রবিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩

সরকারি চাকরিতে এখনো পিছিয়ে নারী

আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৩:৫৬ পিএম

সরকারি চাকরিতে এখনো পিছিয়ে নারী

বিশেষ প্রতিনিধি

সরকারি চাকরিতে বর্তমানে নারীর হার ২৬ শতাংশ। নারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত হারে প্রশাসনের নীতি-নির্ধারণী স্তরে আসতে পারছেন না নারীরা। সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী স্তরে নারীর ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান ও গবেষণা সেলের ২০১৪ সালের প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রশাসনে নারীদের সংখ্যা ৩ লাখ ৭০ হাজার ৫৮১ জন। এ সময়ে মোট সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সংখ্যা ১৩ লাখ ৭৫ হাজার ৪৩৮ জন। নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হার ২৬ শতাংশ। এর আগের বছরের তুলনায় এ হার ২ শতাংশ বেশি।

২০১৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৪৪৯ জন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৮৮ হাজার ৮০৪ জন। নারীদের হার ছিল ২৪ শতাংশ।

প্রশাসনের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী পদ হচ্ছে সচিব। বর্তমানে প্রশাসনে সচিব রয়েছেন ৭৫ জন। এর মধ্যে মহিলা সচিব ৬ জন ও পুরুষ ৬৯ জন। নারীদের হার মাত্র ৮ শতাংশ। কাঙ্ক্ষিত হারে সচিব হিসেবে পদোন্নতি পাচ্ছেন না নারীরা।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে সরকারের ৩০৯টি অতিরিক্ত সচিবের পদের মধ্যে নারী ৫৬ জন (১৮ দশমিক ১২ শতাংশ), ৮৯৩ যুগ্ম সচিবের মধ্যে নারী ১০৬ জন (১১ দশমিক ৮৭ শতাংশ), এক হাজার ২৯৯ উপ-সচিবের মধ্যে নারী ১৮৬ জন (১৪ দশমিক ৩১ শতাংশ), এক হাজার ৩৯১ জন সিনিয়র সহকারী সচিবের মধ্যে নারী ৩১৫ জন (২২ দশমিক ৬৪ শতাংশ) ও এক হাজার ৪০৫ জন সহকারী সচিবের মধ্যে নারী ৪২২ জন (৩০ দশমিক ০৩ শতাংশ)।

বিসিএস উইমেন নেটওয়ার্কের সদস্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ফরিদা নাসরিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘নারী কর্মকর্তারা যে হারে সিভিল সার্ভিসের যোগদান করছেন সে হারে পুরুষের তুলনায় নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে পদোন্নতি পাচ্ছেন না। সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্র্রে ১০ শতাংশেরও কম নারী নিয়োজিত আছে। সিভিল সার্ভিসে যে সংখ্যায় নারীরা কর্মরত আছেন সে সংখ্যার হারে সর্বোচ্চ পর্যায়ে অর্থাৎ যুগ্ম সচিব থেকে সচিব পদ পর্যন্ত অন্তত ২০ শতাংশ পদ নারী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পূরণের প্রাপ্যতা ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে। পদায়নের এ অসমতা ভবিষ্যতে নারীর ক্ষমতায়ন সিদ্ধান্ত প্রদান স্তরে নারী পুরুষের অসমতা এসডিজি (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) অর্জন উল্লেখযোগ্য হারে পিছিয়ে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সচিব পর্যায়ে ২০১৬ সালে ২১ জন অবসরে যাবেন। এদের মধ্যে ২০ জন পুরুষ ও একজন নারী, ২০১৭ সালে ১৩ জন পুরুষ ৩ জন নারী, ২০১৮ সালে ১৫ জন পুরুষ ও একজন নারী, ২০১৯ সালে ১০ জন পুরুষ একজন নারী অবসরে যাবে। নতুন করে কোনো নারী সচিব নিয়োগ দেয়া না হলে ২০১৯ সাল থেকে প্রশাসনের সচিব পর্যায় নারী শূন্য হয়ে পড়বে। সিভিল সার্ভিসের সর্বোচ্চ পর্যায় নারী শূন্য হয়ে পড়লে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে অসম পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। যা কোনো ক্রমেই কাম্য নয়।’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, সচিব পদে প্রথম নারী নিয়োগ দেয়া হয় ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বর মাসে। এরপর ১৯৯৯ সালে একজন, ২০০৩ সালে একজন, ২০০৭ সালে একজন, ২০০৯ সালে একজন, ২০১০ সালে একজন, ২০১১ সালে ২ জন নারীকে সচিব করা হয়। ২০১২ ও ২১৩ সালে কোনো নারী সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়নি। পরে ২০১৪ সালে দুইজন, ২০১৫ সালে তিনজন ও ২০১৬ সালে (ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) একজন নারী কর্মকর্তাকে সচিব পদে পদোন্নতি দেয়া হয়।

প্রশাসনে নারীদের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে আগের তুলনায় অনেক বেশি নারীরা আসছেন, সরকারি চাকরির অন্যান্য পর্যায়েও নারীদের নিচ্ছি আমরা। এখন কোটা থেকে অনেক বেশি নারীরা সরকারি চাকরিতে আসছেন।’

প্রশাসনিক সর্বোচ্চ পদে নারীদের পদায়নের পিছিয়ে থাকার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘অনেকগুলো কোয়ালিটি বিবেচনা করে সচিব পদে পদায়ন করা হয়। সেই বিবেচনায় হয়তো সব সময় নারীদের সচিব করা যায় না। যোগ্যতার ভিত্তিতে অনেকে আসছেন। আমাদের পাইপলাইনে আছে, আরও কয়েকজন নারীকে আমরা সচিব পদে পদায়ন করব।’

‘প্রশাসনে নারীদের ক্ষমতায়নে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক। আমরা চাই আরও বেশি নারীরা প্রশাসনে আসুক। এছাড়া নারীদের ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনেরও প্রয়োজন রয়েছে। পেশাগত ক্ষেত্রে নারীকে সহজভাবে গ্রহণ করে নেয়ার মানসিকতার অভাব রয়েছে,’ বলেন ইসমাত আরা।

২০১৪ সালের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিসংখ্যান গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নারীদের মধ্যে প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কর্মরত রয়েছেন ২৩ হাজার ৬৩৭ জন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৫৩ হাজার ৪১ জন। এছাড়া সবচেয়ে বেশি নারী রয়েছে তৃতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৮১২ জন। চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে নারীদের সংখ্যা ৪৭ হাজার ৯১ জন।

নারীদের মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মরত রয়েছেন মাত্র এক হাজার ৭৯৫ জন। সবেচেয়ে বেশি নারীরা কর্মরত রয়েছেন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীনস্ত বিভিন্ন সংস্থা ও অধিদপ্তরের। সংস্থা ও অধিদপ্তরগুলোতে ৩ লাখ ৪৪ হাজার ৩৯ জন নারী কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন সংস্থা ও করপোরেশনে কর্মরত নারীর সংখ্যা ২৪ হাজার ৭৪৭ জন।

বর্তমানে দেশের মোট ভোটারের ৪৯ শতাংশ নারী। ২০১৪ সালের দেশের মোট ভোটারের সংখ্যা ৯ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার ১৮ জন। এরমধ্যে নারী ভোটার ৪ কোটি ৭৬ লাখ ৯০ হাজার ৯৬৬ জন।

বিসিএস উইমেন নেটওয়ার্কের তথ্যানুযায়ী, ১৯৮২ সালে প্রথম সিভিল সার্ভিসের প্রশাসন ক্যাডারে নারী কর্মকর্তা নিয়োগ পান। পরে পদোন্নতির মাধ্যমে ১৯৯৬ সালে প্রথম ৪ জন নারী কর্মকর্তাকে জেলা প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়।

১৯৭৪ সালে ১৪ জন নারী পুলিশ নিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে মহিলা পুলিশের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৮৬ সালে ক্যাডার সার্ভিসে প্রথম নারী পুলিশ নিয়োগ করা হয়। বাংলাদেশে মোট পুলিশের পুলিশের সংখ্যা এক লাখ ৫৫ হাজার ৮০৯ জন, এরমধ্যে নারী ৮ হাজার ৮২৪ জন বলেও জানিয়েছে উইমেন নেটওয়ার্ক।

বর্তমানে এডিশনাল আইজিপি পদে একজন, এডিশনাল পুলিশ সুপার ৬৬ জন, সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার ৭ জন ও সহকারী পুলিশ সুপার ১৫৯ জন নারী রয়েছেন। ২০০০ সালে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নারী পুলিশের যাত্রা শুরু হয়।

বাংলাদেশে প্রথম টেস্টটিউব শিশু জন্মের সাফল্যের মূলে রয়েছেন নারী চিকিৎসক ডা. পারভীন ফাতিমা। বর্তমানে বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে মোট নারী ডাক্তার ৭ হাজার ৩৪০ জন।

সোনালীনিউজ/এমএইউ

add-sm
Sonali Tissue
রবিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩