মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই, ২০১৯, ৭ শ্রাবণ ১৪২৬

আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে …

আনওয়ারুল ইসলাম রাজু | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১৫ জুন ২০১৯, শনিবার ০২:১২ পিএম

আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে …

ঢাকা : ‘আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে; আসে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে’- ষড়ঋতুর লীলাবৈচিত্রে বিচিত্র বাংলাদেশের প্রকৃতিতে ঋতু পরিক্রমার পথ বেয়ে আবার এসেছে আষাঢ় বর্ষাঋতুর আগমনী গেয়ে। বজ্রমাণিক দিয়ে গাঁথা মেঘের মালা গলায় দিয়ে বর্ষারাণী বৃষ্টির রথে চড়ে আকাশ থেকে নেমে এসেছে সবুজ প্রকৃতির বুকে। আষাঢ়স্য প্রথম দিবসেই সুশীতল বারিধারার প্রথম পরশে দেশের অনেক স্থানে রূক্ষ-শুষ্ক প্রকৃতিতে জেগেছে প্রাণের পরশ, সবুজের সমারোহ লেগেছে দিকে দিকে। গাছে গাছে পাঁপড়ি মেলেছে কেতকী-কদম-কেয়া । ময়ুর-ময়ূরী নীল পেখম মেলে কলাপে মেতেছে। চিরবিরহী মানবমনে জেগে উঠেছে আবার কবিতা ও সুরের সেই চিরন্তন পংক্তিমালা- ‘এমন বাদল দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘন ঘোর বরিষায়…’ ।

বর্ষার বারিধারায় সিক্ত-সরস মাটিতে নতুন ফস ফলানোর সরব আয়োজনে বাংলার কৃষক উঠেছে মেতে । মূলতঃ কৃষিনির্ভর নদীমাতৃক আমাদের এই বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় বর্ষা আসে এক বিশেষ তাৎপর্যে। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে বর্ষা মানুষের জীবন ও জীবিকার সাথে অবিচ্ছিন্ন ভাবে সম্পর্কযুক্ত। বৃষ্টি না হলে গ্রীষ্মের খরতাপে দগ্ধ প্রকৃতি শীতর হয়না, ঊষর মাঠে ফসল ফলে না, গাছে ফুটেনা ফুল, ফলেনা রকমারি স্বাদের রসালো ফল। মানুষের মন অজানা আশংকায় কেঁপে ওঠে। বৃষ্টির প্রত্যাশায় তৃষিত চাতকের মত সবাই আকাশের পানে চেয়ে বিধাতার কাছে জানায় বৃষ্টির জন্য আকুল আবেদন- ‘আল্লাহ মেঘ দে, পানি দে, ছায়া দে রে তুই , আল্লাহ মেঘ দে, পানি দে…’ । অবশেষে মানুষের আর্ত-আহাজারিতে আল্লাহর রহমতের বারিধারা নেমে আসে আষাঢ়ের নবমেঘমালায় সওয়ার হয়ে- আশা ও আনন্দের বারতা নিয়ে।

কৃষিনির্ভর নদীমাতৃক এই দেশের প্রকৃতিতে বর্ষার যেমন রয়েছে বিশেষ প্রাধান্য, তেমনি এর মেঘমেদুর পরিবেশ আর অবিশ্রান্ত বারিধারার সুর ও ছন্দের মাঝে রয়েছে মানুষের মন-প্রাণকে উতলা করে তোলার এক অপূর্ব ক্ষমতা। তাইতো সেই আবহমান কাল ধরে এ দেশের সাহিত্য ও সঙ্গীতে আষাঢ় ও বর্ষা এক বিশেষ ব্যঞ্জণায় বাক্সময় হয়ে আছে। আষাঢ়ের প্রথম দিনে নানা আয়োজনে চলে এসেছে বর্ষাকে বরণ করে নেয়ার সুর ও বাণী-বন্দনা।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ এবং শিল্প-কলকারখানার অপরিকল্পিত সম্প্রসারণে বিশ্বজুড়ে মারাতœকভাবে বিঘিœত হয়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। ভারসাম্যহীন এই পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে দ্রুত বাড়ছে বিশ্ব উষ্ণায়নের মাত্রা। পরিবেশের এই বিপর্যয়ের কবলে নিপতিত এক কালের সবুজ-শ্যামল আমাদের এই বাংলাদেশও। যে কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে এদেশের ঋতুবৈচিত্র। বাংলাদেশে এখন আর ৬টি ঋতুর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। হারিয়ে গেছে ধ্রুপদী ধারার সেই বর্ষা ঋতু। সারা বছর জুড়ে এখন কেবল গ্রীষ্মকাল আর শীতকালকেই যেন অনুভব করা যায়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের সর্বত্র তাপমাত্রার পরিমান কাংখিত মাত্রার চেয়ে অনেক বেশী ছিল। অপরদিকে বৃষ্টিপাতের পরিমান ছিল কাংখিত মাত্রার চেয়ে অনেক কম। চলতি বছরও শীতকাল খুব বেশি প্রলম্বিত হয়নি। অনেকটা আগেভাগেই শীত বিদায় নেয়ার পর থেকে চলছে গ্রীষ্মের অস্বাভাবিক দাবদাহ। তীব্র দহনে এবার বির্যদস্থ হয়ে উঠেছে মানুষের জীবনযাত্রা। আবহাওয়া বিভাগের দেয়া তথ্য মতে এবছরও গোটা গরমকাল জুড়ে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ থেকে ৫ ডিগ্রি বেশি বিরাজ করছে। আবার, বৃষ্টিপাতের পরিমানও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম। রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন বিভাগে গত ২ মাসে কিছুটা বৃষ্টিপাত হলেও রাজধানীতে এর পরিমান অতি সামান্য। এবারের বর্ষা মওসুমেও কাংখিত বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা কম বলে আবহাওয়া বিভাগ আভাস দিচ্ছে। তবু এই বৈপরিত্যের মধ্যেও রাজধানীসহ সারা দেশে আষাঢ়ের প্রথম দিনে বর্ষাবরণ অনুষ্ঠানগুলোতে সমবেত কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে মেঘবৃষ্টির প্রত্যাশা- ‘এসো শ্যামল সুন্দর, আনো তব তাপহরা, তৃষাহরা সঙ্গসূধা; বিরহিনী চাহিয়া আছে আকাশে….’ ।

লেখক : সাংবাদিক


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।