বৃহস্পতিবার, ২০ জুন, ২০১৯, ৬ আষাঢ় ১৪২৬

অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ

অর্থনীতি পুড়ছে ডলারের দামে

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৩ মে ২০১৯, বৃহস্পতিবার ০৪:৪৪ পিএম

অর্থনীতি পুড়ছে ডলারের দামে

ঢাকা : বাজারব্যবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় ডলারের দাম। বিপুল সংকট থাকায় এ মুদ্রার চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংকগুলো। যদিও একই জায়গায় আটকে আছে ডলারের দাম। এর নেপথ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ। চাহিদার কারণে ডলারের দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হলেও অর্থনীতির জন্য জরুরি হচ্ছে বাজারব্যবস্থাকে কার্যকর করা। ডলারের দামে বাংলাদেশ ব্যাংকের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে পুড়ছে অর্থনীতি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারব্যবস্থার ওপরে ডলারের দাম ছেড়ে দেওয়া হয় ২০০৩ সালে। এরপর ডলারের দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারতি হওয়ার কথা। সারা বিশ্বেই তা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে অদৃশ্য উপায়ে ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। ফলে বাজারব্যবস্থা সচল নয়। এতে অর্থনীতিতে এক ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণ না করলে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে যে ঘাটতি রয়েছে, তার জন্য হয়তো ডলারের দাম কিছুটা বাড়তে পারে। কিন্তু এতে রপ্তানিকারকরা উৎসাহিত হবেন। বাড়বে প্রবাসী আয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাজারব্যবস্থার ওপর ডলারের দাম ছেড়ে দিলে প্রবাসীরা আরো বেশি অর্থ পাঠাবে, যা অর্থনীতিতে অবদান রাখবে। সরকার প্রবাসী আয় বাড়াতে যে নগদ সহায়তা দেওয়ার চিন্তা করছে, সেটিও প্রয়োজন হবে না। এতে সরকারের রাজস্ব ব্যয় কমবে। অন্যদিকে রপ্তানিকারকরাও লাভবান হবেন এখান থেকে। ফলে তারাও রপ্তানি বাড়াতে উদ্যোগ নেবেন। অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিরুৎসাহিত হবে।

জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ডলারের দাম আমরা বাজারব্যবস্থার ওপর ছেড়ে দিয়েছি। এটি চাহিদা ও জোগানের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। এতে দাম হয়তো কখনো বাড়বে কিংবা কমবে। সামান্য ওঠানামা করতেই পারে।

পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাম কিছুটা বাড়বে হয়তো। কিন্তু এতে প্রবাসীরা সুবিধা পাবেন। রপ্তানিকারকরা লাভবান হবেন। অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমবে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কর্মকাণ্ড বাড়বে। দেশীয় শিল্পগুলো সুরক্ষা পাবে। অর্থনীতির সার্বিক গতিপ্রবাহের স্বার্থে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার চলতে দিতে হবে।

অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেন, ডলারের বাজার পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এখানে বাজারব্যবস্থা কার্যকর। পরোক্ষভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বাজারকে স্থিতিশীল রাখে। তবে এখানে হয়তো কিছুটা ছাড় আসতে পারে। সেটা বিবেচনায় রয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা ব্যাংকগুলোকে বলছি, যাতে নিজেরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়। গ্রাহককে রপ্তানি বাড়াতে বলতে হবে। আর প্রবাসী আয় বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে।  

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডলারের দাম বাড়লে সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে নগদ সহায়তা দেয়, সেটি না দিলেও চলবে। এটি প্রজ্ঞাপন জারি করে যেকোনো সময় প্রত্যাহার করা যায়। এতে সরকারের রাজস্ব বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে পরোক্ষভাবে ডলারের বাজারে নিয়ন্ত্রণ করার দরকার নেই। বরং এটি করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ ডলার ছাড়তে হচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এক ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে। এই চাপ দীর্ঘায়িত হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারব্যবস্থাকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে। এই পরিস্থিতি হলে পুরো বৈদেশিক মুদ্রাবাজার অস্থিতিশীল হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বাজার স্থিতিশীল রাখতেই পর্যাপ্ত ডলারের মজুত থাকতে হবে। এতে কারসাজি করতে সাহস পাবে না অসাধু চক্র। অন্যথায় দেখা যাবে কারসাজি চক্র বিপুল পরিমাণ ডলার বের করে নিয়ে মজুত করবে লাভের আশায়। ডলারের দাম কিছুটা বাড়লে মূল্যস্ফীতি হতে পারে এমন শঙ্কা থাকলেও বাজেটের অন্য নীতি দিয়ে এটি নিয়ন্ত্রণ করা যায় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের দুজন কর্মকর্তা প্রতিদিন এই ডলারের দাম অঘোষিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন। তারা প্রতিদিন ব্যাংকগুলোর সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করে কাজটি করে থাকেন। এতে বাজার স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ, রমজান ও ঈদুল ফিতরকেন্দ্রিক পণ্য আমদানি এবং সরকারি পর্যায়ে এলএনজি ও জ্বালানিসহ কয়েকটি পণ্যের আমদানি ব্যয় মেটাতে ডলার সংকটে পড়েছে ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংক। বাধ্য হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দৌড়াচ্ছে ব্যাংকগুলো। সংকট মেটাতে চলতি অর্থবছর ১০ মাসে ২১০ কোটি ডলার বিক্রির জন্য খোলাবাজারে ছেড়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর বিপরীতে মুদ্রাবাজার থেকে সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা চলে গেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। ফলে ব্যাংকগুলোয় নগদ টাকার সংকট ঘনীভূত হচ্ছে।

আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় এমনিতেই তারল্য সংকটে ভুগছে ব্যাংক খাত। পাশাপাশি আমদানি প্রবৃদ্ধির তুলনায় রেমিট্যান্স প্রবাহ কম হওয়ায় ব্যাংকগুলোর কাছে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ডলার নেই। ফলে ডলার কিনতে গিয়ে সাড়ে ১৮ হাজার কোটির বেশি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে চলে গেছে। এর প্রভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কমে আসছে। অন্যদিকে ডলার কেনায় ব্যাংকগুলোর তারল্য প্রবাহে আরো চাপ বাড়ছে, যা সুদের হারের ঊর্ধ্বমুখী ভাবকে উসকে দিচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বড় বেশ কিছু উন্নয়ন প্রকল্প চলছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসিসহ রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন করপোরেশনকে নিয়মিতভাবেই পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে। এসব আমদানি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে এই সময়ে ডলারের সংকট চলছে। এজন্য প্রতিনিয়তই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কেনার প্রস্তাব আসছে। এর সঙ্গে বেসরকারি খাতের কয়েকটি ব্যাংকেরও ডলার সংকট চলছে। তারাও আবেদন করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ৮৪ দশমিক ৫০ টাকায় প্রতি ডলার কিনেছে ব্যাংকগুলো। ডলারের সংকটের কারণে অনেক বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারছে না।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাষ্ট্রায়ত্ত এক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, জ্বালানি বিশেষ করে এলএনজি আমদানি ব্যয় মেটাতে নিয়মিত ডলার লাগছে। এটি সরকারের অগ্রাধিকার খাত। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকই এসব পণ্যের এলসি খোলে। এছাড়া সরকারের মেগা প্রকল্পের বিপরীতে নিয়মিত পণ্য আমদানি হচ্ছে। এসব পণ্যের আমদানি ব্যয় মেটাতে হচ্ছে নিয়মিত। এজন্য ডলারের কিছুটা সংকট চলছে। বাধ্য হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কিনতে হচ্ছে।

গত অর্থবছরে ডলারের জোগান দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক মোট ২৩১ কোটি ডলার বিক্রি করেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত ১৫ মে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল তিন হাজার ১১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এক বছর আগে এই দিনে যা ছিল তিন হাজার ২০২ কোটি ২৫ লাখ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে রিজার্ভ কমেছে ৮৯ কোটি ৫৪ লাখ ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের গত দশ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ। গত ৯ মাসে আমদানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে পাঁচ দশমিক ১৩ শতাংশ। অন্যদিকে গত দশ মাসে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি হয় দশ শতাংশ। গত অর্থবছরে প্রবাসীরা দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন এক হাজার ৪৯৮ কোটি ১৬ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরের গত এপ্রিল পর্যন্ত প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন এক হাজার ৩৩০ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

সোনালীনিউজ/এমটিআই