শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩

‘পুলিশকে বাঁচাতেই মাদকব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মাম

আপডেট: ১৬ জুন ২০১৬, বৃহস্পতিবার ০৩:৫৩ পিএম

‘পুলিশকে বাঁচাতেই মাদকব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মাম

নিজস্ব প্রতিবেদক

চাঁদার দাবিতে পুড়িয়ে দেওয়া বাবুল মাতব্বর (৪৫) ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে মারা যান
শাহআলীতে চা দোকানি বাবুল মাতুব্বর (৫০) হত্যার পেছনে পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে মামলা নেয়নি থানা। বরং নিহতের বড়মেয়ে রোকসানার কাছ থেকে তাড়াহুড়ো করে একটি স্বাক্ষর নিয়ে পুলিশ স্থানীয় মাদকব্যবসায়ী পারুল বেগমসহ ছয়জনকে আসামি একটি মামলা করেছে বলে দাবি করেছেন নিহতের স্বজনরা। অথচ, চার পুলিশ সদস্যকে টাকা না দেওয়ার কারণে গায়ে আগুন দিয়ে চা দোকানিকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছেন নিহতের স্বজনরা।  তবে, পুলিশ চাঁদাবাজির  অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে শাহআলী থানার পুলিশ বাবুল মাতুব্বরের বাসায় গিয়ে রোকসানার কাছ থেকে একটি এজাহারে স্বাক্ষর আনে বলে রোকসানা অভিযোগ করেছেন।
এদিকে এঘটয় দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া, ৪ পুলিশ কর্মকর্তাকে ক্লোজড করা হয়েছে।

রোকসানা বলেন, পুলিশ রাতের বেলা চাঁদা চাইল। চাঁদা না দিলে থানায় নিয়ে যাবে—এই ভয় দেখালো। এ সময় পুলিশের এক এসআইসহ আরও কয়েকজন ছিল। তারা সাদা মাইক্রোবাস নিয়ে আসছিল। পুলিশের সোর্স দেলোয়ার ও রবিন ছিল। পুলিশ কার বিরুদ্ধে মামলা করছে আমরা জানি না। তারা পুলিশের বিরুদ্ধে কোনও মামলা নিবে না বলে জানিয়েছে। মাদকব্যবসায়ী পারুল তো পুলিশেরই লোক। তিনি বলেন, পুলিশ ভয় দেখিয়ে নিজেদের নামে কোনও মামলা নেয়নি। আমরা আবার মামলা করব। এই মামলা মানি না।

তবে শাহআলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একেএম শাহীন মণ্ডল এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এই ঘটনা ঘটেছে। তাদের একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেফতার করার চেষ্টা চলছে।

বুধবার রাতে রাজধানীর মিরপুর গুদারাঘাট এলাকায় চাঁদার দাবিতে পুড়িয়ে দেওয়া বাবুল মাতব্বর (৪৫) ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার দুপুর ১ টা ৪০ মিনিটে মারা যান।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে নিহতের বড়ছেলের রাজুর স্ত্রী বলেন, বুধবার দুপুরে সাদা মাইক্রোবাসে চার পুলিশ এসে আমার শ্বশুরকে টেনে গাড়িতে তুলতে চান। তারা টাকা চান। পুলিশ এ সময় আমার শ্বশুরকে বলে, তুমি অবৈধ জায়গায় দোকান করো। টাকা দেও, তা না হলে থানায় নিয়ে যাব। এ সময় আমরা ও শাশুড়ি পুলিশের হাত-পা ধরে শ্বশুরকে রেখে দেন। তখন পুলিশের তিনসোর্সও তাদের সঙ্গে ছিলেন। তারা হলেন, আয়ুব আলী, দেলোয়ার ও রবিন। তারা দুপুরে কিছুক্ষণ টানা-হেঁচড়া করে চলে যান। এরপর রাতে আবার আসেন। আমার শ্বশুরের কাছে টাকা চান। শ্বশুর টাকা দিতে অস্বীকার করলে দেলোয়ার কেরোসিনের চুলায় লাঠি দিয়ে বাড়ি দেন।  এতে তার গায়ে আগুন লাগে। তখন আমার শ্বশুর দেলোয়ারকে বলেন,  কিরে দেলোয়ার তুই আমার গায়ে আগুন দিয়ে দিলি? এ সময় দেলোয়ার আমার শ্বশুরকে বলেন, এটা দুর্ঘটনা। আমার কথা বলবি না। এরপর তাকে দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালের দিকে নিয়ে আসি। এ সময় তিনি গাড়িতে বসে পুলিশের ও পুলিশ সোর্সের নাম বলেন।

নিহত চা দোকানির পুত্রবধূ বলেন, পুলিশ প্রতিদিন চাঁদার জন্য আসে। সকালে না আসলে দুপুরে, দুপুরে না আসলে বিকালে। তা না হলে রাতে। একবার না একবার আসবেই। মাদকব্যবসায়ী পারুলের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক আছে। পারুল যখনই পুলিশকে উস্কে দেন, তখনই পুলিশ চাঁদা চাইতে আসে। তিনি বলেন, দুই বছর আগে ৯০ কেজি গাঁজাসহ পারুলকে আমরা শ্বশুর একবার ধরিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর থেকেই পারুল আমাদের ওপর ক্ষ্যাপা। আমার শ্বশুরকে মিথ্যা মামলায় জেলও খাটাইছে সে।

প্রত্যক্ষদর্শী মনিরুজ্জামান বলেন, আমি চা খাচ্ছিলাম বাবুলের দোকানে। ওই সময়ই একটি সাদা মাইক্রোবাস এসে থামে তার দোকানের সামনে। গাড়ি থেকে পুলিশের সোর্স দেলোয়ার ও আইয়ুব নেমে আসে। গাড়িতে ছিলেন শাহ আলী থানার এসআই রবিনসহ তিন পুলিশ। সোর্স দেলোয়ার তাকে বলে, সারাদিন যা বিক্রি করছস, তা দিয়া বাসায় চইল্যা যা। বাবুল টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে, তারা তাকে থানায় যাইতে বলে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে তারা দুজন বাবুলকে টেনে দোকান থেকে বের করার চেষ্টা করেন। এ সময় দেলোয়ার লাঠি দিয়ে চুলা ঠেলে বাবুরের গায়ে দেন। তার শরীরে আগুন ধরে যান। সে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি শুরু করে। তারপর রাস্তায় গড়াগড়ি দিতে থাকে। এই অবস্থা দেখে পুলিশের দুই সোর্স দৌড়ে পালিয়ে যান। সাদা রঙের গাড়িটিও দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পরে বাবুলের গায়ে পানি দিয়ে আগুন নিভিয়ে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

মিরপুর গুদারাঘাট এলাকায় কিংশুক সিটির গেইটের বাম পাশেই ছিল বাবুলের চায়ের দোকান। ছয়মাস ধরে তিনি সেখানে চা বিক্রি করছিলেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট চায়ের দোকানটি এলোমেলো। দোকানের সামনের দিকে একটি ছোট্ট টেবিল। ওই টেবিলেই ছিল চুলাটি।  অন্য জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। পুড়ে যাওয়া জ্যাকেটের বিভিন্ন টুকরা রাস্তায় পড়ে রয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী মনিরুজ্জামান টেবিলটি দেখিয়ে বলেন, তেলের চুলাটি ওখানেই ছিল। আমি বসা ছিলাম ভেতরের দিকে। বাবুলের সঙ্গে ঝগড়ার সময় আমি বাইরে বেরিয়ে যাই। এদিকে, বৃহস্পতিবার দুপুরে বাবুলের মৃত্যুর খবর শুনে এলাকাবাসী গুদারাঘাট কিংশুক সিটির সামনের রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। তারা পুলিশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন। এ ঘটনায় জড়িতদের বিচার দাবি করেন।

স্থানীয়রা জানায়, বাবুলের দুই ছেলে তিন মেয়ে। বড় ছেলে রাজু মাতুব্বর অটোচালক ও ছোট ছেলে জুনায়েদ মাতুব্বরের বয়স তিন বছর। তিন মেয়ে রোকসানা আক্তার, মনি আক্তার ও লাবনী। তাদের মধ্যে  কয়েক বছর আগে দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বাবুল তার অন্তঃস্বত্ত্বা স্ত্রী লাকীকে নিয়ে কিংশুক সিটির পাশের বস্তিতে থাকেন। এই এলাকাতে তারা ১০ বছর ধরে বসবাস করছেন। আগে তিনি মাদক ব্যবসা করলেও এখন ছেড়ে দিয়েছেন। মাদক ব্যবসা করার কারণে পুলিশ বিভিন্ন সময় তাকে হয়রানি করত। তাদের গ্রামের বাড়ি ভোলায়।

বাবুলের প্রতিবেশী আনোয়ার হোসেন বলেন, সোর্স দেলোয়ারকে সবাই পুলিশ হিসেবেই জানে। সবসময় শাহ আলী থানা পুলিশের সঙ্গেই থাকে। হামলার পরই সবাই জানলেন,  দেলোয়ার পুলিশের সোর্স। ওই সবসময় নিজেকে পুলিশ দাবি করতেন।

এদিকে, পুলিশের চাঁদাবাজির তীব্র সমালোচনা করেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, পুলিশকে পয়সা না দেওয়ায় আজ একজন মানুষকে মরতে হলো। এটা পুলিশের বাড়াবাড়ি। আমি এর নিন্দা জানাই। এটা এখনই বন্ধ হওয়া উচিত। এর সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করার অনুরোধ জানাচ্ছি।

মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা : শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম শাহীন মণ্ডল বলেন, পুলিশ এ ঘটনায় জড়িত নয়। আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে, আমরা মামলা নিয়েছি। মামলার এক নম্বর আসামি পারুলকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মামলার অন্য আসামিরা হলেন, দেলোয়ার, আইয়ুব আলি, দুলাল হাওলাদার, মো. রবিন, শংকর ও পারভিন।

 সোনালীনিউজ/এমটিআই

add-sm
Sonali Tissue
শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, ১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩