শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩

ভেঙে পড়েছে নির্বাচনী ব্যবস্থা

আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৩:৫৮ পিএম

ভেঙে পড়েছে নির্বাচনী ব্যবস্থা

বিশেষ প্রতিনিধি

১৯৯১ সাল থেকে সংসদীয় রাজনীতিতে পথচলা বাংলাদেশ গত আড়াই দশকে (১-১১ বাদে) নির্বাচনী সংস্কৃতিতে মোটামুটি গ্রহণযোগ্যতার একটি মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলা যায়। তবে, সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনের পর থেকে  সেই ধারা ভেঙে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

অন্যান্য দেশে নির্বাচনে হারজিত যা-ই হোক না কেন, বিজয়ীকে স্বাগত জানায় পরাজিত প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু আমাদের দেশে এমন কোনো সংস্কৃতি এখনো গড়ে উঠেনি। এদেশে জাতীয় কিংবা স্থানীয়। কোনো নির্বাচনেই হেরে যাওয়া দল বিজয়ীদের স্বাগত জানায় না। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত বিজয়ীরা দেশ চালান। নব্বইয়ের পর ২০০৮ সাল পর্যন্ত দেশে যেসব নির্বাচন হয়েছে সেগুলো মোটামুটি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে সাধারণ মানুষের কাছে। কিন্তু ২০১৪-এর ‘৫ জানুয়ারি’র নির্বাচনের পর জাতীয় থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ক্রমেই গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে বলে মনে করছেন নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে সদ্য অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার হিড়িক যেমন পড়েছে, তেমনি সহিংসতাও বেড়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এ ধারার নির্বাচন আগামীতে নির্বাচনী ব্যবস্থায় আস্থাহীনতার সৃষ্টি হতে পারে— এমন আশঙ্কা করছেন অনেকে।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন সাংবাদিকদের বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন এখন বিবৃতিনির্ভর প্রতিষ্ঠান, যা হওয়ার হয়ে যাচ্ছে। এরপর সন্ধ্যার সময় একটা বিবৃতি দিয়ে কমিশন তাদের দায়িত্ব সারছেন। এর মাধ্যমে আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতির যে একটা ইতিবাচক ধারা তৈরি হয়েছিল— সেটা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সামনের দিনে মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাবে কি না— তাই নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।’

এদিকে দায়িত্ব নেয়ার প্রথম দিকে কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ইতিবাচক ভাবমূর্তি নিয়ে যাত্রা শুরু হয় রকিব কমিশনের। এরপর থেকে অনুষ্ঠান হওয়া নির্বাচন নিয়ে ক্রমেই প্রশ্ন উঠতে থাকে। চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে কমিশনের সমালোচনা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে খোদ আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত নির্বাচন কমিশনের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করে বলেছেন, ‘এইটা কেমন নির্বাচন কমিশন? লড়েও না চড়েও না?’ এমনকি তিনি এ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

নির্বাচন নিয়ে গবেষণা করেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তার মতে, উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলো রাতারাতি তাদের নির্বাচন পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা আনতে পারেনি, অনেক সময় লেগেছে। বাংলাদেশও তেমনি একটি ট্র্যাকে উঠতে শুরু করেছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচন দেখে মনে হচ্ছে সেই পরিস্থিতির অবনতি শুরু হয়েছে। অবশ্য গত জাতীয় নির্বাচনই সেই ইঙ্গিত দিয়েছিল।

স্থানীয় সরকারের সর্বশেষ প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদ। দলীয় প্রতীকে প্রথমবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সংসদের বাইরে রয়েছে দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি। রাজপথে থাকা দলটি অভিযোগ করে বলছে, এই সরকারের আমলে যে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় মানুষ সেটা বুঝতে পারছে।

প্রসঙ্গত, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ছয়টি ধাপের মধ্যে দুই ধাপের নির্বাচন শেষ হয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচনী সহিংসতায় প্রথম ধাপে ১১ জন এবং দ্বিতীয়ধাপে ৯ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন কয়েকশ। দ্বিতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের দিন শেষে সাংবাদিকদের কাছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার রকিবউদ্দীন আহমদও স্বীকার করেছেন যে, সহিংসতার কারণে অনেক অর্জন ম্লান হয়ে গিয়েছে। জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সকল সহিংতার দায় নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচনে রক্তের গঙ্গা বইছে। দেশের মানুষ নির্বাচনে এমন দৃশ্য দেখতে চায় না।’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, যেটা গেছে গেছেই, এই সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে আর কোনো ভোট নয়’। একই সঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্য কমিশনারদের বিচার দাবি করেছেন এ বিএনপি নেতা। তবে, নির্বাচনী সংস্কৃতিতে ব্যত্যয় ঘটানোর ক্ষেত্রে বিএনপির সমালোচনাও কম নয়। ১৯৯৬ সালের বিতর্কিত ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন এবং ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে বিএনপি স্বচ্ছতার পরিচয় দেয়নি, যা পরবর্তীতে ক্রমাবনতিশীল নির্বাচনী সংস্কৃতি তৈরিতে উৎসাহিত করেছে বলেও মনে করেন অনেকে। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে বিএনপি যখনই ক্ষমতায় ছিল, তখনই নির্বাচন নিয়ে গণ্ডগোল করেছে। আমরাই বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দিচ্ছি। দেশের মানুষ তা দেখছেন।

সোনালীনিউজ/এমএইউ

add-sm
Sonali Tissue
শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩