বুধবার, ২৬ জুন, ২০১৯, ১২ আষাঢ় ১৪২৬

আজ ১২০তম নজরুল জয়ন্তী

নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৫ মে ২০১৯, শনিবার ০৮:১৬ পিএম

আজ ১২০তম নজরুল জয়ন্তী

ঢাকা : তার লেখনিতে দ্রোহ, প্রেম, সাম্য, মানবতা ও শোষিত বঞ্চিত মানুষের মুক্তির বার্তা প্রকাশ পেয়েছে প্রবলভাবে। এ কারণে তিনি বিদ্রোহী। তার প্রেমিক রূপটিও প্রবাদপ্রতিম। তাই তো তিনি কবিতার ছত্রে ছত্রে বলেছেন, ‘আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন খুঁজি তারে আমি আয়নায়।’

পৃথিবীতে এমন ক’জন আছেন যিনি প্রেমের টানে রক্তের সর্ম্পকে অস্বীকার করে পথে বেরিয়ে পড়তে পারেন। তিনি হলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

শনিবার, ১১ জ্যৈষ্ঠ (২৫ মে)। সেই সাম্য, দ্রোহ ও প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২০তম জয়ন্তী। এবারও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে জাতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করবে মহান এই কবিকে।

সরকারি পর্যায়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ত্রিশাল, ঢাকা, কুমিল্লা, চুয়াডাঙ্গা ও মানিকগঞ্জে ব্যাপক কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি উদযাপনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ত্রিশালে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শনিবার বিকেল ৩টায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। এতে সভাপতিত্ব করবেন সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এমপি।

শনিবার (২৫ মে) ভোর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে কবির সমাধি ভরে উঠবে অগণিত মানুষের নিবেদন করা ফুলে।

১২০তম নজরুল-জয়ন্তী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তারা কবির স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে তার বিদেহি আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছেন।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ, পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে। বাবা কাজী ফকির আহমদ ও মা জায়েদা খাতুন। সীমাহীন দারিদ্র্যকে সঙ্গী করে কবির আগমন ঘটে পৃথিবীতে। দারিদ্র্যের কারণে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশি দূর এগোয়নি। কিন্তু প্রতিভাবান নজরুল নিজের চেষ্টায় অনেক পড়াশোনা করে সমৃদ্ধ করেছেন তার মনন ও চিন্তার জগৎ। ছোটবেলায় রুটির দোকানে কাজ করা, লেটোর দলে যোগদান, যৌবনে যুদ্ধযাত্রা, সাংবাদিকতা, রাজনীতিতে সংশ্লিষ্টতা সব মিলিয়ে বিচিত্র জীবন ছিল তার।

মাত্র ২৩ বছরের সাহিত্য জীবনে তিনি বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করেছেন। যা সত্যি বিষ্ময়কর। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলন পর্যন্ত বিপুল প্রেরণা যুগিয়েছে তার গান, রচনাবলী ও কবিতা।

মানবতার মুক্তির পাশাপাশি সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সদা-সোচ্চার।

দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হয়েও তিনি কখনও আপস করেননি। মাথা নত করেননি লোভ-লালসা, খ্যাতি, অর্থ-বিত্ত ও বৈভবের কাছে। ‘চির উন্নত মম শির’ বলে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন।

বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার, গায়ক ও অভিনেতা। বৈচিত্র্যময় অসংখ্য রাগ-রাগিনী সৃষ্টি করে বাংলা সঙ্গীত জগতকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। কবিতার পাশাপাশি বাংলা গানের ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা গজলের প্রবর্তক বলা হয় তাকে। তিনিই প্রথম বাংলা গজল রচনা করেন।

অসাম্প্রদায়িক ও শোষনমুক্ত দেশ ও সমাজ গড়ার মানসে সাহিত্যে বিভিন্ন শাখায় লেখালেখি করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম । এ সব ক্ষেত্রে তিনি সংগ্রামী ও পথিকৃৎ লেখক।তার লেখনি জাতীয় জীবনে অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। তার কবিতা ও গান মানুষকে যুগে যুগে শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির পথ দেখিয়ে চলছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার গান ও কবিতা ছিল প্রেরণার উৎস।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পরই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবারে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বাংলাদেশে তার বসবাসের ব্যবস্থা করেন। ধানমণ্ডিতে কবির জন্য একটি বাড়ি প্রদান করেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের শোকাবহ ঘটনার এক বছর পর ১২ ভাদ্র ১৯৭৬ সালের শোকের মাসেই শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নজরুল। কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। এখানেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।

কর্মসূচি : নজরুল-জয়ন্তী উপলক্ষে ঢাকায় সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন শ্রেণি পেশার সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে। এতে রয়েছে কবির সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ, শোভাযাত্রা, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

দেশের বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, সংগঠন নানা অনুষ্ঠানের আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করবে।

সরকারি পর্যায়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ত্রিশাল, ঢাকা, কুমিল্লা, চুয়াডাঙ্গা ও মানিকগঞ্জে ব্যাপক কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি উদযাপনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ত্রিশালে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শনিবার বিকেল ৩টয় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, শান্তি নিকেতন, ভারত এর উপাচার্য অধ্যাপক বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি সংসদ সদস্য হাফেজ রুহুল আমিন মাদানী ও সংসদ সদস্য অসীম কুমার উকিল।

ভোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে কবির সমাধিতে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের দিয়ে দিবসটির কর্মসূচি পালন শুরু হবে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নজরুল ইন্সটিটিউট, নজরুল একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমিসহ  বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের পক্ষ থেকে কবির সমাধিতে শ্রদ্ধা জানানো হবে।

বাংলা একাডেমি : রোববার (২৬ মে) বেলা ১১টায় একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে নজরুল বিষয়ক একক বক্তৃতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। ‘নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা’ শীর্ষক একক বক্তৃতা প্রদান করবেন অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর। সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমির সভাপতি ও জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। সাংস্কৃতিক পর্বে রয়েছে নজরুলের কবিতার আবৃত্তি এবং নজরুলগীতি পরিবেশনা।   

ছায়ানট : রমেশ চন্দ্র দত্ত স্মৃতি মিলনকেন্দ্রে শনিবার (২৫ মে) বেলা ১১ টায় নজরুল জয়ন্তীর অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ :  দলের পক্ষ থেকে সকাল সাড়ে ৮টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে চিরনিদ্রায় শায়িত কবির সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হবে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের শুক্রবার (২৪ মে) এক বিবৃতিতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের জন্য আওয়ামী লীগ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সকল স্তরের নেতা-কর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী ও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

অন্যান্য আয়োজন : বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ছাড়াও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এবং এফএম রেডিও স্টেশনগুলো দিবসটি উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে। জাতীয় দৈনিকগুলো এরইমধ্যে প্রকাশ করেছে বিশেষ লেখা।

সোনালীনিউজ/এমটিআই