রবিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৪

মামলাজটে খালেদা জিয়া!

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, মঙ্গলবার ০৫:০২ পিএম

মামলাজটে খালেদা জিয়া!

ঢাকা: মামলার জালে আটকা পড়ছেন কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। সোমবার (১২ ফেব্রুয়ারি) আরো তিন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে তাঁকে। এর মধ্যে আছে কুমিল্লায় নাশকতার একটি মামলা এবং ঢাকার তেজগাঁও ও শাহবাগ থানার আরও দুটি মামলা। 

শাহবাগ থানার মামলায় ১৮ ফেব্রুয়ারি এবং তেজগাঁও থানার মামলায় ৪ মার্চ খালেদা জিয়াকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আরও কয়েকটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হতে পারে বলে জানা গেছে। আর তা হলে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জামিনে বের হওয়া দীর্ঘায়িত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

এদিকে, যে মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাবন্দী হয়েছেন খালেদা জিয়া সেই জিয়া অরফানেজ ট্রাষ্ট দুর্নীতি মামলার সার্টিফায়েড কপি এখনও পাওয়া যায়নি। ফলে এ মামলায় আপিল করে জামিন করতেও বেশ সময় লাগবে। তার ওপর নতুন করে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো শুরু হওয়ায় তার মুক্তি নিয়ে শঙ্কা আরো বেড়েই যাচ্ছে। 

বিএনপি নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি আটকাতে এসব ষড়যন্ত্রমূলক পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। রায় হওয়া মামলা ছাড়া নাশকতা ও দুর্নীতি মিলিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন আরো ৩৪টি মামলার আসামি। তার মধ্যে ১৯টি মামলা বিচারাধীন। 

এগিয়ে আছে জিয়া চ্যারিটেবল দুর্নীতি মামলা। এ মামলায় যুক্তিতর্ক শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ১২টি মামলা রয়েছে তদন্তাধীন। হাইকোর্টের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে ৩টি মামলা। তাঁর বিরুদ্ধে মোট ৩৫টি মামলার ৫টি সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলের।

আর অন্য ৩০টি বর্তমান সরকার আমলের। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে গাড়ি পোড়ানোর মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে গতকাল গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আদালতের জারি করা প্রোডাক্টশন ওয়ারেন্ট (পিডব্লিউ) সোমবার সন্ধ্যায় কারাগারে এসে পৌঁছে।

কারা অধিদফতরের মহাপরিদর্শক (প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার সৈয়দ ইফতেখার সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, সন্ধ্যায় খালেদার বিরুদ্ধে আদালতের প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট কারাগারে এসে পৌঁছেছে। তাঁর বিরুদ্ধে কুমিল্লার আদালতে তিনটি মামলা রয়েছে। 

এর মধ্যে দুটি মামলায় হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দেয়। একটি মামলায় অর্থাৎ বাসে নাশকতায় ৮জন নিহতের ঘটনায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ দলটির সাতজন শীর্ষ নেতাকে হুকুমের আসামি করা হয়। পরবর্তীতে মামলার চার্জশিটে ৬৮জনকে অভিযুক্ত করেছে পুলিশ। 

নাশকতার এসব মামলায় গতবছরের জানুয়ারিতে খালেদা জিয়াসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন কুমিল্লার একটি আদালত। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশারফ হোসনসহ অন্য আসামিরা জামিন নিয়েছেন। তবে খালেদা জিয়া জামিন নেননি। তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বলবৎ রয়েছে। 

ফলে ওই মামলায় খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। অন্যদিকে, শাহবাগ ও তেজগাঁও থানার অন্য দুই মামলায়ও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছেছে বলে নিশ্চিত করেছেন আইজি প্রিজন।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, রায়ের সার্টিফায়েড কপি হাতে পেলেই আপিল করবো। কিন্তু অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলে সেসব মামলায়ও জামিন নিতে হবে। অন্যথায় তাকে মুক্ত করা যাবে না। তবে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে কতদিন সময় লাগতে পারে এ বিষয়ে তিনি কিছুই বলতে পারছেন না।

গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা: খালেদা, তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে ২০০৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর তেজগাঁও থানায় গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা দায়ের করেন দুদকের উপ পরিচালক গোলাম শাহরিয়ার চৌধুরী। এই মামলা দায়েরের পরদিনই খালেদাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরের বছর ১৩ মে খালেদাসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় দুদক। ঢাকার তিন নম্বরর বিশেষ জজ আবু সৈয়দ দিলজার হোসেনের আদালতে মামলাটির অভিযোগ গঠনের শুনানি চলছে। গত ২১ জানুয়ারি বিচারক আগামী ৪ মার্চ পরবর্তী শুনানির দিন ঠিক করে দিয়েছিলেন।

কয়লা খনি দুর্নীতি মামলা: বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি মামলাটিরও অভিযোগ গঠনের শুনানি চলছে ঢাকার ২ নম্বর বিশেষ জজ হোসনে আরা বেগমের আদালতে। এটির শুনানির পরবর্তী তারিখ জানা যায়নি। এই মামলাটি দুদক দায়ের করে ২০০৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি খালেদা এবং তার মন্ত্রিসভার ১০ সদস্যসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে। ওই বছরের ৫ অক্টোবর ১৬ জনের বিরুদ্ধেই অভিযোগপত্র দেয়া হয় আদালতে।

নাইকো দুর্নীতি মামলা: নাইকো মামলাটি হয়েছিল ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর তেজগাঁও থানায়। দুদক মামলার পর তদন্ত করে ২০০৮ সালের ৫ মে খালেদাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছিল। বর্তমানে মামলাটিতে ঢাকার নয় নম্বর বিশেষ জজ মাহমুদুল কবীরের আদালতে আসামিদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতির আবেদনের শুনানি চলছে। ১১ মার্চ পরবর্তী শুনানির দিন ঠিক রয়েছে।

জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা: আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলাটি হয় ২০১১ সালের ৮ অগাস্ট। এটিও করে দুদক। ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল হয়। বর্তমানে এই মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি চলছে ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ মো. আখতারুজ্জামানের আদালতে, যিনি এতিমখানা দুর্নীতির মামলায় রায় দিয়েছিলেন। আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি এই মামলায় শুনানির দিন ধার্য আছে।

রাষ্ট্রদ্রোহ ও নাশকতার ১১ মামলা: এছাড়া বর্তমান সরকার আমলে দায়ের করা রাষ্ট্রদ্রোহ ও নাশকতার অভিযোগের ১১ মামলায় খালেদা জিয়াকে আগামী ২৫ এপ্রিল ঢাকার আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশনা রয়েছে বিচারকের। 

এছাড়া খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সহিংসতা ও নাশকতার অভিযোগে ঢাকাসহ দেশের থানায় বিভিন্ন মামলা রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীর গুলশান ও কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানায় দুইটি, খুলনা সদর থানায় একটি এবং রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার তিনটি মামলা উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে গুলশান, কুমিল্লা ও খুলনার মামলাগুলো তদন্তাধীন।

মানহানি ও ভুয়া জন্মদিনের মামলা: ১৫ আগস্ট ভুয়া জন্মদিন পালনের অভিযোগেও মামলা আছে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে। ২০১৬ সালের ৩০ আগস্ট ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গাজী জহিরুল ইসলাম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করেন। 

২০১৬ সালের ১৭ নভেম্বর সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। আগামি ১৪ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের নতুন তারিখ ধার্য করেছে আদালত।

২০১৬ সালের ৩ নভেম্বর বাংলাদেশ জননেত্রী পরিষদের সভাপতি এবি সিদ্দিকী ‘স্বীকৃত স্বাধীনতা বিরোধীদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়ে দেশের মানচিত্র এবং জাতীয় পতাকার মানহানি ঘটানোর অভিযোগে সিএমএম আদালতে একটি মানহানির মামলা করেন। এই মামলায় গত ১২ অক্টোবর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। তবে সে পরোয়ানা তামিল করেনি পুলিশ।

মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলায়ও মামলা রয়েছে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে। ২০১৬ সালের ৫ জানুয়ারি ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতে বাদী হয়ে মামলাটি করেন জননেত্রী পরিষদের সভাপতি এবি সিদ্দিক।

সোনালীনিউজ/জেডআরসি/জেএ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue