শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩

বিদেশিরা কর ফাঁকি দিয়ে পাচার করছে বিপুল অংকের টাকা

আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৩:৫৮ পিএম

বিদেশিরা কর ফাঁকি দিয়ে পাচার করছে বিপুল অংকের টাকা

সোনালীনিউজ রিপোর্ট

এদেশে কর্মরত বিদেশিরা প্রতি বছরই হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে। বিদেশিরা এদেশ থেকে বছরে যে পরিমাণ টাকা নিয়ে যায় তা বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্স আয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। টাকার হিসাবে যা প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। আর বছর বছরই আশঙ্কাজনক হারে এর পরিমাণ বেড়েই চলেছে। এ নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বেশ চিন্তিত। অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সরকারি কোনো সংস্থার কাছেই এদেশে কর্মরত বিদেশিদের কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে বর্তমানে ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে এদেশে বৈধভাবে যতো বিদেশি কাজ করছে, অবৈধের সংখ্যা তার কয়েক গুণ বেশি। ওই সংখ্যা প্রায় এক লাখ। আর যেসব বিদেশিরা এদেশে অবৈধভাবে কাজ করছে তাদের উপার্জিত আয় নিজ দেশে বেআইনি পথে পাঠাচ্ছে।

অর্থাৎ এদেশে কর্মরত বিদেশিরা টাকা পাচার করছে। আইনত যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর ফলে সরকারও বঞ্চিত হচ্ছে মোটা অংকের রাজস্বই আয় থেকে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত এদেশে অবৈধ বিদেশির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে টাকা পাচার প্রতিরোধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। সেই প্রেক্ষিতে খুব শিগগিরই কর ফাঁকিবাজ বিদেশিদের বিরুদ্ধে অভিযানে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনবিআর। 

পাশাপাশি এদেশে অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের যারা নিয়োগ দিচ্ছে সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সে জন্য টাস্কফোর্স এবং ডাটা ব্যাংক গঠন করতে যাচ্ছে এনবিআর। কারণ বাংলাদেশে প্রকৌশল, চিকিৎসা, গার্মেন্ট, মার্চেন্ডাইজিং, শিল্প-কলকারখানা ইত্যাদি খাতে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনে বিদেশি পরামর্শকসহ দক্ষ কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন বিদেশিরা কাজ করছে। এ সুযোগে অবৈধভাবে অনেক বিদেশি কর্মীই এদেশে কাজ করে কোনো কর পরিশোধ ছাড়াই তাদের টাকা অবৈধভাবে নিজ দেশে পাঠাচ্ছে।

সূত্র জানায়, এদেশে বিদেশিদের জন্য সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত ওয়ার্ক পারমিট দেয়া হয়। কিন্তু ভ্রমণ এবং ব্যবসার ভিসা নিয়ে স্বল্পসময়ের জন্য অনেক বিদেশিই এদেশে আসছে। আর তাদের বড় একটি অংশই কাজ ভিসা শেষে ফিরছে না। এদেশেই থেকে যাচ্ছে। ওই বিদেশিরাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অবৈধভাবে কাজ করছে। কিন্তু তাদের আয় করের আওতায় আসছে না। বর্তমানে মাসে গড়ে ২শ’ থেকে আড়াইশ’ ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু করা হয়। তার মধ্যে নতুন ১শ’ থেকে ১৫০।

অবশিষ্টগুলো নবায়ন করা হয়। সেক্ষেত্রে বৈধ বিদেশি কর্মীরা মাসে যে আয় করে তার সর্বোচ্চ ৭০ ভাগ পর্যন্ত বিনা অনুমতিতে নিজ দেশে পাঠাতে পারে। বাকি টাকা মেয়াদ শেষে দেশ ত্যাগ করার সময় একসাথে নিতে পারে। বর্তমানে বিনিয়োগ বোর্ড, বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং এনজিও ব্যুরো বিদেশিদের এদেশে কাজের অনুমতি দেয়।

তাছাড়া নিরাপত্তা ইস্যুতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাধ্যতামূলক অনুমতি লাগে। বিনিয়োগ বোর্ড এখন পর্যন্ত ২৫ হাজার বিদেশিকে ওয়ার্ক পারমিট দিয়েছে। তবে বেপজা এবং এনজিও ব্যুরোর কাছে এ ধরনের কোনো তথ্যই নেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে- এদেশে কে আসছে আর কে বের হচ্ছে তার তদারকির দায়িত্ব পুলিশের ইমিগ্রেশন বিভাগের। আর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র মতে, এদেশে অবৈধভাবে কাজ করছে এমন বিদেশির সংখ্যা এক লাখেরও বেশি। কিন্তু তাদের প্রতি সরকারের কোনো তদারকি নেই।

সূত্র আরো জানায়, চাহিদার তুলনায় ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা দেশে খুবই কম। বিশেষ করে প্রকৌশল বিষয়ে অভিজ্ঞ কর্মকর্তার অভাব রয়েছে। যারা ভালো কাজ জানেন তারাই উচ্চ বেতনে চাকরি নিয়ে বিদেশ চলে যান। ফলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই দেশীয় উদ্যোক্তারা বেশি বেতন দিয়ে বিদেশিদের আনেন। বর্তমানে চার হাজার পোশাক শিল্পের মধ্যে এক হাজার ফ্যাক্টরিতেই বিদেশিরা কর্মরত আছে।

ওসব ফ্যাক্টরিতে কতোজন বিদেশি নিয়োজিত আছে তার কোনো সঠিক সংখ্যা নেই। তবে ধারণা করা হয় প্রতিটি বড় ও মাঝারি কারখানায় গড়ে ৫ থেকে ১০ জন পর্যন্ত বিদেশি কাজ করছে। সাধারণত বিদেশিদের ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়া হয়। তাদের বেতন গড়ে দেড় হাজার ডলার থেকে ৩ হাজার ডলার। আর টেক্সটাইল শিল্পে বেতন মাসিক চার হাজার ডলার পর্যন্ত দেয়া হয়। বর্তমানে এদেশের টেক্সটাইল শিল্পে কম-বেশি সব প্রতিষ্ঠানেই বিদেশি বিশেষজ্ঞরা চাকরি করছে। দেশে বর্তমানে এক হাজার টেক্সটাইল শিল্প আছে। তাছাড়া বায়িং হাউসগুলোতে যেসব বিদেশিরা কাজ করে তাদের বেশিরভাগই অবৈধ। বর্তমানে দেশে পাঁচ শতাধিক বায়িং হাউস আছে।

এদিকে এদেশে অবৈধ বিদেশিদের প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোজাম্মেল হক জানান, অনেক বিদেশিই এদেশে অবৈধভাবে কাজ করছে। যা আইনত অপরাধ। এ বিষয়ে ব্যাপক জরিপ হওয়া দরকার। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা তাদের নিয়ে আসছে। কেউ চাকরির কথা বলে আসছে, কেউ আসছে ব্যবসা ও ভ্রমণের নামে। ভিসার মেয়াদ শেষে তাদের অনেকেই দেশে ফিরে যাচ্ছে না। তাদের খুঁজে বের করা কঠিন। তবে কিছু ঘটনায় তাদের ধরা হচ্ছে এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে একই প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন জানান, বিদেশিদের বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের অনুমতির বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কড়াকড়ি আরোপ করতে পারে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের মালিকরা বিদেশি কর্মকর্তাদের পরিবর্তে দেশের মধ্য থেকে দক্ষ জনবল নিয়োগে অগ্রাধিকার দিতে পারেন।

এ বিষয়ে এনবিআরের চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান বলেন, বিদেশি কর্মীদের কাছ থেকে যথাযথ আয়কর সংগ্রহ এবং তারা যাতে ভবিষ্যতে বৈধভাবে কাজ করতে পারে সেই লক্ষ্যে এনবিআর নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এগুচ্ছে। ওই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে দেশে অবৈধভাবে কোনো বিদেশি নাগরিকের কাজ করার সুযোগ থাকবে না। পাশাপাশি যারা বৈধভাবে কাজ করছে তারাও প্রচলিত আয়কর আইন অনুযায়ী কর পরিশোধ করে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করার সুযোগ পাবে।

সোনালীনিউজ/আমা

add-sm
Sonali Tissue
শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩