শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮, ৩০ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫

আমার নেতা হিরো আলম...!

বিনোদন প্রতিবেদক | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২০১৮, শনিবার ০৩:০৬ পিএম

আমার নেতা হিরো আলম...!

ঢাকা: মাত্র বছর দেড়েক আগের কথা যখন হিরো আলম সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি তাকে নিয়ে কিছু ব্যঙ্গ-কৌতুক ও ঠাট্টা-মশকরামূলক মন্তব্য ফেসবুকে ছড়াতে থাকে। ফেসবুক ব্যবহারকারীরা একে অন্যকে অপমান করার জন্য হিরো আলমের নাম ব্যবহার করতেন। যেমন কোনো প্রেম প্রত্যাখ্যাত যুবক যদি তার কাক্সিক্ষত প্রেমিকার কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া না পেতেন তবে তিনি মেয়েটিকে রাগিয়ে দেওয়ার জন্য বলতেন, তোমার মতো মেয়ের জন্য হিরো আলমই হলো উপযুক্ত পুরুষ।

একইভাবে মেয়েরাও কোনো ছেলের প্রতি নিজেদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য ঢেলে দেওয়ার জন্য বলতেন, তুই আসলে হিরো আলমের চেয়েও অধম। হিরো আলমকে নিয়ে বাকবিতন্ডার মাঝখানে অনেকে আবার তার কিছু মিউজিক ভিডিওর ক্লিপ অথবা বিশেষ ভঙ্গিমায় তোলা কিছু স্টিল ছবি বা স্থিরচিত্র আপলোড করে দিতেন। এরই মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে খবর বের হতে থাকল যে, হিরো আলম ঢাকা আসিতেছেন। এবার তিনি ঢাকা মাতাবেন। সব নায়কের ভাত মারবেন এবং সব নায়িকার ঘুম হারাম করে দেবেন।

আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, হিরো আলম সত্যিই ঢাকা এসেছেন এবং প্রথম আলো, এটিএন নিউজসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, অনলাইন পোর্টাল ও টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিয়ে নিজের স্বপ্নের কথা অকপটে এবং নির্দ্বিধায় বলে বেড়াচ্ছেন। আমি তার সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে জানলাম, বগুড়া শহরের কাছাকাছি ইরুলিয়ায় তিনি বসবাস করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিত এবং তিন সন্তানের জনক। তার স্ত্রীর নাম সুমী এবং ছেলেমেয়ের নাম কবির, আলো ও আঁখি। তার বয়স আনুমানিক তেত্রিশ-চৌত্রিশ বছর। তার চেহারা দেখে স্পষ্টতই বোঝা যায় তিনি দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য -পীড়িত একটি পরিবারে জম্ম  নিয়েছেন এবং শরীরে ক্ষুধা-দারিদ্র্য ও অপুষ্টির সীমাহীন হালহকিকত ধারণ করে চলেছেন। তিনি প্রথম দিকে সিডির ব্যবসা করতেন এবং পরে ডিশ অ্যান্টেনার ক্যাবল সংযোগের ব্যবসা শুরু করে স্থানীয়ভাবে মোটামুটি সচ্ছল জীবনযাপন করতে থাকেন।

এর পর থেকে তার মাথায় নায়ক হওয়ার স্বপ্ন জাগে। একই সময় তিনি নেতা হওয়ার বাসনায় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে মেম্বার পদে দাঁড়িয়ে সামান্য ভোটের ব্যবধানে দুবার পরাজিত হন। অর্থাৎ তিনি যেবার প্রথম মেম্বার পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তখন তার বয়স বড়জোর একুশ-বাইশ বছর ছিল এবং তার আর্থিক অবস্থাও ছিল বর্তমানের তুলনায় অনেক নড়বড়ে। আমি হিরো আলমের কয়েকটি মিউজিক ভিডিও দেখেছি যা শহরে বুদ্ধিজীবী, নাকউঁচু মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের লোকজনের কাছে হাস্যকর ও বিরক্তি উৎপাদনকারী বলে বিবেচিত হবে। কিন্তু দেশের প্রান্তিক খেটে খাওয়া নিরক্ষর বা অল্প শিক্ষিত লোকজনের কাছে হিরো আলমের মিউজিক ভিডিও ও নাট্যাংশগুলো বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং আগামীতেও পাবে। আমাদের দেশের বিপুলসংখ্যক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আহার-বিহার-বিনোদন এবং নিদ্রা সম্পর্কে যারা ধারণা রাখেন না অথবা ওই শ্রেণির মানুষের ঘৃণ্যবোধ, বিশ্বাস-ভালোবাসা ও আবেগের প্রতি শ্রদ্ধা দেখান না তারা হিরো আলমকে একজন বিরক্তিকর ও উপদ্রবকারী যুবকই ভাববেন। তারা হিরো আলমের চলাফেরা, কথাবার্তা, স্বপ্ন ও কাজকর্মকে দেশের উন্নয়ন, আভিজাত্য এবং বৈশিষ্ট্যের জন্য অপমানজনক চপেটাঘাত ভেবে তার কথা শোনামাত্র অপমানে গজগজ করে লঙ্কাকা- ঘটাবেন।

হিরো  আলম যত দিন বগুড়া ছিলেন তত দিন হয়তো তিনি শহুরে নাকউঁচু শ্রেণির হিংসাদ্বেষ, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও অপমান করার সুতীব্র ক্ষমতা সম্পর্কে বেখবর ছিলেন। কিন্তু রাজধানীতে পা দেওয়ার পর তথাকথিত সভ্যদের অসভ্যতামিতে তার মনে হয়তো প্রবলভাবে জিদ চেপে যায়। দেবব্রত সিংহের বিখ্যাত তেজ কবিতার নায়িকা সাজলীর মতো হিরো আলমও এগিয়ে যাওয়ার জন্য জিদ ধরেন। তার অসম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, আঞ্চলিকতা-দোষে দুষ্ট কথাবার্তা, রোগা-পাতলা কৃষবর্ণের শরীর, চেহারা সুরতের বেহাল অবস্থা, নন গ্ল­ামারার্স অভিব্যক্তি এবং আর্থিক সংকট সম্পর্কে তিনি অনেক আগে থেকেই সচেতন ছিলেন। ঢাকা আসার পর তার হয়তো মনে হয়েছে যে, তার ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো কিছু ঈর্ষাপরায়ণ সমালোচক হিংসুটে অকর্মণ্য বাচাল ও কুঁড়ে স্বভাবের বোকাসোকাদের জন্য সমস্যা হতে পারে কিন্তু তার অগ্রযাত্রার জন্য ওগুলো কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না।

হিরো আলম ঢাকার অভিজাত বিপণিবিতানগুলোয় ঘুরতে থাকেন। ধনাঢ্য পরিবারের সুন্দরী ললনা ও কেতাদুরস্ত যুবকরা তাকে দেখে হৈহৈ করে উঠতে থাকলেন। তাকে অপমান করার জন্য কেউ বা এগিয়ে গিয়ে বললেন, স্যার! আমি আপনার ভক্ত! অটোগ্রাফ প্লি­জ! কেউ হয়তো তার সঙ্গে সেলফি তুললেন। তারপর সেই যুবক-যুবতীরা বাসায় ফিরে নিজেরা ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপ বানিয়ে সেখানে বলতে থাকলেন ‘জানেন! আজ আমার জীবনের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটেছে আমার স্বপ্নের নায়ক কলিজার টুকরা গিলামণি-চানপাখি হিরো আলমকে দেখতে পেলাম। ওমা! স্যার যে এত সুন্দর! এত স্মার্ট তা চোখে না দেখলে বুঝতেই পারতাম না জানেন! আমি না স্যারের অটোগ্রাফ নিয়েছি সেলফিও তুলেছি...। যুবক-যুবতীরা তাদের ধারণকৃত ভিডিও ফেসবুকের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে থাকলেন। অন্যদিকে হিরো আলম এসব পাত্তা না দিয়ে তার কাজ চালিয়ে যেতে থাকলেন। তিনি টেলিভিশন অফিস, পত্রিকা অফিস এবং নাটক ও সিনেমার পরিচালকদের পাশাপাশি কয়েকটি নামকরা বিজ্ঞাপনী সংস্থায় হাজির হয়ে নিজের স্বপ্ন অর্থাৎ মূলধারার নাটক-সিনেমা ও বিজ্ঞাপনে অভিনয়ের ব্যাপারে নিজের আশা-আকাক্সক্ষা ও স্বপ্নের কথা ফেরি করতে আরম্ভ করলেন।

আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, লোকজনের ঠাট্টা-মশকরা, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ইত্যাদির উপলক্ষ হয়ে হিরো আলম ২০১৭ সালের শেষ প্রান্তিকে এসে সত্যিই এক আলোচিত চরিত্রে পরিণত হলেন। ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো সুবিশাল বিশ্বমাধ্যমে হিরো আলমের নাম এত বেশি উচ্চারিত হতে থাকল যার শতকরা এক ভাগও অনেক মন্ত্রী-এমপি বা নায়ক-নায়িকার নামে হয়নি। এরই মধ্যে তার একটি বিজ্ঞাপনচিত্র টেলিভিশনে প্রচারিত হতে দেখলাম এবং আরও শুনলাম যে মূলধারায় দু-একটি টেলিভিশন নাটকেও নাকি তিনি অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন। তা ছাড়া কিছু চলচ্চিত্রেও তাকে কাস্ট করার চিন্তাভাবনার কথাও জানতে পারলাম। এতসব লঙ্কাকান্ডের মধ্যে হিরো আলমের পরিচিতি ও তার ভক্ত-অনুরক্তের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা এমন পর্যায়ে পৌঁছল যে, তার নামে ফেসবুকে একটি ফ্যান পেজ খোলা হলো যেখানে ভক্ত-অনুরাগীদের লাইফের সংখ্যা দাঁড়াল ৩ লাখের ওপর। ফলে তাকে নিয়ে প্রথম দিকে যে তুচ্ছতাচ্ছিল্য শুরু হয়েছিল তাতে কিছুটা হলেও ভাটার টান শুরু হলো।

কয়েক মাস আগে হিরো আলমকে নিয়ে দুটো চাঞ্চল্যকর ঘটনার খবর বের হয়েছিল। একটি খবরে জানতে পারলাম, হিরো আলম ভারতের চলচ্চিত্র নগরী মুম্বাই গিয়েছেন। মুম্বাইকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চলচ্চিত্র শহর। চলচ্চিত্রের ভাষায় যার নাম বলিউড। বলিউডে গিয়ে হিরো আলম মেগাস্টার শাহরুখ খানের সঙ্গে সেলফি তুলেছেন এবং সেই ছবি তার ফেসবুকে আপলোড করতে গিয়ে তিনি জীবনে প্রথমবারের মতো তাকে নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা লোকজনের সঙ্গে কিঞ্চিৎ ব্যঙ্গ করেছেন। ছবির ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, ‘শুনুন! শাহরুখ আমার সঙ্গে সেলফি তুলছেন আমার ভক্ত শাহরুখের প্রতি ভালোবাসা।’ ঘটনা এখানেই শেষ নয়, দ্বিতীয় চাঞ্চল্যকর কাহিনীর কারণে হিরো আলম বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকা এবং কলাকুশলী তথা চলচ্চিত্র পরিবারের মন-মনন ও মস্তিষ্কে বজ্রাঘাত বসিয়ে দিলেন। পত্রিকার মাধ্যমে জানলাম, হিরো আলম বলিউডের একটি সিনেমায় অভিনয়ের কথাবার্তা পাকা করে ফেলেছেন। সেখানকার একজন নামি চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক প্রতিষ্ঠান তাদের সিনেমায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের নায়কদের প্রতিনিধিত্ব করে বা নায়কদের নেতা এমন একটি চরিত্রে অভিনয়ের জন্য হিরো আলমকে মনোনীত করেছেন।

উল্লিখিত খবর যখন বাংলাদেশে প্রকাশিত হলো তখন দেশের বিনোদন জগতে রীতিমতো কান্নার রোল পড়ে গেল। শোকে-দুঃখে অভিমানে তারা প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেললেন। কেউ কেউ ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালকদের গালি দিয়ে বললেন, ওরা হিরো আলমকে অভিনয়ের সুযোগ দিয়ে তাদের দর্শকদের বোঝাতে চাইছে যে বাংলাদেশি নায়করা আসলে এমনই। তারা কি বাংলাদেশে আর কোনো লোক খুঁজে পেল না। হিরো আলমকে আমাদের নেতা হিসেবে পরিচয় করিয়ে না দিয়ে যদি আমাদের পশ্চাৎদেশ, চোখ ও কানে বোম্বাই মরিচ ঘষে দিত তবে চোখ-কান বন্ধ করে উদোম হয়ে লাফাতে পারতাম। এখন তো না পারব বলতে আর না পারব সহ্য করতে।

দেশে-বিদেশে যখন হিরো আলমকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছিল ঠিক তখন একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে তিনি আরও একটি ব্লøক বাস্টার আলোচনা-সমালোচনার সুনামি সৃষ্টি করে দিলেন। তিনি সংসদ নির্বাচনে এমপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য এরশাদের জাতীয় পার্টি থেকে নমিনেশন কিনলেন। সারা দেশে হায় হায় রব পড়ে গেল। পত্রিকাওয়ালারা ছুটলেন হিরো আলমের পেছনে। টেলিভিশনওয়ালারা তার সাক্ষাৎকার নিলেন। আধুনিকা উপস্থাপিকা তির্যক প্রশ্নবাণে হিরো আলমকে বিব্রত করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তিনি ঘাবড়ালেন না। বেশ সাবলীলভাবেই জবাব দিলেন যে, তিনি যখন মেম্বারি ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন ঠিক তখনই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ভবিষ্যতে যদি ইলেকশন করেন তো বড়টাই করবেন। এমপি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে যারা তার যোগ্যতা নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেন তাদের তিনি বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি কালো আমার চেহারা খারাপ এটা তো আমার কোনো দোষ নয়। যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন তিনিই ভালো জানেন। তিনি আরও বলেন, আমি দরিদ্র, ভালোমতো শুদ্ধ করে কথা বলতে পারি না এবং তেমন লেখাপড়াও জানি না। তবে আমাকে নিয়ে যারা সমালোচনা করেন তারা যদি আমার মতো পরিবেশে জম্ম  নিতেন তবে আমি আমার জম্ম  স্থান থেকে আজ যত দূর এসেছি তার একাংশও তারা পাড়ি দিতে পারতেন না এমনকি আমার পাশে বসারও সাহস পেতেন না।

হিরো আলম আরও বলেন, সমালোচনা করা সহজ, কিন্তু কাজ করার স্বপ্ন দেখা অত সহজ নয়। আবার স্বপ্নকে সফল করার জন্য যে চেষ্টা করতে হয় তা আরও কঠিন। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারে নিজের প্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে যারা বিদ্রুপ করার চেষ্টা করেছেন তাদের তিনি সোজাসুজি জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি শুধু এমপি নন, আরও বড় কিছু হবেন। জাতীয় পার্টি যদি ক্ষমতায় যায় তবে তিনি মন্ত্রীও হতে পারেন। তার সোজাসাপটা উত্তরের কারণে কেউ আর তাকে নতুন করে ঘাঁটাতে সাহস পাননি। তবে তার প্রার্থী হওয়া এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সাক্ষাৎকার নিয়ে সামাজিক মাধ্যমগুলো সরগরম হয়ে উঠেছে। যারা বর্তমান রাজনীতির প্রতি প্রচন্ড বিরক্ত ও বিক্ষুব্ধ তারা রীতিমতো হিরো আলমের ভক্ত সেজে আকর্ষণীয় বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন।

অন্যদিকে যারা মনে করছেন হিরো আলমের এমপি হওয়ার বাসনার মাধ্যমে মূলত রাজনীতিবিদ ও অভিজাততন্ত্রকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করার অপকৌশল রয়েছে। কোনো অতিবুদ্ধিমান হয়তো হিরো আলমকে দিয়ে এমপি নির্বাচন করানোর ঘোষণা দিয়ে পুরো রাজনীতির অঙ্গনকে অপমান করার নীলনকশা প্রণয়ন করেছেন। কারণ যার নুন আনতে পানতা ফুরোয়, ছেলেমেয়েরা ঠিকমতো তিন বেলা খেতে পারে না। বৃদ্ধ পিতা-মাতা, স্ত্রী ও সন্তানদের ছেড়ে যে ছেলে বান্ডুলে হয়ে ঘুরে বেড়ায় এবং যে কিনা ঠাট্টা-মশকরা ও প্রশংসার পার্থক্য না বুঝে একের পর এক লোক হাসানো কর্ম করে এবং সেই কর্মকে সফলতা ও জনপ্রিয়তার কারণ মনে করে তাকে সংশোধন বা সতর্ক না করে উল্টো পামপট্টি দিয়ে আমাদের সমাজের একাংশ যা শুরু করেছে তা এক ধরনের সামাজিক অবক্ষয় এবং বিকারগ্রস্ততার নমুনা।

হিরো আলমকে নিয়ে আমাদের সমাজের দায়িত্ববানদের অনেকেই বিব্রত। কিন্তু কেউ মুখ ফুটে কিছু বলছেন না নিজের গায়ে কাদা লাগার ভয়ে। অন্যদিকে হিরো আলমের সমর্থকরা যা বলছেন তার মোদ্দা কথা হলো, গণতন্ত্রে যে কেউ জনপ্রতিনিধি হওয়ার আগ্রহ দেখাতে পারে এবং জনগণ যাকে নির্বাচিত করবে তার প্রতি সবার শ্রদ্ধা দেখানো উচিত। গণতান্ত্রিক বিশ্বে হিরো আলমের চেয়েও দুর্দশাগ্রস্ত প্রান্তিক লোকজন এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন। ভারতের দস্যুরানী ফুলনও সে দেশের সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আমেরিকার সর্বকালের সেরা রাষ্ট্রপতি আবরাহাম লিঙ্কন, ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জন মেজর প্রমুখের শৈশব ও কৈশোর হিরো আলমের চেয়েও দারিদ্র্যপীড়িত এবং তুচ্ছতাচ্ছিল্যময় ছিল। হিরো আলমের উগ্র সমর্থকরা ফেসবুকে নানারকম চুবোল বাক্য প্রয়োগ করে তাদের নেতার পক্ষে সাফাই গাইছেন এবং নেতার সমালোচনাকারীদের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে চলেছেন। ফলে হিরো আলম কেবল জাতীয় পার্টির নমিনেশন পেপার কিনেই রীতিমতো তারকা রাজনীতিবিদ হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছেন।

আমি মনে করি, হিরো আলমের এমপি হওয়ার চেষ্টা গণতান্ত্রিক উন্নত দেশগুলোয় কারও নজর কাড়ত না। এমনকি উন্নত সমাজ তার কাক্সিক্ষত বাউ-লেপনা, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে দায়িত্বহীন আচরণ এবং অশ্ল­ীল ভিডিও দৃশ্যে মেয়েদের সঙ্গে নাচানাচি নিয়েও মাথা ঘামাত না। কারণ ওইসব সমাজ দেশ ও রাষ্ট্রের মৌল ভিত্তি এতটাই সুদৃঢ় যে ওখানে সততা, মেধা ও পরিশ্রম ছাড়া কোনো কিছু অর্জন করা যায় না। ওসব দেশে কারও উদ্ভাবনী ক্ষমতা, ব্যতিক্রমী মননশীলতা ও নেতৃত্বগুণ না থাকলে কেউ কোনো দিন সাধারণ মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে না। উন্নত সমাজ অশ্ল­ীলতা, অর্থহীন হম্বিতম্বি, রঙ্গতামাশা-গালগল্প ইত্যাদিকে পাত্তা দেয় না এবং সমাজ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে এমনভাবে এড়িয়ে যায় যার ফলে মন্দ বিষয়গুলো রোগবালাইয়ের মতো বিস্তার লাভ করতে পারে না। কিন্তু আমাদের দেশ-প্রকৃতি ও পরিবেশ তো উন্নত দেশের মতো নয়। এ দেশে মশা-মাছির মতো ক্ষুদ্র প্রত্যঙ্গও হাতি-মহিষ-বাঘ-ভালুকের জীবন অতিক্রম করার ক্ষমতা রাখে। এমনকি মশা-মাছিবাহিত জীবাণু আক্রান্ত হয়ে মানুষসহ বনের বড় বড় হিংস্র জন্তু-জানোয়ার বেঘোরে মারা পড়ে।

আমাদের দেশের মানুষ প্রকৃতিগতভাবে রঙ্গপ্রিয়। তারা কাজের চেয়ে অলসতাকে বেশি পছন্দ করে। পরিশ্রম করার চেয়ে চিন্তা-ভিক্ষা করে অথবা অপহরণ-চুরি-চামারি, সুদ-ঘুষ, দুর্নীতি, লোপাট ইত্যাদির মাধ্যমে ধন-সম্পত্তি, পদ-পদবি ইত্যাদি হাসিল করতে বেশি পছন্দ করে। তারা আপন স্ত্রী বা স্বামীর চেয়ে পরনারী বা পরস্বামীর মধ্যে রূপ-যৌবন ও ভালোলাগার উপকরণ খুঁজে বেড়ায়। তারা প্রেমের চেয়ে পরকীয়া ও সাধনা করার চেয়ে জোর জবরদস্তি-কে মনের মধ্যে লালন করতে থাকে। আমাদের দেশকে বলা হয় সব সম্ভবের দেশ। এখানে বড় বড় পদ-পদবি পাওয়ার জন্য শিক্ষা-দীক্ষা-সততা-মেধা ও পরিশ্রমের চেয়ে তেলবাজি, উপরওয়ালার দয়া-করুণা, স্বজনপ্রিয়তা ইত্যাদি বেশিমাত্রায় কার্যকর। এখানে লেখাপড়া না জেনেও বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক হওয়া যায়। চোর হয়েও সাধু-সন্ন্যাসীদের সভাপতির পদ অলঙ্কৃত করা সম্ভব। এ দেশের বড় বড় নির্বোধ বহুবার বড় বড় পন্ডিতের শিক্ষক হিসেবে আশ্চর্য সফলতা দেখিয়েছেন। অদক্ষরা দক্ষদের প্রশিক্ষক, ডাকাত হয়েও সম্পদের রক্ষক, অপরাধী হয়েও নিরপরাধীর দন্ডমুন্ডের কর্তা হওয়ার ঘটনা যেখানে অহরহ সেখানে হিরো আলম যদি আমার নেতা হন কিংবা মন্ত্রী হন তাহলে তো আমি নতুন কোনো সমস্যা দেখছি না।

আমাদের সমাজে যারা হিরো আলমকে নিয়ে নাক সিটকাচ্ছেন তারা যদি তাদের আশপাশে লক্ষ্য করেন তবে আপন পরিবার, সমাজ ও পথ-মাঠ-শহর বন্দরে বিভিন্ন সুরতে অনেক প্রতিষ্ঠিত এবং উচ্চপদস্থ হিরো আলমকে দেখতে পাবেন। সেসব ক্ষমতাবান হিরো আলমের কাছে সকাল-সন্ধ্যায় মাথা নত করে অথবা সেসব হিরো আলমের সব উৎপাত সহ্য করার পর বগুড়ার এক হতদরিদ্র সরল-সোজা যুবকের নেহাত সোজা-সাপটা চিন্তা-ভাবনা ও রাখঢাকবিহীন কথাবার্তায় বিরক্ত হওয়া একেবারে বেনানান। এসব না করে আমাদের ভাবা উচিত কোনো একজন স্বপ্নবিলাসী যুবক যে কিনা নিজ সন্তানের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষার পেছনে অর্থ ব্যয় না করে তিন-চার মিনিটের নাচ-গান বা নাট্যাংশের ভিডিও ক্লিপ বানিয়ে শাহরুখ খান, সালমান খান অথবা আমির খানের মতো জনপ্রিয় ও বিখ্যাত নায়ক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন সেই তিনি কেন সংসদ সদস্য হতে চাচ্ছেন অথবা কেন তিনি ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার হওয়ার চেয়ে এমপি হওয়াটাকে সহজ মনে করলেন।

আপনি যদি হিরো আলমের কথাবার্তা-কাজকর্ম ও চিন্তা-ভাবনা ও স্বপ্নবাসরের মধ্যে কোনো অর্থ খুঁজে না পান তবে তার দিকে তাকিয়ে সময় নষ্ট না করাই উত্তম। আপনি যদি তার কর্মকান্ডে কৌতুক অনুভব করেন তবে প্রাণভরে আনন্দ নিতে থাকুন। আপনি যদি তার দ্বারা অপমানবোধ করেন তবে তার পেছনে না লেগে অপমানের উৎসমূলে হাত দিন এবং ভাবতে থাকুন, তিনি দেশের বৃহত্তম একটি রাজনৈতিক দলের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। অন্যদিকে কিছু লোক তাকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য উৎসাহিত অথবা প্ররোচিত করছেন। কাজেই যদি এমন ঘটনা ঘটে ইলেকশন হলো এবং দেখা গেলো হিরো আলমের কাছে বেগম খালেদা জিয়ার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে তাহলে আপনি কাকে গালি দেবেন অথবা কাকে ধন্যবাদ দেবেন। অথবা কাকে দায়ী করবেন এবং কাকে দোষারোপ করবেন। এসব নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করার আগে একটিবার একটু মাথা ঠান্ডা করে বলুন তো সব সম্ভবের দেশে এটা কি অসম্ভব যে হিরো আলম বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হয়ে গেলেন এবং মহলবিশেষের দয়া ও আনুকূল্যে একটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হয়ে আপনাকে অবাক করে দিলেন! সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

সোনালীনিউজ/বিএইচ