বুধবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, ৫ আশ্বিন ১৪২৪

বিশ্বজুড়ে পর্নোগ্রাফি ভূত!

ফিচার ডেস্ক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৩ ডিসেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার ০৭:৩১ পিএম

বিশ্বজুড়ে পর্নোগ্রাফি ভূত!

ঢাকা: বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ওয়েবসাইটগুলোর প্রতিমাসের ভিউয়ারের তিনগুণ ভিজিট করে পর্নোসাইট। বিশুদ্ধবাদীরা যতই নাক সিটকান, পর্নো ইন্ডাস্ট্রি যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। নীল দুনিয়ার হাতছানিতে কেউ ধরা দেয় না এমন কথা আর জোর দিয়ে বলা যাবে না।

তথ্যমতে, সারাবিশ্বে পর্নো ওয়েবসাইটের সংখ্যা অন্তত সাড়ে চার কোটি। প্রতি সেকেন্ডে পর্নোগ্রাফির পেছনে খরচ হয় বাংলাদেশি মুদ্রায় আড়াই লাখ টাকার মতো। আর যে মুহূর্তে আপনি এই তথ্য পড়ছেন সে মুহূর্তে অন্তত ৩০ হাজারের বেশি মানুষ বুঁদ হয়ে আছে পর্নোগ্রাফি সিনেমার পর্দায়। শুধু তাই নয়, প্রতি মুহূর্তে অন্তত পৌনে চারশ মানুষ গুগল সার্চে লিখছেন অ্যাডাল্ট বা পর্নোজাতীয় ভিডিও বা সিনেমা।

সে কারণেই সিএনএন, ইএসপিএনের মতো বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ওয়েবসাইটের প্রতি মাসে পেজ ভিউজের তিনগুণ ভিজিট করা পর্নো ওয়েবসাইট। আর তাই, পর্নো ইন্ডাস্ট্রি হয়ে উঠেছে হলিউড, গুগল, ইয়াহু, আমাজনের থেকেও অনেক বেশি বড় ও লাভজনক। বলা যায়, সেক্স ইন্ডাস্ট্রি (পর্নোসিনেমা, যৌনব্যবসা, স্ট্রিপ ক্লাব, নারী পাচার) হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক 'ব্যবসা'।

তথ্যমতে, বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পর্নোমুভি তৈরি হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। গড়ে প্রতি সপ্তায় অর্ধসহস্র (৫০০টি) পর্নোমুভি তৈরি হয়। বলা যায়, প্রতি ৩৯ মিনিটে নির্মিত হচ্ছে একটি করে মুভি। যদিও এদেশের মাত্র দুটি রাজ্যে এ জাতীয় তৈরিতে অনুমতি আছে। এর পরের অবস্থানে জার্মানি। এদেশে প্রতি সপ্তায় তৈরি হচ্ছে অন্তত ৪০০টি পর্নোমুভি।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই পর্নো ইন্ডাস্ট্রিতে যারা আসছেন তাদের আয় রোজগারও কম নয়। সাধারণ একজন পুরুষ পর্নো অভিনেতা প্রতি ছবি থেকে আয় করেন ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। আর নারী অভিনেত্রীর ক্ষেত্রে এ আয় প্রায় দ্বিগুণ। এছাড়া সমকামী পর্নের ক্ষেত্রে পারিশ্রমিক তিনগুণ। জনপ্রিয় পর্নোস্টার বা তারকারা অবশ্য আয় করেন সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশি মুদ্রায় এটা চার থেকে পাঁচ লাখ টাকার মতো।

দৃশ্যধারণ

তবে আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে- বিশ্বের প্রভাবশালী ২০টি উন্নত দেশ বলেছে তাদের সবচেয়ে বড় দশটা সমস্যার মধ্যে প্রথম দিকে আছে শিশু বা চাইল্ড পর্নোগ্রাফি। কোনোভাবেই এই মহামারিটা তারা রোধ করতে পারছে না। অনেক দেশ চাইল্ড পর্নোগ্রাফি প্রতিরোধে ইন্টারপোলের সহায়তা নিচ্ছে। কিন্তু তাতেও কিছু হচ্ছে না।

এক সমীক্ষায় প্রকাশ করা হয়েছে, ১০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ অনলাইনে নিয়মিত পর্নো দেখেন। এটা যেকোনো নেশাকে হার মানানোর মতো। সমীক্ষায় আরো বলা হয়েছে, যেসব দেশে পর্নোগ্রাফি মুভি দেখার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই, সেখানে যৌন সহিংসতা কিংবা অপরাধের সংখ্যা কম হয়। যদিও অন্য এক সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে, যে দেশে পর্নোগ্রাফি মুভি বেশি দেখা হয়, সে দেশে যৌন অপরাধের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।

পর্নো নিয়ে শঙ্কা: সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো কেউ যখন পর্নো দেখে বা কিছু সময়ের মধ্যেই দেখবে এমন চিন্তায় থাকে তখনই তার রক্তের চাপ বাড়তে শুরু করে। পর্নো দেখার সময় তার হৃদস্পন্দন কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে দুর্বল হৃদয়ের মানুষের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়।

পর্নোগ্রাফির পক্ষে-বিপক্ষে দেশে দেশে নানা যুক্তি-তর্ক রয়েছে। তবে এসবকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রতিদিনই বাড়ছে এ ইন্ডাস্ট্রির পরিধি। কালোটাকার খনি হিসেবে দেখছেন বিনিয়োগকারীরা। তবে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণে সব দেশেই নানা মাত্রার আইন-কানুন করা আছে।  

বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রণ আইন: পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২ বাংলাদেশের একটি আইন যার মাধ্যমে পর্নোগ্রাফি বহন, বিনিময়, মুঠোফোনের মাধ্যমে ব্যবহার করা, বিক্রি প্রভৃতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

প্রথমে আইনটি প্রস্তাব আকারে (বিল) মন্ত্রী পরিষদের আনুমোদন পায়। গেল নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন চলাকালে (২৯ জানুয়ারি, ২০১২) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বিলটি উত্থাপন করেন। বিলটি পরীক্ষা করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। মাস খানেক পড়ে (২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১২) পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২ অনুমোদন লাভ করে।

ড্রোন ক্যামেরায় দৃশ্য ধারণ

পর্নোগ্রাফির সংজ্ঞা: এই আইনে পর্নোগ্রাফির সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী কোনো অশ্লীল সংলাপ, অভিনয়, অঙ্গভঙ্গি, নগ্ন বা অর্ধনগ্ন নৃত্য-চলচ্চিত্র, ভিডিও চিত্র, অডিও ভিজুয়াল চিত্র, স্থির চিত্র, অঙ্কিত চিত্রাবলী, বা অন্য কোনো উপায়ে ধারণ করা ও প্রদর্শনযোগ্য বিষয়— যার কোনো শৈল্পিক মূল্য নেই– তা পর্নোগ্রাফি হিসেবে বিবেচিত হবে। অধিকন্তু, যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী অশ্লীল বই, পত্র-পত্রিকা, ভাস্কর্য, কল্প-মূর্তি, মূর্তি, কার্টুন বা প্রচারপত্র পর্নোগ্রাফি হিসেবে বিবেচিত হবে। এসবের নিগেটিভ বা সফট ভার্সনও পর্নোগ্রাফি হিসেবে গণ্য হবে।

নিষেধাজ্ঞা: এই আইনানুযায়ী পর্নোগ্রাফি উৎপাদন, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ, বহন, সরবরাহ, ক্রয়-বিক্রয় ও প্রদর্শন বেআইনি ও নিষিদ্ধ। এই নিষিদ্ধ কর্ম সম্পাদনের জন্য শাস্তির বিবিধ বিধান রাখা হয়। এ আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ আমলযোগ্য এবং অজামিনযোগ্য।

শাস্তির বিধান: পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে বলা হয়েছে, যে কোনো ব্যক্তি পর্নোগ্রাফি উৎপাদনের উদ্দেশ্যে কোনো নারী, পুরুষ বা শিশুকে প্রলোভন দিয়ে জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে স্থির, ভিডিও বা চলচ্চিত্র ধারণ করলে বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড ও ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড আরোপ করা যাবে। এই বিলে আরো বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি পর্নোগ্রাফির মাধ্যমে কারও সম্মানহানি করে বা কাউকে ব্ল্যাকমেইল করে বা করার চেষ্টা চালায় তবে বিচারক ২ থেকে ৫ বছর মেয়াদী কারাদণ্ড আরোপ করতে পারবেন এবং তদুপরি, ১ থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড আরোপ করতে পারবেন। শিশুদের ব্যবহার করে পর্নোগ্রাফি উৎপাদন ও বিতরণকারীদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং অধিকন্তু ৫ লাখ টাকা জরিমানা আরোপের বিধান রাখা হয়েছে।

তদন্ত পদ্ধতি: আইন অনুসারে পর্নোসিডি বা ডিভিডি তৈরির দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার ও তার আস্তানায় তল্লাশি চালিয়ে আলামত আটক করা যাবে। তল্লাশিকালে আটক সফট কপি, রূপান্তরিত হার্ডকপি, সিডি, ভিসিডি, ডিভিডি, কম্পিউটার বা অন্য কোনো ডিজিটাল বা ইলেকট্রিকাল ডিভাইস, এক্সেসরিজ, মোবাইল ফোনের সিম, যন্ত্রাংশ, অপরাধ কাজে ব্যবহৃত অন্য কোনো যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ, সরঞ্জাম বা বস্তা আদালতে প্রমাণ বা প্রদর্শনী হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। এই আইনের ৫ ধারায় বলা হয়েছে যে পর্নোগ্রাফির অভিযোগ পাওয়া গেলে তা পুলিশের উপ-পরিদর্শক বা তার সমমর্যাদার কর্মকর্তাকে দিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে। তদন্তের প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি নিয়ে আরো ১৫ দিন এবং আদালতের অনুমোদন পাওয়া গেলে আরো ৩০ দিন পর্যন্ত তদন্তকাজ বাড়ানো যাবে।

শিশুদের নাগালে নীলছবি

অন্যান্য বিধান: এ আইনে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ৭ দিনের মধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব না হলে আদালত একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিতে পারবে। এ সময়ের মধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতে আত্মসমর্পণ না-করলে তার অনুপস্থিতিতেই বিচার কার্য সমাধা হবে। কেউ এ অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে ৩০ দিনের মধ্যে তাকে আপিল করতে হবে। এ ছাড়া বিলে মিথ্যা অভিযোগ দায়েরকারীর জন্যও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এ আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ আমলযোগ্য এবং অজামিনযোগ্য অপরাধ হিসাবে অভিযোগ ছাড়াই রাষ্ট্র তথা আদালত আমলে নিতে পারবে। সূত্র: উইকিপিডিয়া। 

সোনালীনিউজ/এমএন