শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩

বিনিয়োগকারী সৃষ্টিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগ

আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৩:৪৩ পিএম

বিনিয়োগকারী সৃষ্টিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগ

বিশেষ প্রতিনিধি

নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উত্তরণ চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। পাশাপাশি মুদ্রানীতির মাধ্যমে সুদের হার কমানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা অর্থনীতির জন্য সুফল বেয়ে আনবে বলে মনে করছেন তারা। তবে মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতির প্রক্ষেপণ ৫ শতাংশের ঘরে রাখা গেলে সাধারণ মানুষের উপকার হওয়ার পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের মধ্যেও আশার সঞ্চার হতো এমন ধারণাও তাদের। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ব্যাংক খাতে সুশাসনের ব্যাপারে পর্যবেক্ষক নিয়োগের বিষয় উঠে আসলেও ‘ব্যাংক কমিশন’ গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলাও দরকার ছিল।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি এবং কৃষি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৃহস্পতিবার চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গর্ভনর ড. আতিউর রহমান এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন।

মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, যারা বেশি ধনী শুধু তাদের সুযোগ করে দিলেই চলবে না, সুবিধাবঞ্চিতদের জন্যও বাড়তি বিনিয়োগের সুযোগ করে দিতে হবে। এটি আর্থিক খাতের গভীরতা আরও বাড়াবে এবং একইসঙ্গে তা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।

ড. আতিউর রহমানের ভাষায়, ‘উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং রপ্তানি পণ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে রপ্তানি খাতের আরও উন্নয়ন ঘটাতে হবে। পাশাপাশি আরেকটি ‘গ্রোথ ইঞ্জিন’ যুক্ত করতে হবে। আর সেটি হচ্ছে আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা। তবে আশার কথা, আমাদের তরুণ কর্মক্ষম জনশক্তির সুবিধা, দ্রুত বিকাশমান মধ্যবিত্তের চাহিদা, প্রযুক্তি গ্রহণে তাদের সদা প্রস্তুতি, বাড়ন্ত বাজার পরিধি এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদার ইঞ্জিনটিকে দ্রুতগতিতে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাই সামনের দিনগুলোতে এই দুই ইঞ্জিনের মধ্যে অভ্যন্তরীণ চাহিদার ইঞ্জিনটিকে আরও শক্তিশালী করাকেই বেশি প্রাধান্য দিতে হবে। সেজন্য আমাদের জাতীয় সঞ্চয়ের হার আরও বাড়াতে হবে এবং সেই সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল খাতে বেশি করে বিনিয়োগ করতে হবে।’

এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সাংবাদিকদের বলেন, ‘মুদ্রানীতিতে নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে, এটা খুবই ভালো দিক। এতে নতুন ঋণগ্রহীতা খোঁজার চেষ্টা করা হবে। বিশেষ করে এসএমই ও কৃষিখাতকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে ক্ষেত্র বিশেষে উদ্যোক্তা অনুসন্ধানের জন্যও বলা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এতদিন বড় ঋণগ্রহীতারা মূলত ঋণ নিয়ন্ত্রণ করতো। এটা ব্যাংক খাতের জন্য বিপজ্জনক। নতুন মুদ্রানীতির ফলে এই ধরনের বিপদ থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে। আর সেটা করা গেলে বিপুল পরিমাণ সম্ভাবনাময় নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।’

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগ খুব বেশি কাজে দেবে না বলে মনে করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক বহুদিন ধরেই বলে আসছে নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়ার কথা, এসএমই খাতে ঋণ দেয়ার কথা, কৃষি খাতে ঋণের কথা। কিন্তু বাস্তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ধরনের উদ্যোগ কাজে আসছে না। তবে কৃষি খাত কিছুটা ভালো করেছে।’  তিনি বলেন, ‘অনভিজ্ঞ ও নতুন উদ্যোক্তাদের নানা কারণে  ব্যাংক ঋণ দিতে চায় না। কারণ যদি এই ঋণ ফেরত না পায়। এছাড়া বর্তমানে খেলাপি ঋণের চাপেও রয়েছে ব্যাংকগুলো। এই অবস্থায় কোনও ব্যাংকই নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তাদের ঋণ দিয়ে ঝুঁকি নিতে চাইবে না।’

নতুন মুদ্রানীতিতে সুদহার দশমিক ৫০ শতাংশ কমিয়ে রেপোতে ছয় দশমিক ৭৫ এবং রিভার্স রেপোতে চার দশমিক ৭৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে ব্যাংক ঋণে সুদ হার কমে আসবে। আর সুদ হার কমে আসলে ঋণ নেয়ার জন্য উদ্যোক্তাদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষ পালের মতে, বিনিয়োগ চাঙ্গা করতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদ কমানো হয়েছে। ড. বিরূপাক্ষ পালের মতো ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলামও একই মত দেন। তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদ হার কমানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে, ব্যাংক ঋণে সুদের হার কমানো এবং বিনিয়োগ বাড়ানো। এর ফলে সুদের হার কমবে এবং বিনিয়োগকারীরা বেশি ঋণ নেবে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা আগের চেয়ে কমানোর ফলে এই চাহিদা এমনিতে বাড়বে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু বর্তমানে ঋণ নেয়ার জন্য চাহিদা কম বা চাহিদার ঘাটতি রয়েছে, আবার ব্যাংকগুলোতেও প্রচুর অর্থ পড়ে রয়েছে, সেক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া শুধুই ধারাবাহিকতা মাত্র। এটা ১৪ শতাংশ, নাকি ১৫ শতাংশ তাতে কিছু যায়-আসে না।’

মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের মতে নতুন মুদ্রানীতি সাংঘর্ষিক। একদিকে নীতি সুদ হার কমানো হয়েছে, সে হিসেবে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি আগের তুলনায় বাড়ার কথা, কিন্তু এই মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে আগের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সামান্য হলেও প্রবৃদ্ধি কমানো হয়েছে।

নতুন মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ১ শতাংশ। এছাড়া নতুন এ নীতিতে আগামী জুন নাগাদ বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। আগের বছর যদি ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেসরকারি খাতে ১০০ টাকা ঋণ গিয়ে থাকে, তাহলে চলতি বছর সেটি বাড়িয়ে ১১৪ টাকা ৮০ পয়সা করতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মুনসুর সংবাদকর্মীদের বলেন, ‘নতুন এই মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতির প্রক্ষেপণ আরও নিয়ন্ত্রণমূলক করা গেলে অর্থনীতির জন্য আরও ভালো হতো। কারণ মূল্যস্ফীতির হার যদি সাড়ে ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার প্রক্ষেপণ করতো তাহলে ব্যাংক ঋণে সুদের হার আরও কমে যেত। এর ফলে উদ্যেক্তাদের মধ্যে বিনিয়োগের আগ্রহ সৃষ্টি হতো।’

বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধির প্রসঙ্গে ড. আহসান এইচ মুনসুর বলেন,‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক  বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তা ঠিকই আছে। কারণ, বাজারে প্রচুর অর্থ থাকার পরও উদ্যোক্তারা ঋণ নিচ্ছেন না। এতে জোর করে তো আর উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়া যাবে না।  তবে উদ্যোক্তারা যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ঋণ নেন, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক হয়তো কোনও বাধা দিবে না। কারণ, দেশে এখন প্রচুর বিনিয়োগ দরকার। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, উদ্যোক্তাদের মধ্যে এখনও আস্থা ফেরেনি, এ অবস্থায় ১৪ দশমিক ৮ শতাংশও পূরণ হবে কি না সন্দেহ।

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম নতুন মুদ্রানীতি বিশ্লেষণ করে বলেন, ‘মুদ্রানীতিতে ব্যাংকের সুশাসনের ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষক নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সুশাসনের ব্যাপারে ব্যাংক কমিশন করার বিষয়ে প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে পারতো। তিনি বলেন, মুদ্রানীতিতে মুল্যস্ফীতির প্রক্ষেপণ ৫ শতাংশের ঘরে নিয়ে আসতে পারতো। তাতে সুদের হার আরও কমানো যেতো। এছাড়া পলিসি রেট কমানোর পাশাপাশি ঋণ ও আমানতে সুদের স্প্রেড হার কমানোর নির্দেশনা থাকলেও অর্থনীতিতে আরও বেশি উপকার পাওয়া যেত।’

মুদ্রানীতিতে অভ্যন্তরীণ এবং বহির্বিশ্ব উভয় খাতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে ৬ দশমিক ৮ থেকে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রক্ষেপণ করছে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে অর্থবছর শেষে এই প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশও স্পর্শ করতে পারে।

 

সোনালীনিউজ/এমএইউ

add-sm
Sonali Tissue
শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩