সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩

শবেবরাত : একটি পর্যালোচনা

আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৩:৫৯ পিএম

শবেবরাত : একটি পর্যালোচনা

হাফেজ মাওলানা ড. আবদুল জলীল, সোনালীনিউজ

ঢাকা : শবেবরাত শব্দটি আরব বিশ্বে পরিচিত না হলেও পাক-ভারত উপমহাদেশে বিশেষত বাংলাদেশে একটি অতি পরিচিত ও সম্মানিত নাম। সাধারণ জনগণ যাকে ‘ভাগ্যরজনী’ বলে মনে করে। ‘শব’ শব্দটি ফার্সি যার অর্থ রাত আর ‘বরাত’ শব্দটিও ফার্সি যার অর্থ ভাগ্য।

একসাথে এর অর্থ ভাগ্য রজনী। সাধারণত এ কথা বহুল প্রচলিত যে, এ রাতে মানুষের ভাগ্য লেখা হয়। সারা বছরের খাওয়া-দাওয়া, রুজি-রোজগার ও জীবনযাত্রা কার কেমন হবে আর কে জন্ম নেবে, কে মারা যাবে, কে জীবিত থাকবে সবই আল্লাহতায়ালা এ রাতেই নির্ধারণ করে থাকেন এবং তাঁর নির্দেশে ফেরেশতারা তা লিখে রাখেন। সুতরাং ভাগ্য পরিবর্তনের এ সুযোগ গ্রহণ করার জন্য এ রাতে মসজিদগুলোতে ভিড় উপচে পড়ে। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালীন মুক্তির জন্য যতটুকু নয় তার চেয়ে বেশি, দুনিয়াবি জিন্দিগিতে ভালো থাকার জন্য, ভালো খাওয়া-পরার জন্যই বেশির ভাগ এ রাতের ইবাদতে আগ্রহী হয় বেশি।

যার ফলে দেখা যায় সারা বছর যারা ফরজ নামাজের জন্য মসজিদে আসে না, তারা এ রাতে সুন্দর মুসাল্লা হাতে নিয়ে আগে আগে মসজিদে এসে জায়গা করে নেয়, ফরজের চেয়ে এ রাতের নফল ইবাদতের প্রতি গুরুত্ব দেয়া করা হয়, এমনকি কুরআনে উল্লিখিত মহিমানি¦ত কদরের রাতেরও এত গুরুত্ব দেয়া হয় না। এ ধারণার মূলে রয়েছে কিছু আলেম-উলামা ও ইমাম সাহেবানের ওয়াজ-নসিহত এবং বাংলায় রচিত তত্ত্ব ও তথ্যবিহীন ‘বাংলাবাজারি’ কিছু ইসলামি বইপুস্তক। আর তাদেরও ভিত্তি হলো, সূরা দুখানের এ আয়াত সম্পর্কে রাবি ইকরিমার বর্ণনা : ‘কসম, সুস্পষ্ট কিতাবের! আমি তো তা নাজিল করেছি এক মুবারক রজনীতে। আমি তো সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরিকৃত হয় আমার আদেশক্রমে (সূরা দুখান, আয়াত নম্বর ২-৫)। ইকরিমার বর্ণনামতে, এ আয়াত দ্বারা মধ্য শাবানের রাত তথা ‘শবেবরাত’ বোঝানো হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ বর্ণনা সঠিক নয়। কারণ ইকরিমা যার মুক্ত দাস ও রাবি ছিলেন সেই মুফাঁসসির সম্রাট হজরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রা: বলেন, এ আয়াতের দ্বারা লায়লাতুল কদর তথা শবেকদর বোঝানো হয়েছে।

এর পেছনে শক্তিশালী প্রমাণ হলো কুরআনুল কারিমের আয়াত : ‘রামাদান মাস। এতে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে কুরআন নাজিল করা হয়েছে’ (সূরা বাকারা, আয়াত-১৮৫) এবং ‘নিশ্চয়ই আমি তা নাজিল করেছি কদরের রাতে (সূরা আলকদর-১)। এ আয়াতদ্বয় দ্বারা স্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয় যে, কদরের রাতে কুরআন নাজিল হয়েছে এবং কুরআন নাজিলের সে রাতকেই সূরা দুখানের ওই আয়াতে ‘বরকতময় রজনী’ বলে অভিহিত করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, ওই রজনীতে সব কিছু নির্ধারণ করা হয়।

আর নির্ধারণ করারও ব্যাখ্যা হলো, সব কিছু তো আগেই আল্লাহ নির্ধারণ করে রেখেছেন ওই রাতে (কদরের রাতে) শুধু আগামী এক বছর সংঘটিত বিষয়াদি লিখে তা বাস্তবায়নের জন্য ফেরেশতার কাছে হস্তান্তর করা হয়। সুতরাং কুরআনের সুস্পষ্ট বর্ণনায় যখন প্রমাণিত হচ্ছে যে, ওই রজনী হলো কদরের রজনী তখন তা বাদ দিয়ে ইকরিমার মতো একজন দুর্বল রাবির বর্ণনা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

তবে মধ্য শাবানের ওই রাতে ভাগ্য নির্ধারণ না হলেও এ রাতে নিভৃতে ইবাদতের ফজিলত ও মর্যাদা রয়েছে তা অস্বীকার করা যাবে না। এ রাত সম্পর্কিত হাদিসে যেসব ফজিলত ও মর্যাদার কথা উল্লিখিত হয়েছে তা লাভ করার জন্য একজন মুমিন বান্দার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা থাকবে এটাই স্বাভাবিক।

রাত জেগে ইবাদত-বন্দিগির মাধ্যমে যদি তা লাভ করা যায় তাহলেও তা কম সৌভাগ্যের বিষয় নয়। এ রাতের ফজিলত ও মাহাকার্য সম্পর্কে অনেক কাল্পনিক ও মনগড়া বর্ণনার ছড়াছড়ি দেখা যায় কিছু বাংলা অজিফার বই-পুস্তক ও সাম্প্রতিক কালের কিছু পত্রপত্রিকায়। সেগুলো বাদ দিয়ে নির্ভরযোগ্য হাদিসগ্রন্থগুলোয় যেসব বর্ণনা পাওয়া যায় এ রাতের মাহাকার্য প্রমাণের জন্য তাই যথেষ্ট। হাদিসগ্রন্থগুলোয় এ রাতকে ‘শাবানের মধ্য রাত’ (লায়লাতুল-নিসফ মিন শাবান) বলে অভিহিত করা হয়েছে। আরব বিশ্বে এবং হাদিস তাফসির গ্রন্থে রাতটি এ নামেই পরিচিত।

হাদিসগ্রন্থগুলোয় এ রাতের ফজিলত ও মাহাকার্য সম্পর্কে যে বিবরণ উল্লিখিত হয়েছে তার কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হলো :
১. হজরত মুআজ ইবন জাবাল রা: থেকে বর্ণিত তিনি নবী করিম সা: থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী করিম সা: ইরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা মধ্য শাবানের রাতে তার সৃষ্টির প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেন। অতঃপর তিনি মুশরিক ও হিংসাবিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া অন্য সবাইকে ক্ষমা করে দেন (সাহিহ ইবন হিব্বান)। ইবন হিব্বান ছাড়াও বিভিন্ন ইমামের মতানুসারে হাদিসটি সহিহ। তা ছাড়া জইফ ও মাওজু হাদিসের কট্টর সমালোচক নাসিরুদ্দিন আলবাণীও হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। হজরত আবু মুসা রা: থেকেও হাদিসটি বর্ণিত আছে, যা সুনান-ই ইবন মাজাহ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবন আমর রা: থেকেও হাদিসটি বর্ণিত আছে, যা ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বাল র: স্বীয় মুসনাদ গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন। ওই বর্ণনায় ‘বিদ্বেষী ও হত্যাকারী’ আল্লাহর এ ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হবে বলে উল্লিখিত হয়েছে। এ হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, এ রাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে সীমাহীন ক্ষমা ও রহমত অবতীর্ণ হয়।

২. হজরত আলী ইবন আবি তালিব রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেছেন, যখন মধ্য শাবানের রাত আসে তখন সে রাত তোমরা ইবাদতে কাটাও এবং সে দিনটিতে রোজা রাখ। কারণ সূর্যাস্তের পরপরই সে রাতে আল্লাহ তায়ালা প্রথম আকাশে অবতরণ করে বলতে থাকেন, কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছো কি, যাকে আমি ক্ষমা করব? কোনো রিজিকপ্রার্থী আছো কি, যাকে আমি রিজিক দান করব? কোনো বিপদগ্রস্ত আছ কি, যাকে আমি বিপদ থেকে উদ্ধার করব? এভাবে ফজর পর্যন্ত মানুষের প্রয়োজনের কথা বলে বলে আল্লাহর ঘোষণা অব্যাহত থাকে (সুনানে ইবন মাজাহ)।

৩. হজরত আয়েশা রা: থেকে বর্ণিত (এক দীর্ঘ হাদিসে), তিনি বলেন, এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ সা:-কে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তখন আমি তাকে খুঁজতে বের হয়ে দেখলাম যে, তিনি আকাশের দিকে দুই হাত তুলে দোয়া করছেন। আমাকে দেখে তিনি বললেন, আয়েশা তুমি কি মনে করেছ যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার ওপর জুলুম করেছেন? হজরত আয়েশা রা: বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি ধারণা করেছিলাম যে, আপনি আপনার অন্য কোনো স্ত্রীর কাছে গিয়েছেন। তখন রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, মধ্য শাবানের রাতে আল্লাহ তায়ালা প্রথম আকাশে অবতীর্ণ হন। অতঃপর বিশালসংখ্যক মানুষকে তিনি ক্ষমা করে দেন (তিরমিজি, মুসনাদে ইমাম আহমাদ)।

৪. হজরত আয়েশা রা:-এর অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, তিনি বলেন, একবার রাতে রাসূলুল্লাহ সা: নামাজে দাঁড়ালেন। অতঃপর তিনি এত দীর্ঘ সিজদা করলেন যে, আমার ধারণা হলো, তিনি বুঝি ইন্তেকাল করেছেন। ‘আমি তখন উঠে তার বৃদ্ধাঙ্গুলি ধরে নাড়া দিলাম। ফলে তার বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ে উঠল। তিনি নামাজ শেষ করে আমাকে বললেন, হে আয়েশা (অথবা তিনি বলেছিলেন হে হুমায়রা)! তোমার কি এ আশঙ্কা হয়েছে যে, আল্লাহর রাসূল তোমার হক নষ্ট করবেন? আমি বললাম, না, ইয়া রাসূলুল্লাহ আপনার দীর্ঘ সিজদা দেখে আমার আশঙ্কা হয়েছিল, আপনি বুঝি ইন্তেকাল করেছেন! নবী কারিম সা: বললেন, তুমি কি জানো এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন! রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, এটা হলো মধ্য শাবানের রাত। আল্লাহ তায়ালা মধ্য শাবানের রাতে তার বান্দার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেন। তাই তিনি ক্ষমাপ্রার্থীদের ক্ষমা করেন। দয়াপ্রার্থীদের প্রতি দয়া করেন এবং হিংসাবিদ্বেষ পোষণকারীদের তাদের অবস্থায় রেখে দেন (বায়হাকি, শুআবুল ঈমান)।

শেষের হাদিস দু’টির সনদে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও ফজিলত ও আমলের ক্ষেত্রে এ ধরনের জঈফ হাদিস গ্রহণযোগ্য বলে উলামায়ে কিরামের সর্বসম্মত মত। এসব হাদিসের আলোকে দেখা যায়, মধ্য শাবানের রাতটি অতিশয় মর্যাদাপূর্ণ।

তাই নেক আমলকারী আল্লাহর ক্ষমা ও জান্নাত লাভে প্রত্যাশী এবং প্রতিযোগী মাত্রেরই এ রাত জেগে ইবাদত করা উচিত। এজন্য সাহাবায়ে কিরাম ও সালাফে সালেহীনের বেশির ভাগই এ রাতের ইবাদতের প্রতি যত্নবান হতেন। তবে হজরত রাসূলে করিম সা: যেহেতু নিজ গৃহে একাকী ও নিরিবিলি অবস্থায় এ রাতে ইবাদত ও দোয়া-মুনাজাত করেছেন বলে হাদিস দ্বারা প্রমাণিত এবং সাহাবায়ে কিরামও তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে এ রাতের ফজিলত ও মর্যাদা লাভের চেষ্টা করেছেন তাই আমাদেরও যার যার ঘরে একাকী ও নিরিবিলি ইবাদতের মাধ্যমে রাতটি উদযাপন করা উচিত। দীর্ঘ রুকু সিজদা ও কিরাতসহকারে নামাজ আদায়, কুরআন তিলাওয়াত, তাসবিহ-তাহলিল, জিকির-আজকার, তওবা-ইস্তিগফার ও দোয়া-মুনাজাতের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা লাভের চেষ্টা করা উচিত। হৈ-হুল্লোড় করা, দলবদ্ধভাবে কবর জিয়ারত করা, আতশবাজি, আলোকসজ্জার কোনোটিই কাম্য নয়। মসজিদের মাইকে দলবদ্ধভাবে জিকির করা থেকেও বিরত থাকা উচিত। কারণ একদিকে তা যেমন সুন্নাতের খেলাফ অন্য দিকে তেমনি তার ফলে বাসায় ইবাদতরত ব্যক্তিদের ইবাদতে এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের বিশ্রামের ব্যাঘাত ঘটবে, যা শরিয়াতে সম্পর্ণরূপে হারাম।

নফল ইবাদত করতে গিয়ে হারামের গুনাহ করে ফেলা কারো কাম্য হতে পারে না।
দীর্ঘ নামাজ আদায় বা তিলাওয়াত করতে গিয়ে ঘুম এসে গেলে এবং ঘুমের প্রাবল্য দেখা দিলে হাদিসের নির্দেশ অনুযায়ী কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে চাঙ্গা হয়ে নেয়া উচিত, যাতে গভীর মনোনিবেশসহকারে আল্লাহর ইবাদত করা যায়। অনেক বাংলা অজিফা গ্রন্থে আছে, এত রাকাত নামাজ পড়তে হবে। প্রতি রাকায়াত এতবার সূরা ইখলাস দিয়ে পড়তে হবে এসবের কোনো ভিত্তি নেই। এ মহান রাতে আল্লাহর বিশেষ রহমত ও ক্ষমা লাভের জন্য সর্বাত্বক প্রস্তুতি গ্রহণ করা এবং সব গুনাহ ও নাফরমানিমূলক কাজ পরিত্যাগ করার মাধ্যমে ওই রাতের ফজিলত ও মাহাকার্য লাভে সচেষ্ট হওয়া প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য।
লেখক : প্রবন্ধকার

সোনালীনিউজ/ঢাকা/আকন

সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩