মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬

আমাজনে সেনা মোতায়েনের নির্দেশ, ভয়াবহতার ছবিতে উদ্বিগ্ন বিশ্ব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৪ আগস্ট ২০১৯, শনিবার ০৩:২১ পিএম

আমাজনে সেনা মোতায়েনের নির্দেশ, ভয়াবহতার ছবিতে উদ্বিগ্ন বিশ্ব

ঢাকা : পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ হিসেবে পরিচিত অন্যতম বড় রেইন ফরেস্ট আমাজন। এমন পরিস্থিতিতে সেখানে সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জেইর বোলসোনারো।

ছোট-বড় মিলিয়ে ৪০ হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা একটু একটু করে শেষ করে দিচ্ছে পৃথিবীর ২০ শতাংশ অক্সিজেনের জোগানদাতা এই অরণ্যকে। প্রতিবছর ২শ কোটি মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এই বন।

আর সে কারণেই বিশাল এই বন ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ নামে পরিচিত। এছাড়া পৃথিবীর বেশিরভাগ নদীর উৎস আমাজন। এখানে রয়েছে ৪৫ লাখ প্রজাতির পোকামাকড়, বাস করে তিন শতাধিক উপজাতি।

আমাজনে ভয়াবহ আগুন নিয়ন্ত্রণে সেনা সদস্যরা যেন সহায়তা করেন সেজন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এক ডিক্রি জারি করে প্রকৃতি রক্ষা, আদিবাসী জমি ও সীমান্ত এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

ইউরোপীয় নেতাদের ক্রমাগত চাপের মুখেই এমন নির্দেশ দেয়া হলো। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এই ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে আটলান্টিকের উপকূল পর্যন্ত। এমনকি দুই হাজার মাইলেরও বেশি দূরে সাও পাওলোর আকাশ এই ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গেছে।

আমাজনের জঙ্গলের ভেতর প্রায় কয়েক হাজার স্থানে আগুন জ্বলছে। গত এক দশকে এমন ব্যাপক মাত্রায় সেখানে দাবানল সৃষ্টি হয়নি।

সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে উত্তরাঞ্চলীয় রোরাইমা, একার, রনডোনিয়া এবং আমাজোনা রাজ্য এবং কাছাকাছি মাতো গ্রোসো ডো সুল এলাকাতে। আগুন থেকে কুণ্ডলি পাকিয়ে ওঠা ধোঁয়া আমাজনের পুরো এলাকাজুড়ে এবং আশপাশে ছড়িয়ে পড়েছে।

আগুন থেকে প্রচুর পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হচ্ছে, যার পরিমাণ এ বছর ২২৮ মেগাটনের সমপরিমাণ দাঁড়িয়েছে। এই পরিমাণ ২০১০-এর পর সবচেয়ে বেশি।

এই ধোঁয়া থেকে কার্বন মনোক্সাইডও নির্গত হচ্ছে। কাঠ পোড়ালে সচরাচর এই গ্যাস নির্গত হয়। খুবই চড়া মাত্রায় বিষাক্ত এই গ্যাস কার্বন মনোক্সাইড দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল ছাড়িয়ে এখন আরও দূরে ছড়িয়ে পড়ছে।

আমাজনে এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে আন্তর্জাতিক সংকট বলে উল্লেখ করেছেন জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মেরকেল, ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন।

আগুনে ছাই হচ্ছে ‘পৃথিবীর ফুসফুস’, ভয়াবহতার ছবিতে উদ্বিগ্ন বিশ্ব : আগুণে পুড়ছে অ্যামাজন। সর্বগ্রাসী আগুণে ছাই হয়ে যাচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম ‘রেনফরেস্ট’।

ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্পেস রিসার্চ বলছে, এবারের অগ্নিকাণ্ড এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ।

স্যাটেলাইট ইমেজ ব্যবহার করে আগুনের বিস্তার মেপে ওই সংস্থা জানিয়েছে, ২০১৮ সালের তুলনায় ৮৩ শতাংশ বেশি পুড়ছে অ্যামাজনের সবুজ। গত প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে জ্বলতে থাকা ছোট-বড় আগুনের সংখ্যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ১৯৪টি।

ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্পেস রিসার্চ-এর হিসাব মতে, দাবানলে প্রতি মিনিটে অ্যামাজনের প্রায় ১০ হাজার বর্গমিটার এলাকা পুড়ে যাচ্ছে।

বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এ অবস্থা চলতে থাকলে জলবায়ু পরিবর্তনবিরোধী লড়াইয়ে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে।

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে থাকা অক্সিজেনের ২০ শতাংশেরই উৎপত্তি অ্যামাজনে। গবেষকদের মতে এই বন প্রতিবছর ২০০ কোটি মেট্রিক টন কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে। সে কারণে একে ডাকা হয়ে থাকে ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ নামে।

প্রতি মিনিটে ১০ হাজার বর্গমিটার পুড়ছে ‘পৃথিবীর ফুসফুস’, চিন্তিত বিশ্বনেতারা : পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে থাকা অক্সিজেনের ২০ শতাংশেরই উৎপত্তি অ্যামাজনে। গবেষকদের মতে এই বন প্রতিবছর ২০০ কোটি মেট্রিক টন কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে। সে কারণে একে ডাকা হয়ে থাকে ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ নামে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির হারকে ধীর করতে অ্যামাজনের ভূমিকাকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। বিশ্বের দীর্ঘতম এ জঙ্গলটির আয়তন যুক্তরাষ্ট্রের আয়তনের প্রায় অর্ধেক।

ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্পেস রিসার্স ২০১৩ সাল থেকে অ্যামাজন জঙ্গলে আগুন লাগা নিয়ে গবেষণা করছে। মঙ্গলবার (২০ আগস্ট) প্রকাশিত নতুন এক প্রতিবেদনে তারা জানিয়েছে রেকর্ড হারে পুড়ছে অ্যামাজন জঙ্গল। এরইমধ্যে ব্রাজিলের রোন্ডানিয়া, অ্যামাজোনাস, পারা, মাতো গ্রোসো অঞ্চলের কিছু অংশে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। অ্যামাজনে আগুন লাগা কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা নয়, কিন্তু এবারের মতো আগুন আগে কখনও ছড়ায়নি জঙ্গলে।

লাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশে অববাহিত হচ্ছে অ্যামাজন নদী। তবে এর বড় অংশই ব্রাজিলের এই বনটিতে। আইএনপি’র তথ্য অনুযায়ী বনটিতে প্রতি মিনিটে একটি ফুটবল মাঠের চেয়ে দেড় গুণেরও বড় এলাকা ধ্বংস হচ্ছে। ফিফার ফুটবল মাঠের মাপকে অনুসরণ করে হিসাব করলে, এই ধ্বংসের পরিমাণ প্রায় ১০,০০০ বর্গমিটার (৯,৬০০)।

দাবানল উপদ্রুত আমাজনকে সুরক্ষার আহ্বান জানিয়েছে ফ্রান্স ও জাতিসংঘ। এ বিষয়টি জি-৭ সম্মেলনের আলোচ্যসূচির শীর্ষে থাকা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রোন।

যদিও ব্রাজিলের ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট বোলসোনেরো বলেন, জি-৭ সম্মেলনে ব্রাজিল অংশগ্রহণ না করায় সেখানে এ অগ্নিকাণ্ড নিয়ে আলোচনা ভুল স্থানে উপনিবেশবাদী মানসিকতা উন্মোচিত করবে।

চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বৃষ্টিপ্রধান ক্রান্তীয় অঞ্চলের এই জঙ্গলে ৭৩ হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু গত সপ্তাহে সাও পাওলোসহ ব্রাজিলের কয়েকটি শহর ধোঁয়ায় রুদ্ধ হওয়ার অবস্থা তৈরি হয়েছে।

তবে এসব আগুনে বনাঞ্চলটির কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেন, এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

আমাজনে চলতি বছরের রেকর্ড অগ্নিকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক সংকট হিসেবে বর্ণনা করেন ম্যাঁক্রোন।

ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইনপে উপগ্রহ থেকে পাওয়া তথ্যে চলতি বছর ব্রাজিলজুড়ে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮৫ শতাংশ বেশি অগ্নিকাণ্ডের খবর জানিয়েছে।

এ অগ্নিকাণ্ডের বেশিরভাগই সংঘটিত হয়েছে আমাজন অঞ্চলে।

পরিবেশবাদীরা এ জন্য আমাজন নিয়ে বোলসোনেরো সরকারের নীতিকে দায়ী করছেন। কট্টর ডানপন্থী এ প্রেসিডেন্ট বন উজাড়ে কাঠুরে ও কৃষকদের উৎসাহিত করছেন বলেও অভিযোগ তাদের।

বোলসোনেরো প্রথম দিকে আমাজনের চলতি বছরের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের জন্য এনজিওকে দায়ী করলেও এ দাবির সমর্থনে কোনো প্রমাণ হাজির করেননি।

চলতি সপ্তাহে হতে যাওয়া জি-৭ সম্মেলনের আয়োজক দেশ ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাঁক্রোন আমাজনের স্বাস্থ্য নিয়ে বিশ্বের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন।

তিনি বলেন, আমাজন বনাঞ্চল- যে ফুসফুস আমাদের গ্রহের ২০ শতাংশ অক্সিজেন উৎপাদন করে তা পুড়ছে। জি-৭ সম্মেলনের সদস্য রাষ্ট্র, চলুন আগামী দুদিন এ জরুরি বিষয়টি নিয়েই আলোচনা করি।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় চিরহরিত বনাঞ্চলের অগ্নিকাণ্ড নিয়ে অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের মধ্যে আমরা অক্সিজেন ও জীববৈচিত্র্যের অন্যতম প্রধান উৎসের এমন ক্ষতি মেনে নিতে পারি না। আমাজনকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue