শুক্রবার, ০৯ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩

স্ফীত রিজার্ভ কি দেশের জন্য মঙ্গলজনক

আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৪:০৫ পিএম

স্ফীত রিজার্ভ কি দেশের জন্য মঙ্গলজনক

বর্তমান স্ফীত রিজার্ভ কি দেশের জন্য মঙ্গলজনক নাকি উদ্বেগজনক? যে কোনো জিনিষেরই দু’টি দিক থাকে। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভেরও বিপরীতমুখি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কোনো দেশের রিজার্ভ যদি পর্যাপ্ত না হয় তাহলে দেশটিকে বিপাকে পড়তে হয়। কারণ সেই অবস্থায় দেশটি তার বৈদেশিক মুদ্রা স্বল্পতার কারণে অনেক পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করতে পারবে না। আবার অকারণে স্ফীত বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ একটি দেশের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। বিনিয়োগবিহীন স্ফীত বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ একটি দেশের জন্য সব সময় কল্যাণকর নাও হতে পারে।
বাংলাদেশে বর্তমানে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এক ধরনের স্থবিরতা বা বন্ধ্যাত্ব বিরাজ করছে। নানাভাবে চেষ্টা করেও সরকার বিনিয়োগ বাড়াতে পারছে না। অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন, দেশের বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ বিরাজমান নেই। এ জন্য তারা মূলত রাজনৈতিক অবস্থাকে দায়ি করেন। তারা বলছেন, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নেই সত্যি কিন্তু এক ধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজমান রয়েছে। কোনো অনিশ্চিত পরিবেশে কোনো বিনিয়োগকারি বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে না। কারণ বিনিয়োগের বিষয়টি দীর্ঘ মেয়াদি একটি প্রক্রিয়া। হুট করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত কেউ নিতে পারে না। বিদেশি বিনিয়োগকারিরা তো নয়ই। বাংলাদেশের বেশির ভাগ শিল্প-কারখানা স্থাপিত হয় আমদানিকৃত মেশিনারি দিয়ে। এ ছাড়া কাঁচামালের বেশির ভাগই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যদি গতিশীলতা অব্যাহত থাকতো তাহলে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের একটি বড় অংশ তাতে ব্যবহৃত হতো। সে অবস্থায় রিজার্ভ এতটা স্ফীত হতে পারতো না। পুঁজির চাহিদা বৃদ্ধি না পারার কারণে বিনিয়োগ আশানুরূপ বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এই রিজার্ভ  লাভজনক খাতে ব্যবহার করতে না পারাটা আমাদের বড় ব্যর্থতা।

অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন, একটি দেশের জন্য সর্বোচ্চ বিনিয়োগ এবং স্ফীত রিজার্ভ হচ্ছে অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে কাঙ্খিত অবস্থার নির্দেশক। এমন কি স্বল্প রিজার্ভ এবং উচ্চ বিনিয়োগও কাম্য হতে পারে। কিন্তু বিনিয়োগবিহীন স্ফীত রিজার্ভ কোনো ভাবেই কাম্য হতে পারে না। কারণ এটা স্থবিরতারই লক্ষন। বাংলাদেশে বর্তমানে যে অবস্থা চলছে তাকে কিছুটা হলেও স্থবিরতাই বলা যেতে পারে। আমরা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করনি কিন্তু তা সঠিকভাবে এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারছি না। এভাবে বিনিয়োগবিহীন স্ফীত রিজার্ভ এক সময় আমাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ মনে করেন, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ বিনিয়োগে নিয়ে আসার জন্য সরকারের তেমন কিছু করণীয় নেই। কিন্তু এই মতের সঙ্গে শর্তহীনভাবে একমত হবার কোনো অবকাশ আছে বলে মনে হয় না। কারণ সরকার হয়তো সরাসরি এই রিজার্ভ বিনিয়োগে নিয়ে আসতে পারবে না কিন্তু স্থানীয় বেনিফিসিয়ারিদের বিনিয়াগে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন।

তৃণমূল পর্যায়ে বিনিয়োগের উপযোগি পরিবেশ গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় বেনিফিসিয়ারিরা সেখানে বিনিয়োগ করতে পারেন। স্থানীয় বেনিফিসিয়ারিরা যদি বিনিয়োগ করে তাহলে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ আপনা আপনিই কমে আসতো। কারণ তারা ক্যাপিটাল মেশিনারি এবং কাঁচামাল আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার করতো। নিশ্চিত লাভের সুযোগ পেলে যে কোনো মানুষই বিনিয়োগে আগ্রহী হবে এতে কেনো সন্দেহ নেই। স্থানীয়ভাবে বিনিয়োগ বাড়ানো জন্য শুধু চেষ্টা করলেই হবে না এ জন্য বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। আমাদের দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, জ্বালানির অভাব।

এ ছাড়া রয়েছে ভৌত অবকাঠামোর অভাব। ইদানিং আবার শিল্প-কারখানা স্থাপনের জন্য উপযোগি জমি পাওয়া যাচ্ছে না। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আর্থিক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারির ব্যাপক ভিত্তিক দুর্নীতি। এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু হয়েছে। কেউ অর্থিক দুর্নীতি করলেও তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। দুর্নীতিবাজরাই হচ্ছে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরো কিছু পন্থা খুঁজে বের করা যেতে পারে। বিশেষ করে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অন্য দেশে বিনিয়োগের জন্য উৎসাহিত করা যেতে পারে। কোনো কোনো উদ্যোক্তাকে বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ দেবার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় উদ্যোক্তারা যদি বিদেশে বিনিয়োগ করেন তা হলে অকারণ বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্ফীতি কিছুটা হলেও কমে আসবে।

এ ছাড়া যে সব দেশ বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ স্বল্পতা বা সঙ্কটে ভুগছে তাদের বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে সহায়তা  করা যায় কিনা সেটাও ভেবে দেখা যেতে পারে। যদি অর্থনৈতিক দিক থেকে ঝুঁকির আশঙ্কা না থাকে তা হলে নির্দিষ্ট সুদ প্রদানের শর্তে বৈদেশিক মুদ্রা স্বল্পতায় ভুগতে থাকা দেশগুলোকে বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে সহায়তা করা যেতে পারে। কিন্তু কোনোভাবেই বৈদেশিক মুদ্রা অলসভাবে ফেলে রাখা ঠিক নয়। স্ফীত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের জন্য এখনই উদ্যোগ নিতে হবে।

সোনালীনিউজ/ঢাকা

add-sm
Sonali Tissue
শুক্রবার, ০৯ ডিসেম্বর, ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩