রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩

সে অন্য কারো হয়ে যাচ্ছে

রিপনচন্দ্র মল্লিক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৪:০১ পিএম

সে অন্য কারো হয়ে যাচ্ছে

আমি কি কোনো ভুল করেছি? নাকি করিনি?
যদি ভুল না-ই করে থাকি, তবে এমন হলো কেন? এমন তো কখনো হওয়ার কথা ছিল না। হঠাৎ করে যে এমন একটি কান্ড ঘটিয়ে ফেলব আমি তা কখনো আমার মাথায় ছিল না। ইচ্ছে ছিল, ওকে প্রচন্ড রকমের কষ্ট দেব, এমন ভাবে দেবো যেন কখনো আর সে এমন কাজ না করে। কিন্তু এ আমি কী করে বসেছি। আমার যে কিছুই মাথায় আসছে না।

আমি জানি, রানা আমাকে অনেক ভালোবাসে, সেটা সে নানা রকমভাবে প্রকাশ করার চেষ্টা করত। তবে এসব পাগলামী কখনো কখনো আমার ভালো লাগত না। কেন ভালো লাগত না, সেটা আমি বুঝতে পারিনি, অথবা বুঝতে চেষ্টা করার আগ্রহ হয়নি। আরে বাবা, ভালোবাসা কি এখানে-সেখানে যখন যেখানে দেখাতে হবে?
আমি খুব রক্ষণশীল মেয়ে। আমাদের পরিবার পুরোই রক্ষণশীল। যদিও আমি অনেক ফাঁকি দিয়ে রানার জন্য পরিবারিক প্র্রথা ভেঙে ফেলেছি। না ভেঙে পারিনি। এই যেমন হঠাৎ করে ফোন করে বলবে, ‘রুনা, আমি সংসদ ভবনের পেছনে যাচ্ছি, তুমি চলে আসো।’

আমি বলি, ‘আমি এখন যেতে পারব না। আমার হাতে অনেক কাজ।’ তাহলে খুব রেগে যেত। আমি ওকে রাগানোর জন্য ইচ্ছে করেই একথা বলতাম। ওপাশ থেকে বলে উঠত, ‘আমি সেকেন্ড মেপে মেপে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত থাকব, এরপর যদি তোমার ছায়া আমার ছায়ার পাশে এসে না দাঁড়ায়, তাহলে কিন্তু...।’ আমি আর কথা বাড়াতে দিতে চাইতাম না। আমি জানি ‘ও’ আমাকে না দেখলে ছটফট করতে থাকবে। শেষে কী থেকে কী করে ফেলে! কখনো কখনো ‘ওর’ এমন ডাকে অন্ধের মতো চলে এসেছি। তবে কি আমিও আস্তে আস্তে পাগলের মতোই ভালোবেসে ফেলেছিলাম। কী জানি, হয়তো তা-ই হবে।

আমি রানার মোহে অন্ধ ছিলাম। একসময় পেছনে ফিরে দেখি, আমি ‘ওর’ কাছে নিজের সমস্ত কিছু বিলিয়ে দিয়েছি। রানার কাছে নিজেকে লুকিয়ে রাখার মতো আর কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই।

দুই বছর ধরে আমার সঙ্গে পরিচয়। যে বছর কোটালীপাড়া থেকে ইডেন কলেজে ভর্তি হতে এসেছিলাম, সে বছরই পরিচয় হয়। ঢাকা কলেজ থেকে এবার ওর মাস্টার্স পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল।

আমি ‘ওর’ মোহগ্রস্ততায় অন্ধ ছিলাম। শীলাই আমার অন্ধ চোখ মেলে দিয়েছে। শীলা আমার বান্ধবী। হোস্টেলে একই রুমে থাকি। আমি তো শুরুতে শীলার কোনো কথা পাত্তাই দিতে চাইনি। কিন্তু মনের মধ্যে তবুও শীলার কথাগুলো বড়শির মতো বিঁধে ছিল। শীলার কথাগুলো নিজের চোখে দেখতে একদিন পিছু নিলাম।
আমি দেখলাম, রানা সুমনাকে নিয়ে ট্যাক্সিতে করে কোথায় যেন যাচ্ছে। সুমনাকে নিয়ে ‘ওর’ তো কোথাও যাওয়ার কথা নয়। আমার আর কোনো কিছু বোঝার বাকি রইল না।

আমি সরলরেখার মতো বুঝতে পারলাম, এই শহরে কেবল আমিই ভালোবাসি না। আমি ছাড়াও তাকে ভালোবাসার আরো মানুষ আছে। আমি বুঝতে পারছি, রানার কাছে আমার যেমন লুকিয়ে রাখার মতো কোনো কিছু অবশিষ্ট নেই, হয়তো এত দিনে আমার মতো সুমনারও লুকিয়ে রাখার কোনো কিছু বাকি রাখেনি।

সেদিন স্পষ্ট ভাবেই বুঝতে পারলাম,‘শীলা আমাকে একটুকুও মিথ্যে কথা বলেনি। ‘ও’ শুধু আমাকেই ভালোবাসে না। সে আমার মতো আরো অনেককেই ভালোবাসে।’ হুট করে মাথায় একটা জেদ চেপে বসল। নিজেকে নিজেই সাক্ষী রেখে প্রতিজ্ঞাই করে বসলাম, যেভাবেই হোক রানাকে একটা উচিত শিক্ষা দিতে হবে। কিন্তু সেটা যে এরকম হয়ে যাবে, সেটা কখনো ভাবিনি। হঠাৎ করে কী থেকে যে কী হয়ে গেল। মাথায় প্রচন্ড আগুন জ্বলে ছিল। এমন দাউ দাউ রাগের আগুন আমার মাথায় আর কোনোদিন ওঠেনি।

রাতে ফোনে বললাম,‘কত দিন হলো তোমার ফ্ল্যাটে আসি না। সকালে এসে সারা দিন তোমার ফ্ল্যাটে থাকবো।’

‘খুব ভালো কথা। তাহলে সকালেই আমি বাজার করে নিয়ে আসব। তুমি রান্না করে খাওয়াবে। স্বামীকে যেমন স্ত্রী আদর করে খাওয়ায় তুমিও আমাকে খাওয়াবে।’
‘ঠিক আছে শুধু রান্না করেই খাওয়াব। আর কোনো কিছু খেতে চেয়ো না।’

‘না, না, বাবা, থাক। তোমার রান্না করতে হবে না। হোটেল থেকেই সবকিছু নিয়ে আসব। তুমি আমাকে অন্য কিছুই খাইয়ে যেয়ো।’

আজ পরিকল্পনা করেই ‘ওর’ রুমে এসেছি। ওকে কঠিন করে শাস্তি দেওয়ার জন্য। চিন্তা ছিল, এমন শাস্তি দেব, যেন আর কোনো দিন আমাকে ছাড়া অন্য কোনো মেয়েকে ভালোবাসতে না পারে। রানা অন্য কারো হয়ে যাচ্ছে, এ আমার সহ্য হচ্ছিল না।

উহ্। ভাবতেই পারছি না কী কান্ডই না ঘটে গেল। পুরো ঘরটা আধো আঁধার আধো আলোময়। রানা যখনই আমার বুকে হাত দিতে লাগলো, আমি ‘ওর’ অলক্ষ্যে ছুরিটা গলায় বসিয়ে দিলাম। এরপর এলোপাথারি ভাবে পাগলের মতো কুপিয়ে কুপিয়ে বুকের ভেতরের দাউ দাউ করে জ্বলা আগুন নিভিয়ে দিলাম।

আমার সামনে রানার নিথর দেহ পড়ে আছে। এখন ‘ওর’ জন্য খুব কষ্ট লাগছে। আমাকে হয়তো ভালোবাসত না। কিন্তু আমি যে ওকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসতাম।

রানাকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলায় বুকটা ভীষণ ভারী হয়ে উঠছে। এভাবে ওকে হারিয়ে ফেলতে তো চাইনি। আমি এখন কী করবো বুঝতে পারছি না। ‘ওর’ শূন্যতায় বুক ভেঙ্গে কান্না আসছে কিন্তু আমি যে কাঁদতে পারছি না। কেবলই স্তব্দ হয়ে যাচ্ছি।

সোনালীনিউজ/ঢাকা/আকন

add-sm
Sonali Tissue
রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩