন্তু এদেশে বিধিমালা হয় গোপনে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিসিএস প্রশাসন একাডেমি এবং বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র জনপ্রশাসন নিয়ে গবেষণা করে। তবে বিসিএস প্রশাসন একাডেমির গবেষণা খাতে বরাদ্দ একেবারেই কম। ওই নগণ্য বরাদ্দও ঠিকমতো ব্যয় করতে পারে না প্রতিষ্ঠানটি। আবার বরাদ্দও মাঝে মধ্যেই বন্ধ করে দেয়া হয়। বিগত ২০০৯-১০ অর্থবছরে একাডেমির গবেষণা খাতে বরাদ্দ ছিল মাত্র দুই লাখ টাকা। তার পুরোটাই অব্যবহৃত থেকেছে। পরের দুই অর্থবছরেও একই অবস্থা। আর ২০১২-১৩ অর্থবছরে গবেষণা বরাদ্দ বন্ধ করে দেয়া হয়। পরের বছর বরাদ্দ অর্ধেক কমিয়ে এক লাখ টাকা করা হয়। কিন্তু ওই বছরও গবেষণা খাতে এক টাকাও ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। গত অর্থবছরে অর্থাৎ ২০১৪-১৫ সালে বরাদ্দ আবার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তবে বিগত কয়েকটি অর্থবছরে গবেষণায় বরাদ্দ ব্যয় না হলেও ২০০৯-১০ সালে গবেষণা খাতে প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। ২০১০-১১ অর্থবছরেও প্রায় ২৩ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। আর বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) গবেষণার হালও একই রকম। ২০১১-১২ অর্থবছরে গবেষণা খাতে প্রতিষ্ঠানটিরও কোনো ব্যয় নেই। ২০১২-১৩ অর্থবছরেও ব্যয়ের ঘর ফাঁকা ছিল। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে চার লাখ ৯৬ হাজার টাকা। পরের বছরে গবেষণায় ব্যয় আবার শূন্য। আর চলতি অর্থবছরে গবেষণা খাতে আট লাখ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

সূত্র জানায়, বিগত ৭ বছরে স্বাস্থ্য গবেষণা খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে খুবই কম। আবার ব্যয় হয়েছে সেই অপ্রতুল গবেষণা অর্থের অর্ধেকেরও কম। ওই সময়ে স্বাস্থ্য খাতের গবেষণায় মোট বরাদ্দ ছিল ১০৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। কিন্তু ব্যয় হয়েছে ৪৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। ওই খাতে সবচেয়ে বেশি গবেষণা ব্যয় হয় জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (নিপোর্ট)। ৭ বছরে প্রতিষ্ঠানটির জন্য বরাদ্দ ছিল ৪৮ কোটি টাকা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি খরচ করতে পেরেছে ২৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের গবেষণার বাজেট ছিল ২৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা কিন্তু ব্যয় হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ডিজিএইচএস ও বিএমআরসির জন্য বরাদ্দ ছিল ১৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা আর ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৪ কোটি টাকা। এনসিডিসির গবেষণায় বরাদ্দ ছিল ৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা কিন্তু ব্যয় হয়েছে ২ কোটি টাকা। আইপিএইচএনের গবেষণায় বরাদ্দ ছিল ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা আর ব্যয় হয়েছে ২ কোটি টাকার কিছু বেশি।

সূত্র আরো জানায়, শিক্ষা গবেষণার জন্য পুরনো শিক্ষা বোর্ডগুলো প্রতিবছরই বরাদ্দ পায়। কিন্তু তারা ওই টাকা খরচ করতে পারে না। ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড গবেষণা বাবদ তাদের জন্য বরাদ্দ করা টাকা দুই অর্থবছর ধরে ফেরত দিচ্ছে। এবারো ঢাকা বোর্ডের নামে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। কিন্তু গত অক্টোবর পর্যন্ত ওই টাকায় হাত দিতে পারেনি ঢাকা বোর্ড। আর রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের জন্য গত ৫ বছর শিক্ষা গবেষণায় কোনো বরাদ্দই ছিল না। তবে এ বছর ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হলেও গত অক্টোবর পর্যন্ত ওই বাবদ কোনো টাকা খরচ করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টও গত ৫ বছর গবেষণা খাতের কোনো টাকা খরচ করতে পারেনি। এবারো তাদের নামে এক লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছে, তবে তারা এখন পর্যন্ত এক টাকাও খরচ করা যায়নি। একইভাবে বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) চলতি বছর শিক্ষা গবেষণার জন্য ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। কিন্তু গত অক্টোবর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি একটি টাকাও ব্যয় করতে পারেনি। তবে গতবারের বরাদ্দের পুরোটাই খরচ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যানবেইসের একজন কর্মকর্তা। তাছাড়া জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) গত ৪ বছরে গবেষণার জন্য বরাদ্দ পেয়েছে ১১০ কোটি টাকা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১০০ কোটি টাকা খরচ করতে পেরেছে। আর চলতি বছর ২২ লাখ টাকা বরাদ্দ পেলেও গত অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র দেড় লাখ টাকা খরচ করা সম্ভব হয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশ ইউনেসকো জাতীয় কমিশন ৩ বছর ধরে শিক্ষা গবেষণার টাকা পেলেও খরচ করতে পারছে না। গবেষণার টাকা খরচ করতে পারেনি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটও। দু’বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি বরাদ্দ ফেরত দিচ্ছে। চলতি বছরও ওই প্রতিষ্ঠানকে ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। গত অক্টোবর পর্যন্ত ওই টাকায় হাত দেয়া যায়নি। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের জন্য গত অর্থবছরে গবেষণা খাতে বরাদ্দ ছিল ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা আর খরচ হয়েছে মাত্র ৫১ লাখ টাকা। ২০০৯-১০ থেকে ২০১৪-১৫ সাল পর্যন্ত একই অবস্থা ছিল ওই বোর্ডের গবেষণা খাতে। আর জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের গবেষণা খাতে গত পাঁচ বছরে বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা কিন্তু ব্যয় হয়েছে ৯৮ লাখ টাকা। তাছাড়া গবেষণার টাকা ব্যয় করতে পারে না শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তর-অধিদপ্তরগুলোও। তবে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের গবেষণা খাতে কোনো বরাদ্দ নেই। একইভাবে শিক্ষা-গবেষণাবিষয়ক খাত নেই মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড, সিলেট শিক্ষা বোর্ড, দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড, বরিশাল শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের মতে, মন্ত্রণালয় অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণার টাকা খরচ করতে না পারলেও মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের টাকা ঠিকই খরচ হয়েছে। গত পাঁচ বছরে শিক্ষা গবেষণা খাতে জন্য বরাদ্দ ছিল ৩৬ কোটি টাকা। তার মধ্যে ২৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। তবে দপ্তরগুলো গবেষণা করতে পারলে ভালো হয়। কারণ তাতে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করে বলে সমস্যাগুলো সম্পর্কে অবগত হওয়া সহজ। ফলে দপ্তরগুলো গবেষণা করলে যথাযথ সমাধান মেলে।

এদিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের একাধিক সংস্থা কৃষি বিষয়ে গবেষণা করে এবং ব্যয়ের হারও অনেক বেশি। তারপরও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট রাজস্ব বিষয়ক গবেষণার জন্য বরাদ্দের অর্ধেকও খরচ করতে পারে না। গত ৬ বছরে সংস্থাটির জন্য এ বিষয়ে বরাদ্দ ছিল ৮৩২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। অথচ খরচ করেছে চার ভাগের এক ভাগ। উন্নয়ন ও কর্মসূচি সংক্রান্ত গবেষণা-বাজেটের প্রায় পুরোটাই ব্যয় করেছে তারা। তাছাড়া গবেষণা খাতের জন্য বরাদ্দ করা টাকা খরচ করতে পারেনি পরমাণু গবেষণা ইনস্টিটিউটও। আর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের গবেষণা খাতে গত অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল এক কোটি ৪০ লাখ টাকা। তারমধ্যে এক কোটি ৩৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) জন্য কোনো গবেষণা বরাদ্দ নেই। সংস্থাটি কৃষিবিষয়ক গবেষণাও করে না। চলতি বছরও কোনো বরাদ্দ দেয়া হয়নি। তাছাড়া গবেষণা-বাজেট নেই বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমিরও।

অন্যদিকে বাংলাদেশ সুপারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউিট, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, তুলা উন্নয়ন বোর্ড গবেষণা বরাদ্দের প্রায় পুরোটাই খরচ করে।

গবেষণায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের আগ্রহী না হওয়া প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে গবেষণার গুরুত্ব অপরিসীম। কোনো একটা দপ্তর খারাপ করলে কেন খারাপ করছে তা গবেষণায় বের হয়ে আসে। ভালো করলেও গবেষণা হয়। এসব কারণেই প্রতিবছর গবেষণার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। কিন্তু এসব বরাদ্দ ফেরত যাচ্ছে। গবেষণার অর্থ ব্যয় না হওয়ারও বেশ কিছু কারণ আছে। তবে বড় কারণ হচ্ছে অদক্ষতা। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান দক্ষতার সাথে গবেষণা চালাতে পারেন না। আরো একটি কারণে গবেষণার টাকা ফেরত যায়- অনেক গবেষণার কাজে দুর্নীতির কোনো সুযোগ থাকে না। ফলে বরাদ্দ খরচ করার আগ্রহ থাকে না।

সোনালীনিউজ/এমএইউ

add-sm
Sonali Tissue
বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৩ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩