বুধবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৯, ৮ কার্তিক ১৪২৬

ছাত্ররাজনীতিতে অস্থিরতা

আওয়ামী লীগে অস্বস্তি

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, রবিবার ০২:২৭ পিএম

আওয়ামী লীগে অস্বস্তি

ঢাকা : ছাত্রলীগের একের পর এক নেতিবাচক ঘটনায় বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব। ভ্রাতৃপ্রতিম এ সংগঠনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও শৃঙ্খলাবিরোধী কার্যক্রমে ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের অনেককেই ‘অবাক’ করছে।

বর্তমান কমিটি নির্বাচিত হওয়ার মাত্র ১৩ মাসের মাথায় যত অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছে, সংগঠনটির অতীতের কোনো কমিটিকে নিয়ে এত বেশি বিতর্ক হয়নি। এসব ঘটনা নানা বিতর্ক জন্ম দেওয়ার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও সরকারকেও বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি করছে। ক্ষুণ্ন করছে দেশের ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন সংগঠনটির ভাবমূর্তিও।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, বর্তমান কমিটির ভবিষ্যৎ ও আগামীর নেতৃত্বে কারা আসছেন-ইত্যাদি নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন সংগঠনটিরই নেতাকর্মীরা।

কেন্দ্রীয় কমিটিতে সংগঠনের আদর্শবিরোধীদের পদ পাওয়া আর তাদেরকে সেসব পদ থেকে বাদ দিয়ে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির ত্যাগীদের পদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি কখন পূরণ হবে, তা জানা নেই কারো।

বর্তমান কমিটি ভেঙে দিয়ে কেন্দ্রীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নতুন নেতৃত্ব আনা হলেও বর্তমানদের বিতর্কের দায় নেবে কে নেবেন-এর উত্তর জানেন না সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা আর টাকার বিনিময়ে কমিটি গঠন ছাত্রলীগের বর্তমান নেতাদের আয়ের প্রধান উৎস বলে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছেও অভিযোগ আছে।

ছাত্রলীগের নানা কর্মকাণ্ডে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভ প্রকাশের পর আলোচনা-সমালোচনার কারণে এখন তোপের মুখে সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা। তাদের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে গণভবনের দরজাও।

অবস্থা এতই জটিল পর্যায়ে গেছে যে, খোদ ছাত্রলীগের অন্য নেতারাই সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি এবং মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সংগঠনে পদ বিক্রির কঠোর অভিযোগ করছেন। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের পাশাপাশি ভিন্নমতের ছাত্রসংগঠন ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অপহরণ, ধর্ষণ ও প্রশ্নফাঁসসহ নানা কার্যকলাপের কারণে প্রায় নিয়মিতই আলোচনায় থাকছে ছাত্রলীগ। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বসে মাদক সেবনের অভিযোগও আছে নেতাদের বিরুদ্ধে। বিতর্ক যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না সংগঠনটির।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেই চলেছে।

ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী যথারীতি সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করে আসছেন, ‘তারা ষড়যন্ত্রের শিকার’।

সংগঠনটিতে অনুপ্রবেশকারীরাই এসব বিতর্কের পেছনের ষড়যন্ত্রকারী বলেও তাদের ‘সন্দেহ’। উপায় না দেখে নিজেদের বিরুদ্ধে আনা বিভিন্ন অভিযোগের ব্যাখাসহ ভুল শোধরানোর সুযোগ চেয়ে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে চিঠি দিয়েছেন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।

তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম তাদের চাঁদাবাজির বিষয়ে যে অভিযোগ করেছিলেন, সেই বিষয়ে তিনি শনিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। নিজের বক্তব্যের প্রতি অনড় তিনি। এতে নতুন করে আরেক বিপাকের মুখোমুখি ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতা।

ফারজানা ইসলাম গত শুক্রবার অভিযোগ করেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার ক্যাম্পাস উন্নয়ন প্রকল্পের ৪ থেকে ৬ শতাংশ চাঁদা দাবি করেছিলেন ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।’

অবশ্য ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়গুলো অনেকদিন ধরেই সমালোচনার জন্ম দিচ্ছে। এক পর্যায়ে উপাচার্যের সঙ্গে ছাত্রলীগের ‘প্রশ্নবিদ্ধ বৈঠকের’ খবর ছড়িয়ে পড়লে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) উদ্বেগ প্রকাশ করে।

তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ-বিক্ষোভে একাত্মতা প্রকাশ করে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা টিআইবি বলে, ‘ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে উপাচার্যের প্রশ্নবিদ্ধ বৈঠকসহ যেসব গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে, তা সব বিবেচনায় দুঃখজনক ও বিব্রতকর।’

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কয়েক নেতার মতে, কমিটি বাণিজ্য আর মাদক ছাড়াও ছাত্রলীগ নেতাদের ওপর প্রধানমন্ত্রীর অসন্তোষের অন্যতম কারণ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প থেকে টাকা চাওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কমিটিতে সাধারণ সম্পাদকের পদ বাগাতে অর্থ লেনদেনের বিষয় এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ছাত্রলীগের অফিস কক্ষে মাদক পাওয়ার বিষয়টি।

ঢাকার ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সম্প্রতি ফেনসিডিলের বেশ কয়েকটি খালি বোতল পাওয়া যায়। কার্যালয় দেখভালের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিষয়টি জেনে প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হন।

নানা আলোচনা ও সমালোচনার মধ্যে ছাত্রলীগের সভাপতি শোভন ও সাধারণ সম্পাদক রাব্বানীর উদ্দেশে এবার অভিযোগ ছুড়লেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ জয়নুল আবেদিন রাসেল।

গত ৩ ফেব্রুয়ারি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি তরিকুল ইসলাম ও সম্পাদক শেখ রাসেলের সমর্থকদের সংঘর্ষের পর ওই দিনই কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। ১৯ ফেব্রুয়ারি বিলুপ্ত করা হয় এ কমিটি। গত শুক্রবার রাতে নিজের ফেসবুক দেয়ালে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে রাসেল অভিযোগ করেন, ওই কমিটি টিকিয়ে রাখার বিনিময়ে তার কাছে অর্থ চেয়েছিলেন রাব্বানী।

দলীয় সূত্র জানায়, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে গড়া ছাত্রলীগের সংগঠনের হারানো ঐতিহ্য ও সুনাম ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্পষ্ট কিছু নির্দেশনা আছে। সংগঠনটির বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের চার নেতাকে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশও দিয়েছেন।

২৯তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার আড়াই মাস পর গত বছরের ৩১ জুলাই শোভনকে সভাপতি ও রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষিত হয়। গত বছরের ১১ ও ১২ মে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

আওয়ামী লীগ সভাপতি সাত দিনের মধ্যে ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে গত ১৫ এপ্রিল নির্দেশ দিলেও নির্ধারিত সময়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে সংগঠনটির বর্তমান নেতৃত্ব ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দ্বন্দ্বই এর মূলে বলে অনেকের ধারণা। নানা আলোচনা ও সমালোচনার পর পুরো কমিটি করতে দায়িত্ব দেওয়া হয় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের চার নেতাকে।

সম্মেলনের এক বছরেও সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মিলে কমিটি করতে না পারায় আওয়ামী লীগ সভাপতি ওই চার নেতাকে এ দায়িত্ব দেন। কেন্দ্রীয় সম্মেলনের এক বছর পর গত ১৩ মে ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করে ছাত্রলীগ।

এ কমিটিতে বিতর্কিতদের রাখা হয় অভিযোগ ওঠে। বিতর্কিতদের বাদ দিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের ১৩ দিনের মাথায় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে মাত্র ১৯ জনের পদ শূন্য ঘোষণা করার কথা জানায় ছাত্রলীগ।

গত ৭ সেপ্টেম্বর গণভবনে অনুষ্ঠিত দলের মনোনয়ন বোর্ডের যৌথসভায় ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে উপস্থিত নেতাদের সমালোচনার একপর্যায়ে ছাত্রলীগের কমিটি ভেঙে দিতে বলেন শেখ হাসিনা।

সোনালীনিউজ/এমটিআই