বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৩ আশ্বিন ১৪২৬

আধিপত্য বিস্তার ও দখলের জেরেই বস্তিতে আগুন

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৮ আগস্ট ২০১৯, রবিবার ০১:১৯ পিএম

আধিপত্য বিস্তার ও দখলের জেরেই বস্তিতে আগুন

ঢাকা : বস্তিগুলোতে আগুনের ঘটনা বেশির ভাগই ঘটে পরিকল্পিতভাবে। প্রভাবশালীরা বস্তি দখল ও আধিপত্য বিস্তারের জেরে বস্তিতে আগুন লাগায়।

এ সংস্কৃতি প্রায় দুই যুগ আগে শুরু হয়েছে রাজধানীর লালবাগ শহীদনগর  ও ইসলামপুর বস্তি পোড়ানোর মধ্য দিয়ে। সেখানে খাস জায়গায় গড়ে ওঠা বস্তিতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিবদমান দুটো গ্রুপ দখল, জবরদখলের মানসে বস্তিতে আগুন সন্ত্রাস শুরু করে।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনেও এ তথ্য উঠে আসে। এরপর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএনপি বস্তি, তেজগাঁওয়ে বেগুনবাড়ি বস্তি ও মহাখালী সাত তলা বস্তিতেও পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটে একাধিকবার। এ বস্তিগুলোতে মাদকের আধিক্য থাকায় একাধিক গ্রুপ গড়ে ওঠে। নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে ব্যর্থ হয়ে এক গ্রুপ আগুন লাগিয়ে দেয় বস্তিতে।

বর্তমানে রাজধানীর বস্তিগুলো চরম ঘনবসতি হওয়ায় এগুলোর বেশির ভাগই অগ্নিঝুঁকিতে। বছরে মাঝে মাঝেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর কিছুটা সচেতন হলেও বস্তির অগ্নিঝুঁকি কমানোর কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। রাজধানীর সাড়ে তিন হাজার বস্তিতে ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করছে দরিদ্র মানুষেরা।

ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা বলছেন, বেশির ভাগ বস্তির প্রবেশমুখে সরু রাস্তা থাকায় যথা সময়ে ভারী অগ্নিনির্বাপণ গাড়ি প্রবেশ করানো যায় না। এ ছাড়া আশপাশে পানির ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় আগুন নেভাতে সময় লাগে।

এ ছাড়াও বস্তির ঘরগুলো এতটাই ঘিঞ্জি অবস্থায় থাকে যে, এসব বস্তির অলিগলিতে ঢোকাও কষ্টকর হয়ে পড়ে। গত কয়েক বছরে রাজধানীর যেসব বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রায় সব কটির উদ্দেশে ফায়ার

 সার্ভিসের গাড়ি রওনা দিলেও গলি ঘিঞ্জি হওয়ার কারণে সময়মতো ঘটনাস্থলে পৌঁছতে না পারায় আগুন নেভাতে সময় লেগেছে। ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বেড়েছে।

তথ্যানুসন্ধানে আরো জানা গেছে, রাজধানীর মাদকের আখড়াগুলো বস্তিকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে। বস্তিতে নিম্নবিত্ত মানুষের বসবাস থাকলেও এর নেপথ্যে থাকে প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীদের পদচারণ। রাতের অন্ধকারে এদের একটি অংশ বস্তিতে অবস্থান নেয়। সারা রাত চলে ‘মাস্তি’, ‘আমোদ-ফুর্তি’। বস্তির কোনো কোনো ঘর তারা নিজেদের মতো করে সাজিয়ে-গুছিয়ে নেয়।

এরপর চলে জুয়া খেলা, মদের আসর, গভীর রাতে আসে তরুণী, ভোর পর্যন্ত চলে এদের লীলাখেলা। সংশ্লিষ্ট বস্তির মানুষ এসব জেনেও না জানার ভান করে থাকে। কারণ মুখ খুললেই পরদিন ছাড়তে হবে বস্তি। এসব বস্তিতে ঘিরে থাকা একাধিক গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য বিস্তারের বলি হতে হয় এসব খেটে খাওয়া মানুষকে। আগুন লাগলে পরদিন তারা বিলাপ করে। তাদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হলেও কিছু যায় আসে না ওই প্রভাবশালীদের। কারণ তাদের টার্গেট থাকে একটাই—‘বস্তি দখল’।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত বস্তিশুমারি ও ভাসমান লোকগণনা জরিপ-২০১৪ অনুযায়ী রাজধানীতে মোট বস্তির সংখ্যা ৩ হাজার ৩৯৪টি। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে বস্তি ১ হাজার ৬৩৯টি। উত্তর সিটির বস্তিতে মোট জনসংখ্যা ৪ লাখ ৯৯ হাজার ১৯ জন। অপরদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে বস্তি ১ হাজার ৭৫৫টি। বস্তিখানার সংখ্যা ৪০ হাজার ৫৯১টি। এখানে মোট জনসংখ্যা ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৬ জন।

ঢাকা উত্তর সিটির আদাবর থানায় ৪৭২ বস্তি, বাড্ডায় ১২১, বনানীতে ১০, দারুস সালামে ৫৪, ভাষানটেকে ৮, গুলশানে ৮, কাফরুলে ১০৯, খিলক্ষেতে ৭১, মিরপুরে ১১৭, মোহাম্মদপুরে ২৮৪, পল্লবীতে ৭০, রামপুরায় ১৬৮, শাহআলীতে ১৫ ও শেরেবাংলা নগরে ১৩৮টি বস্তি রয়েছে।

অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটির বংশাল থানায় ১৯ বস্তি, চকবাজারে ১৫০, ধানমন্ডিতে ১৭, গেন্ডারিয়ায় ৪৯, হাজারীবাগে ২৪৩, যাত্রাবাড়ীতে ১৬৫, কলাবাগানে ৫, কামরাঙ্গীরচরে ২৬৫, খিলগাঁওয়ে ৪২৬, কোতোয়ালিতে ৫, লালবাগে ২৭৮, মতিঝিলে ৪, নিউমার্কেট থানায় ৫, রমনায় ৮, শাহজাদপুরে ৭৯, শাহবাগে ৭, সূত্রাপুরে ৫ ও ওয়ারী থানায় ২৫টি বস্তি রয়েছে।

জরিপ অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১০ লাখ ৬২ হাজার ২৮৪ জন লোক বস্তিতে বাস করেন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম, এ বিভাগে বস্তিবাসীর সংখ্যা ৬ লাখ ৩৫ হাজার ৯১৬ জন। এ ছাড়া খুলনায় ১ লাখ ৭২ হাজার ২১৯ জন, রাজশাহীতে ১ লাখ ২০ হাজার ৩৬ জন, রংপুরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৬২৮ জন, সিলেট বিভাগে ৯১ হাজার ৬৩০ জন এবং বরিশাল বিভাগে ৪৯ হাজার ৪০১ জন বস্তিতে বাস করেন।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিগমা হুদা বলেন, বস্তিতে আগুন লাগার অন্যতম কারণ হচ্ছে নাশকতা। প্রভাবশালীরা আধিপত্য বিস্তারের জেরে অথবা দখল করার মানসে নিজস্ব ক্যাডার দিয়ে বস্তিতে আগুন লাগায়।

এ ব্যাপারে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টও আছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। কিন্তু এসব রিপোর্ট অজ্ঞাত কারণে আলোর মুখ দেখে না। কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না মূলহোতাদের বিরুদ্ধে। অথচ বিষয়টা কতটা অমানবিক।

বস্তিতে সাধারণত খেটে খাওয়া দিনমজুর ও নিম্নবিত্তের মানুষেরা থাকে। বস্তি পুড়ে যাওয়ায় তাদের খোলা আকাশের নিচে থাকা ছাড়া কোনা উপায় থাকে না।

সোনালীনিউজ/এমটিআই