শুক্রবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬

আলু উৎপাদনে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত

আবদুল হাই রঞ্জু | সোনালীনিউজ ডটকম
আপডেট: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, সোমবার ০১:৪০ পিএম

আলু উৎপাদনে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত

ঢাকা : এখন গোটা দেশেই কমবেশি আলুর চাষাবাদ হয় তবে উত্তরাঞ্চলে একটু বেশি। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আলুর ফলন ভালো হয়েছে। আলু তোলার ভরা মৌসুম আসতে আরো কয়েকদিন লাগবে। যারা আগাম আলু চাষ করেছেন, তারা আলু তুলে প্রতি কেজি ২৫ থেকে ২৭ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। আলুচাষিরা ভালো দাম পাওয়ায় বেজায় খুশি।

বিশেষ করে সিরাজগঞ্জ, জয়পুরহাট, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে ব্যাপক আলুর চাষাবাদ হচ্ছে। যদি আলু তোলার ভরা মৌসুম পর্যন্ত ঝড়-বৃষ্টি না হয়, তাহলে আলুর বাম্পার ফলন হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে চিরাচরিত যে নিয়ম, তার হয়তো ব্যতিক্রম হবে না। কারণ আমাদের দেশে কোনো পণ্যের বাড়তি ফলন হলেই কৃষকের কপাল পোড়ে। আলুর ক্ষেত্রেও কপাল পোড়ার ঘটনা বেশি ঘটে। আলু পচনশীল সবজি। বেশিদিন আলু মজুত রাখতে হলে হিমাগারের বিকল্প নেই।

কিন্তু যে হারে আলুর আবাদ বাড়ছে, সে তুলনায় হিমাগার নির্মিত হচ্ছে না। ফলে অনেক সময় আলুচাষিরা সংরক্ষণের অভাবে কম দামেই বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে অনেক সময় আলুচাষিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। ফলে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। অথচ চরাঞ্চলের দো-আঁশ মাটিতে এখন প্রচুর আলুর চাষাবাদ হচ্ছে। মনে হয় আলু উৎপাদনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। পত্রিকায় দেখলাম, সিরাজগঞ্জ জেলার চরাঞ্চলের ২৭টি ইউনিয়নে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২৫ ভাগ বেশি জমিতে আলুর চাষ হয়েছে।

সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ৯টি উপজেলায় আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ২ হাজার ৯৯০ হেক্টর জমি ধরা হলেও চাষ হয়েছে ৩ হাজার ২৪০ হেক্টরে। আলু উৎপাদনে আরেক উদ্বৃত্ত জেলা জয়পুরহাট। এ বছর জয়পুরহাট জেলায় আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৩৭ হাজার ৯৫০ হেক্টর নির্ধারিত থাকলেও চাষ হয়েছে ৩৯ হাজার ৯২৭ হেক্টর জমিতে। আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৯৫০ টন; কিন্তু লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বাড়তি জমিতে আলু চাষ হওয়ায় উৎপাদন হতে পারে ১১ লাখ টন। শুধু সিরাজগঞ্জ, জয়পুরহাটই নয়- রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রামেও এ বছর ব্যাপক আলুর চাষ হয়েছে।

আশা করা যায়, উৎপাদিত আলু দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করা সম্ভব হবে। আলু রফতানির যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকলেও উৎপাদনের তুলনায় খুব বেশি রফতানি করা সম্ভব হয় না। অথচ আলুর রফতানি বাড়ানো সম্ভব হলে আলুচাষিদের ন্যায্যমূল্য অনেকাংশেই নিশ্চিত হতো। ফলে আলুর চাষাবাদ আরো বাড়ত।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের ছোট-বড় সব নদীই এখন পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে চরাঞ্চলের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। চরাঞ্চল বাড়ার অর্থই হচ্ছে বালুমিশ্রিত দো-আঁশ মাটিতে আলুসহ সবজি চাষাবাদের জমি সম্প্রসারিত হচ্ছে, যা দিয়ে আমাদের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সবজির চাহিদা পূরণ করে রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করাও সম্ভব হচ্ছে। এখন সবজি উৎপাদনে আমাদের দেশ বিশ্বে চতুর্থ স্থানে অবস্থান করছে।

আধুনিক উন্নত প্রযুক্তিতে সবজির চাষাবাদ যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে সম্ভাবনার দ্বারকেই সম্প্রসারিত করছে। আগেই বলেছি, বাড়তি ফলন হলেই কৃষকের কপাল পোড়ে। অনেক সময়ই সবজিচাষিদের পানির দামে সবজি বিক্রি করতে হয়। সম্প্রতি জাতীয় এক দৈনিকে ‘এক কেজি চালের দামে এক মণ ফুলকপি’ শিরোনামে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। ওই খবরে জানা যায়, এ বছর বগুড়ায় শীতকালীন সবজির বাম্পার ফলন হলেও দাম পাচ্ছেন না চাষিরা।

সবজির দাম এতটাই কমে গেছে যে, এক মণ ফুলকপির দাম এক কেজি চালের দামের সমান। ওই খবরের প্রতিবেদক জানান, তিনি ২১ জানুয়ারি বগুড়া জেলার মহাস্থানগড়ের হাটে গিয়ে দেখেন প্রতি মণ ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়, যা বর্তমান বাজারে এক কেজি চালের দামের চেয়েও কম। কিন্তু অস্বাভাবিক মনে হলেও এটাই বাস্তবতা। হয়তো ফুলকপি চাষিরা মৌসুমের শুরুতে ফুলকপির ভালো দাম পেয়েছিলের। সরবরাহ একটু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম কমে গেছে। অথচ সবজিচাষিরা হিমাগারে উৎপাদিত এসব সবজি সংরক্ষণের সুযোগ পেলে সরবরাহ কমার পর ন্যায্য দামেই তা বিক্রি করতে পারতেন। সরল এই সমীকরণ কি ক্ষমতাসীনরা বোঝেন না?

সত্যিই যদি বোঝেন, তাহলে চোখের সামনে সবজিচাষিরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বছরের পর বছর, তবু কেন সবজি সংরক্ষণ উপযোগী হিমাগার স্থাপন করা হয় না? শুধু ফুলকপি কেন, যে আলুর দাম ভালো পাচ্ছেন মর্মে আজকের এই নিবন্ধে তুলে ধরলাম, দেখা যাবে যখন আলু তোলার ভরা মৌসুম শুরু হবে, তখন হয়তো আলুচাষিরা আলুর উপযুক্ত দাম পাবেন না। ইতোমধ্যে জাতীয় দৈনিকগুলোতে শিরোনাম হয়েছে, লালমনিরহাটে লোকসানে পড়েছেন আলুচাষিরা।

খবরে বলা হয়েছে, লালমনিরহাটে তিস্তা, ধরলা ও সানিয়াজান নদীর চরাঞ্চলের হাজার হাজার কৃষক প্রতি বছর আলু চাষ করে লাভবান হলেও এবার শীত মৌসুমে আলু চাষ করে লোকসানের মুখে পড়েছেন। গত বছর এ জেলায় আলুচাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ৪২০ হেক্টর জমি। এ বছর আবাদ হয়েছে ৫ হাজার ৭০০ হেক্টরে। আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৯৫ হাজার ১৩০ টন। উল্লেখ্য, এ জেলার সদর উপজেলা ছাড়া বাকি চার উপজেলায় আলু সংরক্ষণ উপযোগী কোনো হিমাগার নেই। এসব এলাকার চরাঞ্চলসহ আলু চাষের উপযোগী জমিতে আলু চাষ করে কৃষক ভালো ফলন পান সত্য; কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে কম দামে তা ক্ষেতেই বিক্রি করতে বাধ্য হন।

এ বিষয়গুলো নিয়ে পত্রিকায় লেখালেখি হয়েছে অনেক। অনেক সময় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সচিত্র প্রতিবেদনও সম্প্রচার করা হয়; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। মনে হয়, যাদের পেশা লেখার বা বলার, তারা তাদের কাজ করেন। এতে সরকারের কি আসে যায়! বাস্তবেও তা-ই, কিছুই হয় না।

আমাদের আশা একটি, তা হলো লিখতে লিখতে যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি কাড়ে। তাহলে হয়তো সবজিচাষী তথা কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশের কৃষকের স্বার্থে ইতিবাচক কিছু অর্জন হতেও পারে। আর এটাও নিখাদ সত্য, কৃষি ও কৃষকের সমৃদ্ধি ছাড়া সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশ বিনির্মাণের যত চেষ্টাই করি না কেন, কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলা অনেকাংশেই দুঃসাধ্য হবে।

সোনালীনিউজ/এমটিআই


*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। সোনালীনিউজ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে লেখকের এই মতামতের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য সোনালীনিউজ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।