সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩

বাড়ছে রাজপথে লাশের সারি

আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৩:৫৬ পিএম

বাড়ছে রাজপথে লাশের সারি

বিশেষ প্রতিনিধি

দিনে দিনে রাজধানী ঢাকার রাস্তায় বাড়ছে অজ্ঞাত লাশের সংখ্যা। প্রতিদিনই পুলিশ ঢাকার বিভিন্নস্থান থেকে পরিচয়হীন মানুষের মৃতদেহ (বেওয়ারিশ লাশ) উদ্ধার করছে। বেশিরভাগ সময়েই লাশগুলো থাকে গলিত বা অর্ধগলিত। নির্দিষ্ট সময় পর এসব বেওয়ারিশ লাশ দাফন করছে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম। প্রতি বছর প্রায় দেড় হাজার বেওয়ারিশ লাশ দাফন করে আঞ্জুমান। তবে বেওয়ারিশ লাশের পূর্ণাঙ্গ কোনও পরিসংখ্যান দিতে পারেনি পুলিশ সদর দপ্তর।

বিভিন্ন হাসপাতাল, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অজ্ঞাত বেশিরভাগ পুরুষ ও নারী দুর্বৃত্তদের হাতে অপহরণের পর খুন হয়েছেন। সর্বশেষ শনিবার অজ্ঞাত লাশের তালিকায় যুক্ত হয়েছেন এক গারো নারী। গুলশানের রাস্তায় এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে তাকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। তারও নাম-পরিচয় এখনও পাওয়া যায়নি। সড়ক দুর্ঘটনাসহ নানা অপঘাতেও মৃত্যু হয়েছে অনেকের।পুলিশ এসব লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। ময়না তদন্তের কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মর্গের হিমাগারে রেখে দেয়। কোনও স্বজন যদি ওই সময়ের মধ্যে মর্গে গিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে লাশ শনাক্ত করতে পারেন, তখন পুলিশের সহযোগিতায় সেসব লাশ স্বজনদের হাতে তুলে দেয়া হয়। শনাক্ত না হলে নির্দিষ্ট সময় পর সেসব লাশ আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের হাতে তুলে দেয়া হয়। তারা সেগুলো নিয়ে আজিমপুরসহ বিভিন্ন সরকারি কবরস্থানে দাফন করে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজসহ কয়েকটি মর্গের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন অপেক্ষার পরও যখন স্বজনদের কোনও খোঁজ পাওয়া যায় না, তখন এসব লাশ আঞ্জুমানকে দিয়ে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। লাশ নিয়ে যদি আদালতের কোনও নির্দেশনা থাকে, কেবল সেসব লাশই সমাধান না হওয়া পর্যন্ত মর্গের হিমাগারে রেখে দেয়া হয়। দুই ধর্মের দুই স্ত্রীর দাবির মুখে সৎকার জটিলতায় এর আগে ২০০৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় চার বছর মর্গের হিমাগারে রেখে দেয়া হয়েছিল খিলগাঁও আইডিয়াল সিটি কলেজের উপধ্যক্ষ চন্দন চক্রবর্তীর লাশ। পরে আদালতের রায় অনুযায়ী চন্দন চক্রবর্তীর লাশ গবেষণায় ব্যবহারের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এমন ঘটনা ব্যতিক্রম বলেই জানায় ঢামেক মর্গ কর্তৃপক্ষ। গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ঢামেকের মর্গ কর্তৃপক্ষ নাম-পরিচয়হীন লাশ পেয়েছে ৪৭টি। শিগগিরই এসব লাশ আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানান তারা। অনেক ক্ষেত্রে রহস্যজনক কারণে পুলিশ ইচ্ছাকৃতভাবে লাশ পঁচে বিকৃত হওয়ার অপেক্ষায় থাকে বলেও অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ।

আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম সূত্র জানায়, আঞ্জুমানের তত্ত্বাবধানে বিগত ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯৩৩ জন বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়েছে। আরও ৪০৪ জনের লাশ দাফন করা হয় ঢাকার বাইরে। বিগত পাঁচ মাসে আরও অন্তত পাঁচ শতাধিক লাশ দাফন করা হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এর আগে ২০১৪ সালে এক হাজার ৪০৫ লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে আজিমপুর ও জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়।

অজ্ঞাত নারী-পুরুষের এসব লাশের নাম-পরিচয় আঞ্জুমানের কাছে নেই। বিভিন্ন হাসপাতাল মর্গ ও থানা পুলিশের কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানটি এসব লাশ গ্রহণ করে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী কেবল দাফন করে। পঁচা ও গলিত লাশগুলো গ্রহণের সময় সংশ্লিষ্টরা আঞ্জুমানের হাতে কেবল পুলিশের সুরতহাল রিপোর্টটি তুলে দেন।

আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের উপ-পরিচালক (সার্ভিস) আবদুল হালিম সাংবাদিকদের জানান, আঞ্জুমানের পক্ষ থেকে কোনও বেওয়ারিশ লাশের নমুনা ও ছবি সংরক্ষণ করা হয় না। পুলিশ ও মর্গ কর্তৃপক্ষ বেওয়ারিশ ঘোষণা করে তাদের কাছে হস্তান্তর করলে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তারা লাশ দাফন করে। পুলিশের কাছেই বেওয়ারিশ লাশের ছবি ও পোশাক সংরক্ষণ করে থাকে। বেওয়ারিশ লাশগুলো যখন তারা হাতে পান, তখন লাশগুলো থাকে বিকৃত, পঁচা ও গলিত। চেনার কোনও অবস্থা থাকে না।

দেশে প্রতি বছর কী পরিমাণ বেওয়ারিশ লাশ দাফন হচ্ছে, এর কোনও পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া যায়নি। দেশের বিভিন্নস্থানে নিখোঁজ হয়েছেন ও লাশ উদ্ধারের পর পরিচয় জানা যায়নি—এমন দু’শো জনের ছবি ও নামের একটি তালিকা পাওয়া গেছে পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র থেকে। যেগুলোর বেশিরভাগই ২০১৩ ও ২০১৪ সালের। বেওয়ারিশ লাশের একটি হিসাব পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) থাকলেও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও সেটি পাওয়া যায়নি।

এসব বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা এ কে এম কামরুল আহছান সাংবাদিকদের বলেন, উদ্ধার হওয়া যেসব লাশের পরিচয় পাওয়া যায়নি, তাদের ছবিসহ সুরতহাল প্রতিবেদন দেশের প্রত্যেকটি থানা ও জেলায় রয়েছে। বিভিন্ন সময় তারা পরিচয় জানার জন্য ছবিসহ গণমাধ্যমে সরবরাহ করে থাকেন। এর বাইরে কোনও তথ্য জানতে চাইলে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করে নিতে হবে বলে জানান তিনি।

দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ করা মানবাধিকার সংগঠন অধিকার-এর মার্চ মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর অনেকেরই কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। কখনও তাদের কারও লাশ পাওয়া যাচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রথমে ধরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করলেও পরবর্তী সময়ে আটক ব্যক্তিকে জনসম্মুখে হাজির করছে। এ বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে ছয়জন গুম হয়েছেন। তাদের একজনের লাশ পাওয়া গেছে। একজনের কোনও খোঁজ নেই। চারজনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আদালতে হাজির করেছে। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এসব কৌশলের সুযোগ নিচ্ছেন সন্ত্রাসী ও দুর্বৃত্তরাও।

সোনালীনিউজ/এমএইউ

add-sm
Sonali Tissue
সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩