মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০১৯, ৪ আষাঢ় ১৪২৬

আব্দুন নূর তুষার যেসব সত্য চেপে গেলেন

নাজমুল আরেফিন | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ৩০ এপ্রিল ২০১৯, মঙ্গলবার ১২:৪৬ পিএম

আব্দুন নূর তুষার যেসব সত্য চেপে গেলেন

নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় ওয়ানডে ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা আচমকা নিজ এলাকার হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে কোনো চিকিৎসককে উপস্থিত না পাওয়ার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সেসব চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।

বিনা অনুমতিতে হাসপাতালে অনুপস্থিত থাকা নড়াইল জেলা সদর হাসপাতালের চার চিকিৎসককে ওএসডি এবং চার চিকিৎসককে কারণ দর্শানোর নোটিশও দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে জনপ্রিয় উপস্থাপক ও ডা. আব্দুন নুর তুষার মাশরাফিকে এক হাত নিয়েছেন। সেখানে তিনি মাশরাফিকে কিছু প্রশ্নও করেছেন। যা ইতোমধ্যে ভাইরাল।

তবে যেহেতু তুষার নিজে ডাক্তারি পড়েছেন সেই জায়গা থেকে তিনি এই ঘটনায় ডাক্তারদের পক্ষ নেবেন সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তিনিতো এখন পেশায় সাংবাদিক। তার কাছ থেকে চিকিৎসা ব্যবস্থার পুরো চিত্রটা আসলে ভালো হতো।

তিনি ডাক্তারির সঙ্গে মাশরাফিদের ক্রিকেট খেলার তুলনা করেছেন নানান ‘নাই নাই’ দিক থেকে। যেটুকু আছে সেইটুকুর সদ্ব্যবহার না হওয়াটার কারণ হিসেবে তিনি ‘নাই নাই’ থিওরি আওড়রিয়েছেন পুরা লেখাটাতেই।

তবে তিনি যেসব জিনিস তুলে এনেছেন তার সবটুকুই গুরুত্বপূর্ণ সেটা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু প্রশ্ন আসে তিনি কি কি এড়িয়ে গেলেন-

১. আন্ডারস্টাফিং-এর যে সমস্যা সেইটা কোন সেক্টরে নেই? চিকিৎসক সংখ্যা সীমিত বলে একজন ডাক্তার আরও বেশি অনুপস্থিত থাকবে? মফস্বল এলাকায় এদের দিনের কতটুকু সময় প্রাইভেট প্র‍্যাক্টিস করে কাটে সেইটা তুষার এড়িয়ে গেছেন বেশ চতুরতার সঙ্গে।

২. রিসোর্স লিমিটেশন- নিয়ে অনেক কিছু লিখেছেন তিনি। যার সবকিছু সত্য। কিন্তু তিনি এড়িয়ে গেছেন এইসব জরুরি ইকুয়েপমেন্টস সরকারী হাসপাতালে নিশ্চিত করার জন্য ডাক্তারদের ভূমিকা কতখানি পালিত হয়েছে? এইসব সরবরাহ করার জন্য কতখানি চাপ তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দিয়েছেন? অনেক তুচ্ছ তুচ্ছ ঘটনাতেই আমরা ডাক্তাদের কর্মবিরতিতে যেতে দেখি। নানান দাবি আদায় করতে দেখি।

কিন্তু কোনদিন শুনতে পাইনি ডাক্তাররা সাধারণ রোগীর সেবা সরকারী হাসপাতালেই যাতে অনেকখানি নিশ্চিত করা যায় তার জন্য কিছু চেয়ে কর্মবিরতি কিংবা প্রতিবাদে গেছেন। দশকের পর দশক শুধু শুনেই আসছি ‘এই নাই, সেই নাই’। এই ধারা অব্যাহত থাকলে রোগীকে প্রাইভেট হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকে পাঠানো সোজা হয় সেটাও আমরা জানি। কিন্তু তুষার সাহেব সেটা এড়িয়ে গেছেন।

উনি অনেকবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়-ডিজি অফিসের কথা বলেছেন। সেইখানে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য বানানো পদগুলিতে শুধু রাজনৈতিক নেতা কিংবা আমলা থাকেন না। অনেক ডাক্তারও থাকেন। সারাদিন দলবাজি ছাড়া কি করেন তারা? কেন এইসব কেনাকাটাকে অগ্রতালিকায় আনেন না তারা? বরং সেগুলো না করে নিজেরা চিকিৎসা সেবা নিতে স্কয়ারের মত দামি হাসপাতালে ভীড় করে। তিনি এই সত্যগুলোও এড়িয়ে গেছেন।

৩. তিনি মাশরাফিদের ভালো খেললে গাড়ি-বাড়ি দেওয়া হয় বলেছেন। কিন্তু খারাপ খেললে যে দল থেকে বাদ পড়তে হয়। অসাদাচরণের জন্য বহিষ্কার হতে হয় সেইগুলা এড়িয়ে গেছেন। সরকারী ডাক্তারদের বেলায় এইসব অনুশীলন আছে? খারাপ পারফরম্যান্স দেখানো ডাক্তারদের কতজনের চাকরি গেছে এ পর্যন্ত?

৪. খাতা নেই কলম নেই। সরকার কিছু দেয় না। এইসব পেটি অভিযোগ তিনি তার লেখায় এনেছেন। অথচ বাস্তবতা হলো মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভরা তাদের কোম্পানির ওষুধ (বিশেষ করে এন্টিবায়োটিক) লেখার বিনিময়ে প্যাড থেকে শুরু করে বিদেশ ভ্রমণ, ঘরের এসি-ফ্রীজ এমন কিছু নেই যে ডাক্তারদের দেন না। যুগের পর যুগ এই অনুশীলন চলছে। এইসব উপঢৌকন যদি একজন আমলা নিত তাহলে সেইটাকে ঘুষ বলা হতো। কিন্তু ডাক্তারদের জন্য এইগুলো নিয়মে পরিণত হয়েছে। কেউ কিছু বলার নেই। দেখার নেই। কিন্তু এইসব অপ্রিয় সত্য তুষার সাহেব সামনে আনেননি।

বোধহয় দেশে এমন কোন ফার্মেসি নেই যেখানে ফিজিশিয়ান স্যাম্পল বিক্রি হয় না। অথচ এইগুলো ডাক্তারদের দেওয়া হয় রোগীদের দেবার জন্য। গুণাবলী বোঝার জন্য। কয়জন ডাক্তার আছে যারা অসহায় গরীব রোগীদের বিনামূল্যে এইসব স্যাম্পল দেন? বরং তাদের মাধ্যমে বেআইনি ভাবে সেগুলো ফার্মেসিতে চলে যায়।

ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কমিশনের কথা না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু এইসব সুযোগ সুবিধা ভোগ করার কথা তুষার সাহেব সামনে আনেননি।

মাশরাফির এ্যাপ্রোচে সমস্যা আছে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু চেকার না থাকা এরকম বেয়াড়া সিস্টেম যেখানে সেখানে এমপিরা আর কি করতে পারে? এইটুকু উদাহরণও এই দেশে নাই বলেই যে যা খুশি তাই করছে।


সোনালীনিউজ/ঢাকা/আকন


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।