মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই, ২০১৯, ১ শ্রাবণ ১৪২৬

৭১ বছরে যাত্রা

আ.লীগের দুর্ভাবনা অনুপ্রবেশকারী

বিশেষ প্রতিনিধি | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ২৪ জুন ২০১৯, সোমবার ০৩:৫২ পিএম

আ.লীগের দুর্ভাবনা অনুপ্রবেশকারী

ঢাকা : প্রতিষ্ঠার ৭০ বছর পূর্ণ করে রোববার (২৩ জুন) থেকে ৭১-এ পা রাখার ক্ষণে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মনে দলকে নিয়ে নানা পরিকল্পনা ও স্বপ্নের সঙ্গে কিছু দুর্ভাবনাও ছিল। সাত দশকে দলটির গৌরব, ঐতিহ্য, সাফল্য ও অর্জনের অজস্র ইতিহাস ও স্মারক থাকলেও এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ভাবনায় যোগ হয় দলে অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়টি। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে দলের তৃণমূল-সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মাথাব্যথার বিশেষ কারণ অনুপ্রবেশকারীরা।

তাদের অভিযোগ, ক্ষমতায় থাকার সুবাদে দলের নাম ভাঙিয়ে ফায়দা লুটে নেওয়ার পাশাপাশি বহিরাগতরা দলের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বহিরাগতদের দল থেকে বের করে দিয়ে আদর্শিক ও নিষ্ঠাবান নেতাকর্মীদের গুরুত্ব দিয়ে দলকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, এমন ভাবনা ও পরিকল্পনা বিশেষভাবে ছিল আওয়ামী লীগের এবারের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের অভিযোগেও উঠে আসে দলের নাম ভাঙিয়ে অনুপ্রবেশকারীদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার কথা।

দলে তাদের খবরদারি, দল ও সরকারের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ করার মতো নানা কর্মকাণ্ডে তৃণমূল খুব ক্ষুব্ধ। ধীরে ধীরে অনুপ্রবেশকারীরা দলকে ‘গ্রাস করে নেওয়ার’ অভিযোগও করছে তৃণমূল। দলে ভেড়া সুযোগসন্ধানীদের শনাক্ত করে জবাবদিহির আওতায় আনার পরামর্শ তৃণমূলের। তবে দলে ঠাঁই নেওয়া অনুপ্রবেশকারী ও বহিরাগতদের চিহ্নিত করে দল থেকে বাদ দেওয়ার শুদ্ধি অভিযান শুরু হওয়ার আগেই তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে এ নিয়ে নানা সংশয়েরও জন্ম হয়েছে।

ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা যেভাবে বলা হচ্ছে, বাস্তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না, এ বিষয়ে সন্দিহান তৃণমূলের অনেকে। অনুপ্রবেশকারীদের প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ আছে দলের দাপুটে ও প্রভাবশালী নেতাদের বিরুদ্ধে। বহিরাগতদের দলে ভিড়িয়ে তারা নিজেদের অনুসারী ও দলবলের সংখ্যা ভারী করে নানা ফায়দা লুটছেন।
এসব নেতা অভিযান চলাকালে নানা কায়দা-কানুন করে সুবিধাভোগী ও অনুপ্রবেশকারীদের দলে রাখার চেষ্টা করবেন বলেও তৃণমূলের সন্দেহ। ফলে গতকাল দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের নানা আয়োজনের মধ্যে অনেকের মনে দুশ্চিন্তার ছাপ ছিল।

তৃণমূলের অভিযোগ, অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছেন দলের যেসব কেন্দ্রীয় নেতা, তাদের মধ্যে কয়েকজনের হাত ধরেও জামায়াত-বিএনপির নেতারা আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব নেতা চাপে পড়ে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিলেও তাদের দল থেকে বের করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপের পক্ষে থাকবেন বলে মনে করেন না তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

দলের টিকেটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের ছত্রছায়ায় অনুপ্রবেশকারীরাই দেশের বিভিন্ন এলাকায় মুখ্য ভূমিকা রাখছেন। তাদের প্রভাবে কোণঠাসা ত্যাগী নেতাকর্মীরা। তবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা একদিকে যেমন নিজেদের উপেক্ষিত মনে করছেন, তেমনই আশায় আছেন দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দল সুবিধাবাদীদের কবলমুক্ত হবে।

সুদিনের মধুর আশায় দলে ভেড়া সুবিধাবাদীদের আমলনামা জেনে কেন্দ্রীয় অনেক নেতাও অবাক ও বিস্মিত হচ্ছেন। তাই দেশজুড়ে চলমান আওয়ামী লীগের এবারের সাংগঠনিক সফরে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে দলে অনুপ্রবেশকারী ও হাইব্রিড নেতাকর্মীদের বিষয়টি। কেন্দ্রীয় নেতারা গুরুত্বের সঙ্গে অভিযোগ শুনে অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা তৈরি করছেন। তালিকার ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করে অভিযোগ প্রমাণ হলে দলে ‘উড়ে এসে জুড়ে বসাদের’ দল ও সংগঠনের সব পদ থেকে ছেঁটে ফেলা হবে। এ বিষয়ে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব নীতিগত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানায় দলটির উচ্চপর্যায়ের সূত্র।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ কয়েক নেতা জানান, টানা ১০ বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকায় দলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শবিরোধী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী অনেক অনুপ্রবেশকারী ঢুকেছেন। যারা বিভিন্ন সময়ে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন।

গত দশ বছরে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠাকিভাবে সারা দেশে জামায়াত-শিবির, বিএনপি ও অন্যান্য দলের কমপক্ষে ৬০ হাজার নেতাকর্মী ও সমর্থক আওয়ামী লীগে যোগ দেন। অনেকে অতীতের পরিচয় গোপন করছেন, আবার অনেকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে দলে ভিড়েছেন বলেও অভিযোগ আছে। অতীতের নানা মামলা থেকে রেহাই পেতেও অনেকে এখন সরকারি দলের ছায়ায় আছেন। দলে যোগ দিয়েই তারা তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন ও কমিটির পদ দখল করেন। তৃণমূল আওয়ামী লীগে গুরুত্বপূর্ণ পদেও নেতৃত্ব দিচ্ছেন জামায়াত-বিএনপি থেকে আসা নেতাকর্মীরা।

অনেক সুবিধাবাদী দলে ঢুকেছে। আর এ বাস্তবতা মেনে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বারবার বলছেন। অনুপ্রবেশকারীদের যারা দলে জায়গা করে দিয়েছেন, সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে তাদের বিরুদ্ধেও। পাশাপাশি দায়িত্বশীল কেউ জামায়াতিদের সঙ্গে আঁতাত করেছেন বলে প্রমাণ হলে তার বা তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলে এসে ঠাঁই নিলেও সাবেক জামায়াতির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গাইবান্ধা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সৈয়দ শামসুল আলম হিরু মুঠোফোনে বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের সুযোগসন্ধানী অনেক নেতারা আওয়ামী লীগে ঢুকে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন। দলে যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ সৈনিক, তার কন্যা শেখ হাসিনার নিঃস্বার্থ অনুসরণকারী, তারা অনেক পিছিয়ে আছে।’

নওগাঁ জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি কাজী রেজা বলেন, ‘দলকে যদি ভালোভাবে টিকিয়ে রাখতে হয়, তাহলে দলে সংস্কার প্রয়োজন। দলে অনেক চোর, ডাকাত, সন্ত্রাসী ও টাকার বিনিময়ে নেতা হওয়া লোকজন দলকে গ্রাস করে ফেলেছেন। তাদের চিহ্নিত করে দল থেকে বাদ দিয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসরণকারী নেতাকর্মীদের দলে আনা প্রয়োজন।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘এখন সবাই আওয়ামী লীগ হয়ে গেছে। এদের সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।’ দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান দলের সাংগঠনিক সফর সম্পর্কে বলেন, ‘সংগঠনের ভেতরে কোনো অশুভ শক্তি আছে কি না, কোনো অনুপ্রবেশকারী আছে কি না, এসব বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।’

দলের আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ‘সফরের মধ্য দিয়ে আমরা একদম তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত কমিটির ঠিকানা সংগ্রহ করছি। ডাটাবেসে তৃণমূলের সব নেতাকর্মী ও সংগঠকের নাম লিপিবদ্ধ থাকবে মুঠোফোন নম্বরসহ।’

সোনালীনিউজ/এমটিআই

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on google play Get it on apple store
Sonali Tissue