সোমবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, ৯ আশ্বিন ১৪২৪

বেতন বৃদ্ধির গ্যাড়াকলে শিক্ষার্থীরা  

আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৩:৩৪ পিএম

বেতন বৃদ্ধির গ্যাড়াকলে শিক্ষার্থীরা
 

বিশেষ প্রতিবেদক
সরকার পে-স্কেল বাস্তবায়নের পর থেকে এমপিওভুক্ত, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা বেতন বৃদ্ধির গ্যাড়াকলে পড়েছে। এই বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে কোনো রকম নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করা হয়নি। এ নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।
রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, অগ্রণী স্কুল অ্যান্ড কলেজ, জুনিয়র ল্যাবরেটরি হাই স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বেতন প্রায় অর্ধেকের বেশি বাড়ানো হয়েছে।
উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৬ষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর মা বেতন বাড়ানো প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার বাচ্চার বেতন আগে যা ছিল এখন তার থেকে প্রায় এক হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে। মানে প্রায় দ্বিগুণ। বেতন বাড়ানোর একটা পরিমাণ থাকে। কর্তৃপক্ষের সেদিকে কোনও খেয়াল নেই।’
তার অভিযোগ, ‘বর্তমান প্রধান শিক্ষক স্কুলের দায়িত্বে আসার পর থেকে সবাইকে বিরক্ত করছেন। উনি আসার পর বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে একজন আর্মি অফিসার স্কুলের প্রধান ছিলেন। তখন স্কুলের এমন অবস্থা ছিল না।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, শিক্ষকরা সঠিকভাবে পাঠদান করেন না। কোনো নিয়ম-নীতি নেই বললেই চলে।
উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার বাচ্চার বেতন চারশ টাকা বাড়ানো হয়েছে। একবারে এতো টাকা না বাড়িয়ে প্রতি বছর বা দুই বছর পরপর দুইশো টাকা করে বাড়ালেও তারা পারতেন। নতুন পে-স্কেল ঘোষণার পর থেকেই সব কিছুর ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। যে কারণে আমাদের ওপর দিন দিন চাপ বাড়ছে।’
জুনিয়র ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বাবা অভিযোগ করেন, ‘এ স্কুলে বাড়ানো হয়েছে পাঁচশ টাকা। এখন দেখার বিষয়, কোন কোন মানুষ পে-স্কেলের অধীনে বেতন পাচ্ছে। আমি তো ব্যবসা করি। আমার তো টাকা বাড়েনি।’
উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সহকারী অধ্যাপক মো. আবুল হোসেন বেতন বৃদ্ধি ও অভিভাবকদের অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, ‘যেসব অভিভাবক আমাদের নিয়ে এসব মন্তব্য করছেন, তাদের আপনারা প্রশ্ন করুন, তাদের বাড়ি ভাড়া যখন বাড়ানো হচ্ছে, তখন তারা কী করছেন? আমার প্রতিষ্ঠানে ৪৩২ জন শিক্ষক আছেন। তাদের মধ্যে মাত্র ৩৪ জন এমপিওভুক্ত। এখন শিক্ষকদের পে-স্কেলের অধীনে বেতন না দেওয়া হলে তারা কর্মবিরতিতে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। আপনারা বলেন, আমি এখন কোথায় যাব।’
উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ড. উম্মে সালেমা বেগম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের ১২ জন শিক্ষক মাত্র এমপিওভুক্ত। বাকি শিক্ষকদের বেতন প্রতিষ্ঠান থেকে দিতে হয়। আবার আমাদের প্রতিষ্ঠানে বিষয় বেড়েছে চারটা। এজন্য শিক্ষক বাড়ানো প্রয়োজন। ৬৫টি কম্পিউটার প্রয়োজন। আছে মাত্র ১৫টি। মাল্টিমিডিয়া শ্রেণি কক্ষ প্রয়োজন ৫৬টি। আছে মাত্র চারটি। তাহলে এত ঘাটতি আমরা কিভাবে পূরণ করব? সে কারণেই শিক্ষার্থীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে।’
উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বেতন বাড়ানো ও অভিভাবকদের অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমাদের কিছুই করার নাই। আমাদের সবদিক বিবেচনা করে কাজ করতে হয়। এখন যদি শিক্ষার্থীদের বেতন বাড়ানো না হয়, তা হলে শিক্ষকদের পে-স্কেলের অধীনে বেতন দেব কিভাবে?’
উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গভর্নিং বডির সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ‌অধ্যাপক ড. আ.আ.ম.স. আরেফিন সিদ্দিকী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের শিক্ষকদের মানোন্নয়ন, প্রতিষ্ঠান সংস্কার, শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্যই এই বেতন বাড়ানো হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন যদি কেউ বাড়তি বেতন নিয়ে অভিযোগ করে, তা হলে তারা তাদের বাচ্চাদের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে পড়াক। শিক্ষার্থীদের বেতন না বাড়ানো আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’
বেতনবৃদ্ধিসহ সামগ্রিক বিষয় নিয়ে কথা হয় মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিভাবক সমিতির সভাপতি সাংবাদিকদের জানান, ‘সরকার ভর্তির যে নীতিমালা করেছেন, তা অতিদ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে এবং নতুন করে বেতন বৃদ্ধির নীতিমালা করতে হবে। তাহলে কেউ হঠাৎ করেই বেতন বাড়াতে পারবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেতনবৃদ্ধি শিক্ষকদের বিষয় নয়। এসব প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন মন্ত্রী ও এমপিরা গভর্নিং বডির সভাপতি। তারা প্রতিষ্ঠানের বেতন বাড়িয়ে থাকেন। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গর্ভনিং বডি থেকে সরাতে হবে। কোনও পকেট কমিটি হবে না এবং গভর্নিং বডির নির্বাচন দিতে হবে। তাহলেই কেউ অযৌক্তিকভাবে বেতন বাড়াতে পারবেন না।’

সোনালীনিউজ/এমএইউ