শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২০, ২৭ আষাঢ় ১৪২৭

অতি সচেতনতা মানবিক বিপর্যয়ের কারণ

এম. সোলায়মান | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৪ জুন ২০২০, বুধবার ০৩:২৪ পিএম

অতি সচেতনতা মানবিক বিপর্যয়ের কারণ

ঢাকা : বর্তমানে আমরা এক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। অদৃশ্য এক জীবানু আমাদের স্বাভাবিক জীবনকে এলোমেলো করে দিয়েছে। সামনে কবে নাগাদ আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবো তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। যত দিন যাচ্ছে ততই মৃত্যুপুরীতে রূপ নিচ্ছে বাংলাদেশ। করোনা চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৫০ জনের মত মারা যাচ্ছে। এ ছাড়া সারাদেশে উপসর্গ নিয়ে আরও অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। এই ভাইরাস আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে, জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত। যেকোনো সময় জীবনের সমাপ্তি ঘটতে পারে। এই ভাইরাস থেকে বাঁচতে প্রথম এবং প্রধান কাজ হল সামাজিক দূরত্ব, মাস্ক ব্যবহার আর ব্যক্তিগত পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা। কিন্তু; দু:খের বিষয় সচেতনতার নামে কিছু মানুষের অতি সচেতনতা মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনছে।

প্রতিনিয়ত আমাদের চোখের সামনে এমন কিছু ঘটনা ঘটছে যা আগে এমনটা কল্পনাও করিনি। এই করোনা নামক মহামারি ভাইরাস আমাদের অনেক রকমের মানুষকে চিনিয়ে দিয়েছে। অতি সচেতনতায় মানুষ তার বিবেকবোধকে বলি দিচ্ছে। কিছু ঘটনা উল্লেখ করছি-

এইতো সেদিন করোনায় আক্রান্ত সন্দেহে এক প্রতিবন্ধী মহিলাকে পরিবারের সদস্যরা খেতের ঝুপড়ির মধ্যে অনাহারে রেখে দিয়েছিল! আপন মাকে করোনা সন্দেহে ছেলেরা জঙ্গলে ফেলে দেয়, নিজেরা ভাল থাকতে! বিভিন্ন হাসপাতালে লাশ রেখে পালিয়ে যেতে দেখেছি স্বজনদের! রাতের গভীরে নাম পরিচয়হীন লাশ রাস্তায় পড়ে থাকছে কেউ ধারে কাছে যাচ্ছে না! জানাজায় বা দাফনে আপনজন কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না! করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়ার ফলে মসজিদের খাট দেননি এলাকার মানুষ। অন্যদিকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগি সন্দেহে ভাড়া বাড়ি থেকে অসুস্থ মানুষকে বের করে দেয়ার ঘটনাও আমরা দেখেছি! করোনা আক্রান্ত হয়েছে এমন খবর শুনলে কিছু প্রতিবেশী করছে অমানবিক আচরণ, অত্যাচার, ঘৃণা। এই তো সেদিন এক স্বাস্থ্যকর্মীর বাসায় সারা রাত ঢিল ছুড়ে পরিবারসহ তাঁকে এলাকা ছাড়ানোর চেস্টা করা হয়েছিল। এছাড়াও অনেক অজানা ঘটনা রয়ে গেছে আমাদের চোখের আড়ালে।  

খেয়াল করুন- যখন করোনাভাইরাসে সংক্রমনের খবর প্রথম বাংলাদেশে ছড়ায় তখন দেখা গেল মাস্ক, গ্লাভস, হ্যান্ড স্যনিটাইজার, চাল, ডাল ইত্যাদি কিনে লোকজন ঘর ভর্তি করা শুরু করে দিল। দোকানে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাওয়া যাচ্ছিল না। আমরা একবারও ভাবলাম না অন্যের প্রয়োজনের কথা। আমি পেট পুরে খেলাম কিন্তু একজন রিকশাচালক সারাদিন রিকশা চালিয়ে তিনি যে কিছু কিনতে পারবেন না, খেতে পারবেন না, এটা ভাবলাম না! এটা শুধু অমানবিকতা নয়, আমাদের স্বার্থপরতাও বটে। নিজে বাঁচার চিন্তা। এই অবস্থা দেখে আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে এই আমাদের জাতিই স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় দীর্ঘ নয় মাস নিজের খাবার, নিজের ঘর, নিজের বিছানা একে অপরের সঙ্গে শেয়ার করেছিল।

সম্প্রতি এসব ঘটনাগুলো কি প্রমাণ করে না আসলেই আমরা এক অমানবিক জাতি! এই করোনা নামক মহামারি আমাদের অমানবিক করে তুলেছে। এদেশে কত মহামারি গেছে কই তখনতো এত অমানবিকতার গল্প শুনিনি। স্বাধীনতার যুদ্ধেও এমন অমানবিকতার গল্প আমরা শুনিনি, বরং শুনেছি সবাই সবাইকে আঁকড়ে ধরে বেঁচেছে। আমাদের প্রতিবেশী কিংবা আত্মীয় স্বজনদের অসুখ অথবা মৃত্যুর খবর শুনলেই আমরা ছুটে যেতাম। হাসপাতালে ভিড় পড়ে যেত স্বজনদের ভিড়ে। লাশবাহী গাড়ি, জানাজার মাঠে জায়গা পাওয়া যেত না। সেই আমরা এখন কতটা অমানবিক হচ্ছি, ভাবতেই অবাক লাগছে। আমাদের মধ্যে সামাজিক দূরত্বের নামে যে অমানবিকতা হচ্ছে, এর পেছনে মূল কারণ হলো অতি সচেতনতা বা আমাদের অসচেতনতা অথবা অজ্ঞানতা।

আমাদের জানতে হবে, সর্দিকাশি মানেই করোনা রোগ নয়। আর তা যদি হয়েই থাকে, তবে ভয়ের কিছু নেই সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে উপসর্গ অনুযায়ী ডাক্তারের নির্দেশনা মেনে চিকিৎসা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, একজন ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলেই তিনি অপরাধী নন। সমাজে তাকে ভিন্ন চোখে দেখা যাবে না। বরং তাকে স্বাভাবিকভাবে দেখে তাদের মানুসিকভাবে সুস্থ্য রাখতে হবে। সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। আমাদের আচরণে তারা যাতে কোনোভাবেই মানুসিক ভাবে অসুস্থ্য না হন সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে না গিয়ে ফোনে খবর নেওয়া, নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে খাবার সরবরাহ করতে হবে।

এ রোগে আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেলে জানাজা বা দাফনে শরিক না হওয়ার তেমন যুক্তি নেই। করোনায় আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির দেহ থেকে করোনা ছড়ায় বলে এখনো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছেন, মারা যাওয়ার তিন ঘণ্টা পর্যন্ত মৃতদেহের নাক বা মুখের নিঃসরণ বা সিক্রেশনে এই ভাইরাস থাকতে পারে। তবে উপযুক্ত প্রটেকশন নিয়ে লাশ ধুলে বা দাফন করলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। সুতরাং ভয় নয় বরং সচেতনতার সঙ্গে লাশের জানাজায় কিংবা দাফনে শরীক হওয়া যায়।

সর্বদা মনে রাখতে হবে, সামাজিক দূরত্ব মানে নিজের নৈতিকতা ও মানবিকতা বিসর্জন নয়, সম্পর্কের দূরত্ব নয়, বন্ধনের দূরত্ব নয়। নিজের দায়িত্ব বা ভালোবাসার দায় থেকে সরে আসা নয়। আমাদের অজ্ঞতার কারণে যে ভুলগুলো আমরা করছি তার প্রভাব হয়তো পরবর্তী প্রজন্মের উপর পড়বে। সুতরাং এখনই করোনা নিয়ে সচেতনতার নামে অতি সচেতনতা আমাদের বন্ধ করা উচিত। নতুন প্রজন্মকে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া একান্ত প্রয়োজন।

সর্বশেষ বলবো, আসুন নির্ধারিত শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে আমরা সবাই সবার পাশে থাকি। মানবিক হই এবং একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ি। যতটা সম্ভব জনসমাগম এড়িয়ে চলি। মহান সৃষ্টিকর্তাকে ডাকি এবং পিছনের ভুল থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করি। তিনি চাইলে সব সমস্যার সমাধান দিতে পারেন।    

লেখক: এম. সোলায়মান, সহ-সম্পাদক, আলোকিত বাংলাদেশ


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।