বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩

যক্ষ্মার সঙ্গে লড়তে ‘নায়ক ইঁদুর’!

স্বাস্থ্য ডেস্ক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৪:০১ পিএম

যক্ষ্মার সঙ্গে লড়তে ‘নায়ক ইঁদুর’!

এক সময় যক্ষ্মা ছিল এক মরণব্যাধী ও আতংকের রোগ। যক্ষ্মা হলে ওই পরিবারে নেমে আসতো আতংক, দুঃশ্চিন্তা আর বিষন্নতা। আগে বলা হতো ‘যক্ষ্মা হলে রক্ষা নেই’। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের জেনে যাওয়ার ভয়ে তখন কারো যক্ষ্মা হলে তারা সহজে চিকিৎসা করাতো না। কিন্তু সেই দিন আর নেই। এখন চিকিৎসায় ভালো হয় যক্ষ্মা।

চিনে নিন নায়ক ইঁদুরকে
টিউবারকুলোসিস, অর্থাৎ টিবি বা যক্ষ্মা রোগ নির্ণয়ে সহায়তার জন্য বেলজিয়ান বেসরকারি সংস্থা আপোপো বিশেষ প্রজাতির ইঁদুরের প্রজনন করাচ্ছে। আফ্রিকার এই ধরনের ইঁদুরের নাম দেয়া হয়েছে ‘গিলবার্ট’। তানজানিয়ার মোরোগোরো শহরের পরীক্ষাগারে এক চৌকোনা খাঁচায় মানুষের থুথুর নমুনা রাখা হয়। গিলবার্টরা গন্ধ শুঁকেই জানিয়ে দেয় থুথুতে সংক্রমণ হয়েছে কিনা। এমন চল্লিশটি ‘নায়ক ইঁদুর’ আছে সেই পরীক্ষাগারে।

ইঁদুরেরও চাই প্রেরণা
সংক্রমণ সম্পর্কে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেছে এমন থুথুর নমুনায় গিলবার্ট যতবার তার সামনের থাবা দিয়ে আঁচড় কাটে, ততবারই তাকে পুরস্কার হিসেবে দেয়া হয় কলা আর মটরশুঁটি মেশানো খাবার। খাবার পেলে নতুন উদ্যমে আবার কাজ শুরু করে গিলবার্ট।

গিলবার্টরা আরো জানে...
শুধু যক্ষ্মা রোগ নির্ণয়েই নয়, মোজাম্বিক, অ্যাঙ্গোলা এবং কম্বোডিয়ার মতো দেশে ভূমি মাইন খুঁজে বের করায় সহায়তার জন্যও গিলবার্টদের কাজে লাগায় আপোপো। সামান্য এক ইঁদুরের সহায়তা নিয়ে শুধু মোজাম্বিকেই ২ হাজার ৫৮৭টি ভূমি মাইন খুঁজে বের করে ধ্বংস করা হয়েছে। এছাড়া এক হাজারেরও বেশি এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস আর প্রায় ১৩শ আগ্নেয়াস্ত্র এবং গোলাবারুদেরও সন্ধান দিয়েছে এই ইঁদুর।

পয়সা উসুল...
আফ্রিকার এই ইঁদুরের ঘ্রাণশক্তি ভীষণ তীক্ষ্ম। অন্যান্য ইঁদুরের তুলনায় এরা বেশ শান্ত স্বভাবের। প্রতিটি ইঁদুরের প্রশিক্ষণের পেছনে গড়ে ৬শ ইউরোর মতো খরচ হয়। তাতে কী! এ ইঁদুর আট বছর বাঁচে। এদের পোষ মানানো সহজ, পুষতে তেমন কোনো ঝামেলাও নেই। সবচেয়ে বড় কথা, কুকুরকে যেমন একজন প্রশিক্ষক দিয়েই সব শেখাতে হয়, গিলবার্টদের তেমন বায়নাক্কাও নেই।

জন্ম থেকেই শুরু
আপোপো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিজেদের জায়গাতেই ইঁদুরের প্রজনন করায়। সংস্থাটি বুনো ইঁদুর পেলেই তাদের দিয়ে শুরু করে বংশ বৃদ্ধির কাজ৷ বাচ্চা ইঁদুর জন্মের পর চোখ খোলার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে যায় প্রশিক্ষণ।

গিলবার্ট যেভাবে বাঁচায়
সাভেরা কম্বা-র কাশি আর সারছিলই না। শরীরের ওজন কমে যাচ্ছিল। সবসময় ক্লান্ত লাগতো। হাসপাতালে ডাক্তাররা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বললেন, যক্ষ্মা হয়নি। অগত্যা থুথুর নমুনা পাঠানো হলো। গিলবার্ট শুঁকেই জানিয়ে দিল, যক্ষ্মা হয়েছে। যেন নতুন জীবন পেলেন তিনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও)-র এক সমীক্ষা অনুযায়ী শুধু ২০১২ সালেই সারা বিশ্বে যক্ষ্মায় মারা গেছে ১৩ লাখেরও বেশি মানুষ। সাভেরাকে বাঁচিয়েছৈ ইঁদুর।

নিশ্চিত হওয়া
হাসপাতালের পরীক্ষায় যক্ষ্মা ধরা পড়েনি, কিন্তু ইঁদুরের নাসিকায় ধরা পড়েছে, রোগীদের এমন থুথু আবার পরীক্ষা করে দেখছেন আপোপো ল্যাব-এর প্রশিক্ষিত কর্মীরা। পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার পর রোগীকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যেতে বলা হবে।

চটপটে গিলবার্ট
আপোপো-র ইঁদুরগুলোর বিশেষত্ব কী জানেন? ওরা খুব দ্রুত কাজ করে। ল্যাবরেটরিতে একজন মানুষ সারাদিনে যতগুলো থুথুর নমুনা পরীক্ষা করতে পারে গিলবার্ট তা করে ফেলে মাত্র সাত মিনিটে। যক্ষ্মা হওয়ার ঝুঁকি বেশি এমন সব জায়গা, যেমন শরণার্থী শিবির বা কয়েদখানায় ইঁদুর দিয়ে পরীক্ষা করালে মন্দ কি!

চিকিৎসা শুরু
সাভেরা কম্বার ওজন এখনো মাত্র ৩৯ কেজি। তবে ওষুধ খেতে শুরু করার পর থেকে শারীরিক অবস্থার উন্নতি নিজেই বুঝতে পারছেন, তাই খুব খুশি মনেই বললেন, ‘‘ইঁদুর না থাকলে আমি হয়ত মারাই যেতাম!’’

তবু স্বীকৃতি নেই
ইঁদুর দিয়ে যক্ষ্মা রোগ নির্ণয়ের এই পদ্ধতিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনো স্বীকৃতি দেয়নি। গত বছর তানজানিয়ায় মোট ১৭শ রোগীর সুচিকিৎসা সম্ভব হয়েছে প্রশিক্ষিত ইঁদুরদের কল্যাণে। আপোপো তাই ডাব্লিউএইচও-র স্বীকৃতির আশায় বসে নেই। তানজানিয়ার পর মোজাম্বিকেও একটি যক্ষ্মা রোগ নির্ণয় কেন্দ্র খুলেছে। ভবিষ্যতে দক্ষিণ আফ্রিকাতেও এমন পরীক্ষাগার চালু করার পরিকল্পনা আছে আপোপোর।

সোনালীনিউজ/ঢাকা/আমা

add-sm
Sonali Tissue
বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩