মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬

আগুনে স্বপ্ন পুড়ে ছাই

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৮ আগস্ট ২০১৯, রবিবার ০১:০১ পিএম

আগুনে স্বপ্ন পুড়ে ছাই

ঢাকা : গার্মেন্টে চাকরির টাকায় একটা একটা করে ঘরের আসবাব কেনেন আকলিমা আক্তার। টিভি, ফ্রিজ, সোফাসেট, আলমারিসহ নানা আসবাবে ছোট্ট ঘরটি ছিল টইটম্বুর। প্রায় লক্ষাধিক টাকা জমা করেও ঘরে রেখেছিলেন ভবিষ্যতের একটু সুখের স্বপ্নে। কিন্তু আগুনের লেলিহান শিখায় তার স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

শুধু আকলিমা নন, রাজধানীর মিরপুর ৭ নম্বর চলন্তিকা বস্তির হাজার হাজার মানুষের স্বপ্নই পুড়ে গেছে আগুনে। সব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা। তাদের সবার চোখে-মুখেই হতাশার ছাপ।

শুক্রবার (১৬ আগস্ট) সন্ধ্যা ৭টা ২২ মিনিটে রূপনগরের চলন্তিকা বস্তিতে আগুন লাগার পর তা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে ঝিলপাড়, আরামবাগ ও টবলক বস্তিতে। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এখানে প্রায় তিন হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

শনিবার (১৭ আগস্ট) সকালে সরেজমিন চলন্তিকা বস্তি ঘুরে দেখা যায়, বস্তিজুড়ে টিন ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কোনো কিছুই বাকি নেই। কেউ কেউ পুড়ে যাওয়া জিনিস বারবার হাতড়াচ্ছে, কিছু পাওয়া যায় কি না, তাই ভেবে।

ঝিলপাড় বস্তির বাসিন্দা পোশাকশ্রমিক দুলাল বলেন, ‘আমার ছোট ছোট দুই মেয়ে। স্ত্রী মারা গেছে দেড় বছর আগে। বস্তিতে আমার ৯টি ঘর ছিল। একটিতে সন্তানদের নিয়ে থাকতাম, বাকিগুলো ভাড়া দেওয়া ছিল। সব পুড়ে গেছে। কিছুই বের করতে পারিনি। আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি।’

তিনি বলেন, ‘দুই মেয়ের একজনকে বাড়িতে আগুনের পর রেখে এসেছি। আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিস আসতে দেরি করেছে। আসার পর পানি শেষ হয়ে যায়। এ সময় সব বস্তিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।’

দুলালের বাবা স্বাধীনতার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকায় চলে আসেন।

 এর পর থেকেই তারা এই এলাকায় বাস করছেন। দুলাল আরো বলেন, ‘সকালে একবার চলন্তিকা বস্তিতে আগুন লেগেছিল ফরিদের ঘরে। সেই আগুন নেভানোর পর রাতে আবার সেখান থেকেই আগুন লেগেছে।’

ঝিলের ওপর মাটি ভরাট করে বানানো বাঁশ ও টিনের ছোট ছোট তিন সহস্রাধিক ঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। মানুষ কোনোরকম প্রাণ নিয়ে বের হয়েছেন। সবার চোখে-মুখে আতঙ্ক। ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত তারা।

বস্তির বাসিন্দা জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আমার সব শেষ। পরনের লুঙ্গি আর এই শার্ট ছাড়া কিছুই নেই। সব আগুনে পুড়ে গেছে। আমার স্ত্রীসহ চার মেয়ে ও দুই ছেলে নিয়ে পাঁচটি ঘরে এখানে থাকতাম। এখন কী খাব, কোথায় থাকব, কিছুই জানি না? ঘরের টাকা কড়িও সব পুড়ে গেছে।’

জাহাঙ্গীর বলেন, যখন আগুন লাগে তিনি ও তার স্ত্রী ঘরে ছিলেন। চেষ্টা করেও আগুন নেভাতে পারেননি। পরনের কাপড় নিয়ে শুধু নিজেদের জান বাঁচিয়েছেন।

বস্তিতে ছোট্ট দোকান করতেন সত্তরোর্ধ্ব রিজিয়া বেগম। তিনি বলেন, ‘এখানে ২৫ বছর যাবত আছি। অনেক কষ্ট করে এই দোকানটা করেছিলাম। এই দোকান করে আমার তিন ছেলে ও এক মেয়েকে মানুষ করেছি। এই দোকানই আমার সব ছিল। আগুনে আমার সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেল। দোকান থেকে কিছুই বের করতে পারিনি। এখন থাকব কোথায়, করব কী, কিছুই জানি না। শুক্রবার বিকাল থেকে এখন পর্যন্ত না খেয়ে আছি।’ যখন আগুন লাগে তখন তিনি দোকানে ছিলেন না বলে জানান।

বস্তির একটি ঘর নিয়ে থাকতেন তানিয়া। তিনি বলেন, ‘আমরা পরিবারের চারজন ছিলাম একটি ঘরে। আমরা সবাই সুস্থ আছি, কিন্তু আমাদের বেঁচে থাকার সম্বল বলতে আর কিছু নেই। অনেক কষ্ট করে সংসারটা গুছিয়ে ছিলাম। এখন কোথায় থাকব, জানি না।

শুক্রবার দুপুরের পর থেকে না খেয়ে আছি।’ পোশাকশ্রমিক তানিয়া জানান, আগুন লাগার সময় তিনি ঘরে ছিলেন না।

ডলি বেগম নামে একজন বাসিন্দা বলেন, গোলার মতো আগুন জ্বলেছে। মনে হয়েছে, কেরোসিন দিয়ে আগুন লাগানো হয়েছে।’ ছেলেদের নিয়ে একটি বাসায় থাকতেন ডলি। তার মোট তিনটি ঘর ছিল, বাকি দুটি ঘর ভাড়া দিতেন। তাও পুড়ে গেছে। সাভারের আমিন বাজার থেকে এখানে প্রায় ৩০ বছর আগে এসেছেন। আমিনবাজারে তাদের কিছু নেই।

রাজিয়া বেগম নামে এক নারী বলেন,  ‘কেরোসিন দিয়ে আগুন দিয়েছে। গরিবকে এখানে থাকতে দেবে না। তাই সব পুড়িয়ে দিয়েছে।’

এদিকে আগুন লাগার খবর শুনে কাছাকাছি জেলার অনেকে গতকাল শনিবার ভোর থেকে ওই এলাকায় আসছে। তারা এখন তাদের ঘর খোঁজার চেষ্টা করছে। কিন্তু সেখানে এখন শুধু নষ্ট হয়ে যাওয়া টিন পড়ে আছে। তার মধ্যেই সেখানে তারা নিজেদের অবশিষ্ট জিনিসপত্র খুঁজছে। কিন্তু পাচ্ছে না কিছুই। ভয়াবহ আগুনে সেখানে বেঁচে যাওয়ার মতো কিছু নেই।

নরসিংদীর মনোহরদী থেকে এসেছেন সুমাইয়া (২৫)। বলেন, ঈদের ছুটিতে স্বামী ও তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে বাড়ি গিয়েছিলেন। তিনি গৃহকর্মীর কাজ করেন। তার স্বামী একটি দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। বস্তির সাত নম্বর রোডের নয় নম্বর গলিতে তার ঘর ছিল। আগুন লাগার খবর রাতে শুনেই স্বামীকে নিয়ে ভোরে এসে পৌঁছেছেন। পৌঁছেই ঘরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু যাবেন কোথায়? কোথাও ঘর বলে কিছু নেই। সব সমান হয়ে গেছে।

তিনি ঈদের আগে কাপড়চোপড়সহ যেসব জিনিস সঙ্গে নিয়ে গেছেন, সেগুলো ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। এখন কোথায় থাকবেন, তা জানেন না। তাদের স্কুলে থাকতে দেওয়া হবে বলে শুনেছেন। কিন্তু এখনো কেউ কোথাও যায়নি। এখনো সবাই বস্তির আশপাশেই আহাজারি করছে।

বস্তির বাসিন্দা শামীম হাসান বলেন, ‘আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। সকাল থেকে ঘর খোঁজার চেষ্টা করেছি। ঈদে বউ আর বাচ্চা জামালপুরে বাড়ি গেছে। আগুন লাগার কথা শুনে দৌড়ে বেরিয়ে এসেছি। কিছু সঙ্গে আনতে পারিনি।’

স্থানীয় অনেকে জানিয়েছেন, মিরপুর ৭ নম্বরের বস্তিটি অবৈধ। এখানে বেশির ভাগ বাড়ি টিন ও কাঠের। একেকটি বাড়ি টিন দিয়েই তিন-চারতলা করা হয়েছে। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে তৈরি করা এসব ঘরের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়েছে। বস্তির আশপাশের বাড়িগুলোতেও আগুন নিয়ে আতঙ্ক ছড়ায়।

স্থানীয় বাসিন্দা খায়রুল বাশার বলেন, বস্তির পাশেই তাদের বাসা। তারা আগুন ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে ছিলেন। দ্রুত বাড়ি ছেড়ে সবাই বাইরে চলে আসেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আগুন নেভানো সম্ভব হওয়ায় তারা রক্ষা পেয়েছেন।

শনিবার (১৭ আগস্ট) সকালে চলন্তিকা মোড়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক মো. রেজাউল করিম বলেন, এখানে আনুমানিক ৫০০ থেকে ৬০০ ঘর ছিল। আমরা কিছু ঘর এবং পরিবারগুলো সেভ করতে সক্ষম হয়েছি। তবে আগুনে বস্তির তিন হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রেজাউল করিম আরো বলেন, আগুনে বেশির ভাগ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে আমাদের অনুসন্ধান চলছে। প্রথম থেকে আমাদের কাজ করতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। কারণ টিনের চালাঘর সব ধসে পড়েছে। এগুলো সরিয়ে কাজ করতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আগুন নেভাতে আমাদের ২৪টি ইউনিট কাজ করেছে। কেউ নিহত হননি, তবে চারজন আহত হয়েছেন।’

তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের তদন্ত কমিটি প্রক্রিয়াধীন আছে। আজকের মধ্যেই সেটি হয়ে যাবে। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এখানে অনেক দাহ্য বস্তু ছিল। গ্যাসের সংযোগগুলো ভালনারাবল অবস্থায় ছিল। ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বস্তির আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণ হচ্ছে—সহজ দাহ্য বস্তু দিয়ে বস্তির ঘরগুলো তৈরি করা হয়। আর ঘরগুলো পাশাপাশি একত্রে লাগানো থাকে। কোনো সেপারেশন থাকে না। এজন্যই বস্তির আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।’ এ সময় ফায়ার সার্ভিসের অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আগুনের খবর পেয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, স্থানীয় সাংসদ ইলিয়াস মোল্যা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান ঘটনাস্থলে যান। তারা ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনকে সহায়তার আশ্বাস দেন।

সাংসদ ইলিয়াস মোল্যা বলেন, ৫০ থেকে ৬০ হাজার লোক বস্তিতে থাকত। সবাই ঈদে বাড়ি গিয়েছিল। কিন্তু ফিরে এসে কেউ কিছু পায়নি। এখানে যা ছিল সব শেষ হয়ে গেছে।

মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে যে স্কুলটা আছে সেটা বঙ্গবন্ধু স্কুল এবং আশপাশে আরো স্কুল আছে। সেই স্কুলগুলোতে তারা থাকবে। তারা খাবে কী? এ ব্যাপারে আমি এরই মধ্যে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে আলাপ করেছি। সিটি করপোরেশনকেও আমি বলেছি, রান্না করে হলেও তাদের খাবারের ব্যবস্থা আমরা করব।’

আতিকুল ইসলাম বলেন, বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনের জন্য ২০১৭ সালে বাউনিয়া বাঁধে জায়গা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে ইতোমধ্যে পুনর্বাসনের কাজ শুরু হয়ে গেছে। এখানকার ১০ হাজার বস্তি পরিবারকে পর্যায়ক্রমে সেখানে স্থানান্তর করা হবে।

তিনি আরো বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তা দেবে সিটি করপোরেশন। ইতোমধ্যে জরুরি কিছু সেবা যেমন—পানি, প্রাথমিক চিকিৎসা, খাবার ও ভ্রাম্যমাণ টয়লেটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের জন্য সব ধরনের সহযোগিতা চালিয়ে যাবে সিটি করপোরেশন।

সোনালীনিউজ/এমটিআই