মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট, ২০১৭, ৭ ভাদ্র ১৪২৪

বোরো ধানে লোকসান, কৃষকের মাথায় হাত

সোনালীনিউজ রিপোর্ট | সোনালীনিউজ অনলাইন
আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৪:০১ পিএম

বোরো ধানে লোকসান, কৃষকের মাথায় হাত

মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বোরো ধান ফলিয়ে এখন কৃষকের মাথায় হাত। লাভ তো দূরের কথা, বরং এখন প্রতি মণ বোরো ধানে কৃষককে দেড়শ’ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। সহসা দাম বাড়ারও কোনো সম্ভাবনা নেই।

কারণ বিগত কয়েক মাসে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে বৈধ ও অবৈধ উভয় পথেই ব্যাপকভাবে চাল আমদানি হয়েছে। ফলে বড় ব্যবসায়ীদের কাছে চালের মজুদ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। তার পাশাপাশি গত মৌসুমের চালও মজুদ থাকায় এখন ব্যবসায়ীরা আর বাজার থেকে ধান কিনতে আগ্রহী হচ্ছে না।

তাছাড়া ধানচাষীদের বেশির ভাগই প্রান্তিক কৃষক। বর্গার টাকা পরিশোধের তাগিদের পাশাপাশি নিজেদের আর্থিক প্রয়োজনে ওসব কৃষক মৌসুমের শুরুতেই ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন। কিন্তু বাজারে সরবরাহে কোনো ঘাটতি না থাকায় ধানের দাম বাড়ছে না। বাজার ও কৃষি বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গতবারের তুলনায় চলতি মৌসুমে ধানের দাম কিছুটা বাড়তির দিকে। পাশাপাশি এবার ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু বাজাওে আমদানি করা চালের ব্যাপক মজুদ থাকায় এবং বাজারে সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে চালকল মালিকদের কম দামে ধান কেনার প্রবণতায় মৌসুমের শুরুতেই বোরো দামের দাম নিম্নমুখী হয়ে পড়েছে। যদিও ইতিমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে সংগ্রহ মৌসুমে বিপুল পরিমাণ ধান কেনার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

তারপরও প্রান্তিক কৃষকরা লোকসানের বেড়াজাল থেকে বেরোতে পারছে না। কৃষি বিভাগের হিসাব মতে- চলতি মৌসুমে প্রতি কেজি বোরো ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে ২০ টাকা ৭০ পয়সা। আর চাল উৎপাদনে ব্যয় কেজিপ্রতি ২৯ টাকা। ওই হিসাবে এক মণ ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ পড়েছে ৮২৮ টাকা। কিন্তু দেশের বিভিন্ন বাজারে সাধারণ মানের ধান বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ৬৫০-৭২০ টাকায়। গড়ে ৬৮৫ টাকায় বিক্রি হওয়ায় মণপ্রতি কৃষকের লোকসান হচ্ছে প্রায় ১৫০ টাকা।

সেচ, সার ও কীটনাশকনির্ভর বোরো ধান আবাদে নিবিড় পরিচর্যায় খরচ পড়ে বেশি। বীজতলা তৈরি থেকে শুরু করে চারা লাগানো, নিড়ানি দেয়া, ধান কাটা, মাড়াইসহ ঘরে তোলা পর্যন্ত প্রতি বিঘা জমিতে কৃষি মজুর লাগে ২৫ জন। বীজের দাম, সারের দাম, তিনবার সেচ, দুবার কীটনাশক প্রয়োগ ও জমির ভাড়াসহ এক বিঘা জমিতে ধান চাষে খরচ পড়ে প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার টাকা। আর প্রতি বিঘা জমিতে ধান পাওয়া যায় গড়ে ১৯ মণ। সে হিসাবে প্রতি মণে খরচ হচ্ছে ৮১৫ টাকা। কিন্তু বাজারে মোটা চালের ধান বিক্রি হচ্ছে ৬৫০ টাকায়। এমন দামে ব্যাপক লোকসানের কারণে কৃষকরা সামনের দিনে ধান আবাদ ছেড়ে দিতেই বাধ্য হবে।

সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ অভিযোগ শুরু করা হয়েছে। আর আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এই অভিযান চলবে। বোরো মৌসুমে ৭ লাখ টন ধান ও ৬ লাখ টন চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রতি কেজি ২৩ টাকা দরে ধান ও ৩২ টাকা দরে চাল সংগ্রহ করা হবে। সরকার চলতি মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ধান কেনার ঘোষণা দিলেও দাম না পাওয়ার কারণ অনুসন্ধান এবং তা প্রতিকারের প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র আরো জানায়, প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে বিগত কয়েক মাসে বিপুল পরিমাণ চাল এসেছে দেশে। ফলে ধান-চালের বড় ব্যবসায়ীদের মজুদ বেড়ে যাওয়ায় তারা ধান কিনতে আগ্রহী হচ্ছে না। ফলে এক প্রকার ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়েছে বাজার। আর বড় ক্রেতা না থাকায় মিল মালিকরাও ধান কিনতে সাহস পাচ্ছেন না। কারণ মিলারদের কাছে যে মজুদ রয়েছে তা দিয়ে সরকারের সাময়িক চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। তবে সরকারিভাবে ধান-চাল কেনা ব্যাপকভাবে শুরু হলে মিলাররা বাজার থেকে ধান কেনা শুরু করতে পারে। তখন দাম কিছুটা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক খাদ্য সচিব মো. আবদুল লতিফ মণ্ডল জানান, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই চাল আমদানি যৌক্তিকীকরণ করতে হবে। পাশাপাশি এক ধরনের সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের অবশ্যই নির্মূল করতে হবে। আবার ধান ও চালের দাম এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে তা যেন ভোক্তার ওপর বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়। সেজন্য কৃষকের উৎপাদন খরচ কমিয়ে তাদের বেশি মুনাফা দেয়া যায় কিনা ভাবতে হবে। আর তা করতে অবশ্যই ভর্তুকি কার্যক্রমকে ঢেলে সাজাতে হবে।

সোনালীনিউজ/ঢাকা/আমা